kalerkantho

পর্বত

রশীদ হায়দার

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পর্বত

গত ৫০-৬০ বছরেও যে শীত পড়েনি, এ বছর তার চেয়ে বেশি পড়বে বলে মস্কো টিভি ও রেডিও সেপ্টেম্বর মাসের গোড়ার দিকেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। টিভি ও রেডিও শুধু একবার এই সতর্কবাণী দিয়েই থেমে থাকেনি, দিনে একবার, কোনো কোনো দিন দু-তিনবার পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে।

সারা রাশিয়ায় একটা আতঙ্কের ঝড় বয়ে গেল। রাশিয়াবাসী জানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এত বেশি শীত পড়েছিল, বরফ পড়েছিল যে হিটলার বাহিনী যুদ্ধ বাদেও শীতে কাবু হয়ে যাচ্ছেতাই হারা হেরেছে। যুদ্ধের আতঙ্কের মধ্যে হিটলার বাহিনীর ওই করুণদশা রুশদের বেশ আনন্দ দেয়। কিন্তু এত বছর পর আবার বরফে ও শীতে তছনছ করে ফেলবে, এ দশা থেকে মুক্তি মিলবে কিভাবে তারই আলোচনা বাসে, ট্রেনে, বিমানে, মেট্রোতে, দোকানে, কফিশপে, পানশালায়, অফিসে, আদালতে, পার্কে, বাসায়—এমনকি রান্নাঘরেও।

মানুষের মনের অবস্থা সবচেয়ে বেশি বোঝে পশুপাখি, গাছপালা, নদীনালা, সমুদ্র ও মহাসমুদ্র।

এই খবরটাও আমরা জানলাম খবরের কাগজে, রেডিওতে ও টেলিভিশনে। সারা রাশিয়ায় তো বটেই, সমগ্র ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াও বিশেষ খবর হিসেবে প্রচার করেছে, এবার রাশিয়ায় স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ার আগাম খবর জানাজানি হওয়ায় রুশদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বেশি অস্থিরতা পশুদের মধ্যে। তারা এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু এত বড় দেশ রাশিয়া পার হতে হতেই যে শীতের কামড় শুরু হয়ে যাবে, তা মরণকামড়ের চেয়েও সাংঘাতিক, সেটা ওই অবলা পশুপাখিই  বুঝতে পারছে। তারা মুখ ফুটে তো আর বলতে পারে না। শুধু লাফালাফি আর ছটফটানি দিয়ে মানুষকে বোঝায়—ভয়ংকর শীত আসছে, পালাও পালাও।

এ অবস্থা চলতে থাকার মধ্যেই পাখিদের সভা বসে। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খবর চলে যায়। সামনের ভয়ংকর শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পৃথিবীর কোন দেশে যাওয়া যেতে পারে। সিদ্ধান্ত হয়, মস্কোর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে সভাটা হলে সারা দেশের পাখিদের জায়গা হওয়া সম্ভব। এর পরও যারা আসতে পারবে না, তাদের কাছে সভায় উপস্থিত পাখিরা সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।

নিজেদের বাঁচানোর এই সুযোগটা কিছুতেই ছাড়া যাবে না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কতক্ষণ বা কত দিন টিকে থাকা যায়। প্রকৃতির ছোবল বিষধর সাপের চেয়েও ভয়ংকর, এই খবর রাশিয়ার পূর্বপুরুষ পাখিরা জানে, আর জানে সেনাবাহিনী।

দিনটি রবিবার, আগস্টের ৩১ তারিখ। মস্কোর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে সমগ্র রাশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ থেকে নানা জাতের পাখি উড়ে আসতে থাকলে মস্কোর আকাশ পাখিতে ঢেকে যায়, আকাশে মেঘ নেই তবু মনে হয় আকাশ মেঘে ভরে গেছে। ওদিকে সকাল থেকেই লাখ লাখ পাখির নানা স্বরের ডাকে, পাখা ঝাপটানিতে বোধ হচ্ছে, শূন্যে তুমুল ঝড় বইতে শুরু করেছে। মস্কো রেডিও এত হাজার হাজার পাখি আসার কারণ মানুষকে বোঝাতে না পেরে শেষে সারা দেশের বাছা বাছা ৫০ জন পাখি বিশেষজ্ঞকে জরুরি আমন্ত্রণ জানায়—আপনারা আসুন, এত পাখি আসার কারণটা কী জানান।

সেই সব পাখি বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানানো হলো, যাঁরা পাখির ভাষা বোঝেন। যে ৫০ জন বিশেষজ্ঞকে ডাকা হয়, তাঁদের ৩০-৩২ জন পাখির ভাষা জানেন, বুঝতে পারেন। তাঁদের জন্য বিশেষ বিমান পাঠায় রাশিয়া সরকার। দুপুরের মধ্যেই ৩১ জন ভাষা বিশেষজ্ঞ এসে পৌঁছলে দেশের প্রধানমন্ত্রী জরুরি সভা বসিয়ে বলেন—আপনারা তো পাখি বিশেষজ্ঞ। তো বলুন, এত হাজারে হাজারে পাখি আসছে কেন? পাখিরা তাদের ভাষায় কী-ই বা বলাবলি করছে?

প্রথমেই উঠে দাঁড়ান মস্কোরই প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি বিশেষজ্ঞ সের্গেই দানিয়াভস্কি।

প্রফেসর দানিয়াভস্কিকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাখি বিশেষজ্ঞ হিসেবে জানেন বলে প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়ে বললেন—জি বলুন, প্রফেসর দানিয়াভস্কি। কেন, কেন পাখিদের মধ্যে এত অস্থির ভাব? কারণ কী? এর আগে এমন ভাব তো কখনো দেখিনি।

প্রফেসর দানিয়াভস্কি মাথা নুইয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে বললেন—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এরই মধ্যে মস্কো রেডিও ঘোষণা করেছে যে এবার স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শীত পড়বে। সাধারণ শীতকালে আমাদের মস্কোতেই মাইনাস ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি শীত পড়ে। ওদিকে সাইবেরিয়ায় ৬০-৬৫ পর্যন্ত চলে যায়। কিন্তু এবারের আবহাওয়া রিপোর্ট আপনি আমি এখানে সবাই জানি। এবার মস্কোতেই ষাটের কাছাকাছি চলে যাবে, সাইবেরিয়ায় ৭৫-৮০ হওয়াও অসম্ভব নয়। এই সংবাদ সারা রাশিয়া কেন, সমগ্র পৃথিবীতেই  আলোচনার ঝড় তুলেছে।

প্রফেসর দানিয়াভস্কিকে থামিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী—আমি আপনার কাছে জানতে চেয়েছি, পাখিদের মধ্যে এত অস্থিরতা কেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পশুপাখিরা প্রকৃতির অনেক আচরণ অনেক আগে থেকেই বুঝতে পারে। এবার যা ঘটতে যাচ্ছে, তা পশুপাখিরা ঠিকই বুঝেছে বলে বিশেষ করে পাখিরা নিজেদের বাঁচানোর জন্য দেশ ছেড়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, এমন চিন্তা থেকেই সভাটি ডেকেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পশুপাখি বাঁচা মানে আমাদের বাঁচা। ওরাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। ওরা বাঁচার জন্য দেশ ছাড়ছে। আমাদের এখানে শীত কমে গেলেই ওরাও দলে দলে ফিরে আসবে।

প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত হওয়ার জন্য জানতে চান—ফিরে আসবে তো?

অবশ্যই আসবে। কারণ আমাদের শীতকাল আর দক্ষিণের দেশগুলোর শীতকাল এক রকম নয়। বলা যায় আমাদের গরমকালের মতো ওসব দেশের শীতকাল। আমি নিজেই দুই বছর আগে জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। ওখানে পঞ্চগড় বলে একটা জায়গা আছে। বাংলাদেশের একেবারে উত্তরে পঞ্চগড়েই সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে। আমি সেখানেও গিয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওখানকার শীতে মানুষ যেখানে দু-তিন রকম গরম কাপড় পরে, সেখানে আমি মাত্র একটি সুতি কাপড়ের জামা গায়ে সকালে-রাতে আকাশের নিচে চলাফেরা করেছি। আমার এভাবে চলাফেরা দেখে লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। আর ওখানকার গরম? সাংঘাতিক! গায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। ওই গরমে আমাদের দেশের পাখিরা টিকতেই পারবে না। আর সে কারণেই ওরা ফিরে আসবে।

দানিয়াভস্কির জবাবে আশ্বস্ত হন প্রধানমন্ত্রী। তার পরও তিনি জানতে চান—ওরা ওদের ভাষায় কী বলাবলি করছে, তা কি বুঝতে পেরেছেন?

হ্যাঁ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ওরা বলাবলি করছিল দক্ষিণের কোন কোন দেশে যাবে।

কোন কোন দেশ?

আমাদের দক্ষিণ-পূর্বে চীন; দক্ষিণে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, বার্মা, শ্রীলঙ্কা; দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরাক, ইরান, আরবদেশ, আরো দক্ষিণে...

প্রধানমন্ত্রী থামিয়ে দেন দানিয়াভস্কিকে। বলেন— বুঝতে পেরেছি, বুঝতে পারছি আমাদের পাখিরা শীতকালে কেন ওই দেশে যেতে চায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দেশ আর ওই সব দেশের মাঝখানে রয়েছে নেপাল নামের একটি দেশ। সেই দেশেই আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত— হিমালয়। ওই হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট। আমাদের পাখিরা ওই হিমালয়, হিমালয়ের এভারেস্টের ওপর দিয়েও উড়ে দক্ষিণের দেশগুলোতে চলে যায়। শুনেছি ওসব দেশের লোকেরা আমাদের পাখিদের একসঙ্গে উড়ে যাওয়া দেখে বড় আনন্দ পায়।

জানতে চান প্রধানমন্ত্রী—পাখিদের গুলি করে মারে না?

হ্যাঁ। পাখি শিকার সারা পৃথিবীতেই শিকারিদের একটা চরম আনন্দের বিষয়। পাখি মেরে ওরা উৎসব করে।

প্রধানমন্ত্রী খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে থেকে ধীরে ধীরে বলেন—যারা পাখি মেরে উৎসব করে, তাদেরও মেরে উৎসব করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রীর কথা মনে হয় শেষও হয়নি, হঠাৎ হাজার হাজার পাখি কলরব করে গোটা মস্কো কাঁপিয়ে তুললে দানিয়াভস্কি বললেন—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাখিরা আপনার কথা মাইকে শুনতে পেয়েছে, বুঝতে পেরেছে বলে আনন্দ করছে।

সারা হল হাততালিতে ফেটে পড়ে, বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির। হলের ভেতরে কোলাহল আরো বেড়ে যায়, সভা শেষ হয়।

আজ পয়লা সেপ্টেম্বর।

সকাল থেকেই ঝকঝকে আকাশে সূর্যের আলো এমনভাবে হাসতে থাকে যে মানুষও পাগলের মতো হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে রাস্তায় বের হয়ে আসে। এসেই দেখে মাঝারি গোছের একঝাঁক পাখি দক্ষিণ দিকে উড়ে যাচ্ছে। তখনই সবার মনে আসে, সেপ্টেম্বরের গোড়া থেকেই তো পাখিরা দক্ষিণে হিমালয় পেরিয়ে গরমের দেশে যায়! অনেক দূরের পথ। উড়তে উড়তে পাখা ব্যথা হয়ে যাওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও ওরা যায়, কারণ মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে পাখার ব্যথা কিছু নয়। এ ছাড়া শীতে সারা রাশিয়া শুধু নয়, গোটা উত্তর ইউরোপ সাদা বরফে ধবধবে হয়ে যায়, ওখানে পাখিদের খাবার কোথায়? বেঁচে থাকার লড়াই সব প্রাণীকেই তো করতে হবে।

এই কথাটাই মাঝারি গোছের পাখির দলনেতা বলে— হিমালয় পার হতে আর কয় দিন লাগবে?

দলের ভেতর থেকে বলে এক পাখি—আরো দু-আড়াই দিন।

এই দু-আড়াই দিন একটানা ওড়া কি সম্ভব?

না। তবে হিমালয় পাওয়ার আগে নিশ্চয়ই আমরা নামার জায়গা পাব, খাবারও পাব। সেখানে না হোক, আশপাশে কিংবা কাছাকাছি খাবার পাব না?

দলনেতা পাখি আয়েশ করে উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে একসময় ক্লান্তি লাগে, যেন অবশ হয়ে আসে। তখন দল বেঁধে কোনো হ্রদে কিংবা নদীতে নেমে তাদের পেট ভরে খাওয়ার মতো ছোট বা মাঝারি মাছও পেয়ে যায়। পুরো এক দিন এক রাত হ্রদে নদীতে কাটিয়ে ওড়ার আগে প্রথম দলটি দেখতে পায় এর মধ্যে আরো কয়েকটি দল এসে গেছে। দলটিকে বিশাল, সুবিশাল মনে হয়। দলটি ওড়া শুরু করার আগে দলনেতা সবাইকে উদ্দেশ করে বলে—শোনো, পাখি ভাইবোনেরা শোনো, হিমালয় পার হয়ে কে কোন দিকে যাবে?

তৃতীয় দলটির দলনেতা জানতে চায়—তোমরা কোন দেশে যাবে?

আমরা ঠিক করেছি এবার বাংলাদেশে যাব। তোমরা?

তোমরা বাংলাদেশে গেলে আমরা ভারতে যাব।

দ্বিতীয় দলের দলনেতা জানায়—আমরা যাব শ্রীলঙ্কা। আর তোমরা?  মালদ্বীপ।

তোমরা?

বার্মা, মানে মিয়ানমার।

আর এই যে, তোমরা?

আমরা ঠিক করেছি থাইল্যান্ড যাব।

প্রথম দলের দলনেতা অবাক হয়ে জানতে চায়—কেউ পাকিস্তান যেতে চাও না?

সব পাখি একসঙ্গে বলে ওঠে—না।

কেন? যেতে চাও না কেন?

চাই না, কারণ ওরা মানুষ মারে পাখির মতো। তাহলে পাখিদের কিভাবে মারতে পারে আপনিই বলুন!

দলনেতা এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায় না। সত্যিই, ওরা তো পাখির মতো মানুষ মারে, তার প্রমাণ তো ১৯৭১ সালেই রেখে গেছে। মানুষকে মানুষ ওভাবে মারতে পারে, এটা ভাবতেই পারে না।

আকাশ কালো করে, লাল করে, হলুদ সবুজ খয়েরি করে পাখির দল এগিয়ে যেতে যেতে দ্বিতীয় দলের এক পাখি চিত্কার করে জানান দেয়—ওই তো, ওটাই তো হিমালয়। ওই যে বাঁ দিকে কোনায় সবার ওপরে মাথা উঁচু করে আছে এভারেস্ট।

শুনেছি, এভারেস্টই নাকি সবচেয়ে বেশি উঁচু চূড়া।

ঠিকই শুনেছ। ওখানে উঠতে গিয়ে কত মানুষ যে মারা গেছে!

আর আমরা কিনা অনায়াসে সেই চূড়া উড়ে পার হচ্ছি।

পাখির কলরব কিচিরমিচির আরো বেড়ে যায়; এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, ধবলগিরি, নীলগিরি তাদের পাখার নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। প্রকৃতির রূপ-রং যে কত মনোরম তা উপভোগ করতে করতে ভারতে যাওয়ার দল চিত্কারে আকাশ মাতিয়ে তোলে—আমরা ভারতে এসে গেছি, ওই, ওই তো কাশ্মীর।

বাংলাদেশের দল ঘাড় ঘুরিয়ে জন্মু কাশ্মীর দেখতে দেখতে দক্ষিণ-পূর্ব কোনার দিকে সরতে থাকে।

ভারতের দল শব্দ করে পাখা ঝাপটে শুধু বলে—বিদায়, শীতের শেষে আবার আমাদের রাশিয়ায় দেখা হবে। ভালো থেকো।

বাংলাদেশ দলের দলপতির চোখে তখন ঝিলিক দেখা যায়। এই একটা ছোট্ট দেশ, কিন্তু কী তার গৌরবময় ইতিহাস! তাদের দেশের মতো এই দেশটিকেও অনেক রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে। এ রকম দেশ দেখার লোভ সামলাতে পারেনি বলেই সে প্রথম সুযোগেই মস্কোর সেই সভায় প্রস্তাব তুলেছিল—আমরা বাংলাদেশে যাব।

কেন, এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার মতো মহাদেশে শত শত দেশ থাকতে ওই গরিব বাংলাদেশে কেন যেতে চাও?

সে দেশের ইতিহাস জানো? ওই দেশটির মতো অত চিরসবুজ দেশ পৃথিবীর আর কোথাও পাবে না। ওই দেশের নদীনালা, খালবিল, তার অপূর্ব দৃশ্য, ওই দেশের সাধারণ মানুষের সাধারণ গান, পাখপাখালির মিষ্টিমধুর কিচিরমিচির শুনলে নাকি কান জুড়িয়ে যায়। সেই রকম একটা দেশ না দেখলে আমাদের পাখির জন্মই তো বৃথা। আমাদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে কোনো বাধা নেই, সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই সুযোগ যখন দিয়েছেন, তখন কেন যাব না?

মস্কোর সেই সভার সভাপতি বলল—আমি আশা করছিলাম, তুমি বলবে ওই দেশটির প্রতিষ্ঠাতার জন্মস্থানটি দেখারও আগ্রহ আছে। বলো, ঠিক কি না?

হ্যাঁ, সভাপতি, ঠিকই বলেছ তুমি। বাংলাদেশে যাব আর ওই দেশের মহানায়কের জন্মস্থানে যাব না, তুমি ভাবলে কী করে?

খুশি হলাম তোমার কথা শুনে।

জন্মু কাশ্মীর থেকে দল সোজা দক্ষিণ-পূর্ব কোনার রাস্তা ধরে। যত বাংলাদেশের দিকে এগোয়, তত তাদের অবাক হওয়ার পালা। আস্তে আস্তে পাতলা সবুজ থেকে ঘন সবুজ হচ্ছে বাংলাদেশের গাছপালা। এত সবুজ যে চোখ আপনা-আপনিই শান্ত হয়ে যায়। দলের একজন জানতে চায়—আমরা যেখানে নামব, সে জায়গার নাম কী?

টুঙ্গিপাড়া। গোপালগঞ্জ জেলায়। রাজধানী থেকে বেশ দূরে। খুনিরা ভেবেছিল রাজধানীর বাইরে সেই মহানায়কের লাশ পুঁতে ফেললে কেউই কোনো দিন দেখতে যাবে না। কিন্তু ওই অজপাড়াগাঁই এখন বাঙালির তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে। তার পবিত্র নামে সারা পৃথিবীর লোক বাংলাদেশকে জানে। তোমরা কি কেউ তাঁর নাম জানো?

পাখিরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। কেউ নাম জানে না। দলনেতা গলা উঁচিয়ে বলে—তাঁর নাম শেখ মুজিব। উঁচা-লম্বা একটা মানুষ, সাধারণ বাঙালি ঘরের ছেলে বলেই মনে হয় না। আমরা তাঁর জেলার কাছাকাছি এসে পড়েছি।

দলের একটি পাখি বলে—এদিকে তো সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমরা মুজিবকে দেখব কিভাবে?

আজ না হয় কাল দেখব। মুজিব তো দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই এই দেশটাকে দেখছেন। যেদিকে তাকাবে, সেদিকেই মুজিবকে দেখতে পাবে।

ঠিক সে সময় একটি পাখি চেঁচিয়ে বলে ওঠে—আমি আর এগোতে পারছি না।

দলনেতা জানতে চায়—কেন, কী সমস্যা?

ছায়া, মানুষের ছায়া।

হেসে ফেলে দলনেতা পাখি—ছায়ায় আবার কেউ আটকায় নাকি?

কিন্তু আমি তো আটকে যাচ্ছি।

বলে দলনেতা—তাহলে ছায়ার ওপর দিয়ে উড়ে আসো।

অসম্ভব! আমি ওপরে উঠলে ছায়া যে আরো ওপরে ওঠে।


মন্তব্য