kalerkantho

সংকটের শেষ নেই সিএসইর

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংকটের শেষ নেই সিএসইর

পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহের চার কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) লেনদেন করেছে দুই হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি বন্ধ থাকায় চার কার্যদিবসে গড় লেনদেন ছিল ৭২৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সাপ্তাহিক লেনদেন হয়েছে সাকুল্যে ১০৬ কোটি টাকা, যা ডিএসইর লেনদেনের তুলনায় মাত্র ৩.৬৩ শতাংশ। এক বছর ধরে চট্টগ্রাম পুঁজিবাজারের আনুপাতিক লেনদেন ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ চার-পাঁচ বছর আগেও দেশের পুঁজিবাজারে চট্টগ্রামের হিস্যা ১০ শতাংশের বেশি ছিল। শুধু লেনদেন নয়, কৌশলগত অংশীদার (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার) পাওয়ার ক্ষেত্রেও সিএসইকে টেক্কা দিয়েছে ডিএসই। চীনের বিশ্বখ্যাত দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে চুক্তি করেছে ডিএসই। সেখানে সিএসই এখনো কৌশলগত অংশীদারই খুঁজে পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠার পর সিএসই গত ২৪ বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সিএসই সূত্র জানায়, মাত্র তিন লাখ ৯২ হাজার ৫১৩ টাকা লেনদেন নিয়ে ১৯৯৫ সালের ১০ অক্টোবর দেশের দ্বিতীয় স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। স্বচ্ছতা এবং অনলাইননির্ভর পুঁজিবাজারের ধারণা নিয়ে বেশ ভালোই শুরু করে সিএসই। কিন্তু ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনাকে পৃথককরণ) পর থেকে সিএসইর সংকট বাড়তে থাকে। ডিএসইর সঙ্গে লেনদেনে কোনোভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না।

সর্বশেষ সংকট দেখা দেয় কৌশলগত অংশীদার খোঁজার ক্ষেত্রে। একই সময়ে কৌশলগত অংশীদার খোঁজা শুরু করলেও ডিএসই নির্ধারিত সময়েই চীনের অন্যতম বৃহৎ সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জকে নিজেদের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে পেরেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের বৃহৎ দুটি স্টক এক্সচেঞ্জকে যুক্ত করেছে। তাদের যুক্ত করার পর থেকে ডিএসইর দৈনন্দিন লেনদেনে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষণীয়। সেখানে সিএসই দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়ে এখন তৃতীয় দফা মেয়াদ বাড়ানোর অপেক্ষায়। কিন্তু এখনো কৌশলগত অংশীদার খুঁজে পায়নি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন লেনদেনে। ডিএসই যেখানে হাজার কোটি টাকার ওপর লেনদেন করছে সেখানে সিএসইতে লেনদেন হচ্ছে ৫০ কোটি টাকার নিচে।

ডুয়াল মেম্বারদের (যাঁদের ডিএসই ও সিএসই ট্রেড লাইসেন্স আছে) সিএসইতে লেনদেনে অনীহা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে আনুপাতিক লেনদেন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বছরপাঁচেক আগে সিএসইর দৈনিক লেনদেনের ৪৫ শতাংশ আসত ডুয়াল মেম্বারদের কাছ থেকে। কিন্তু সেটা বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ জহুর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের এই দুরবস্থার জন্য একাধিক কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে বিডিং প্রাইস বেশি। ডিএসইতে চাহিদা ও জোগানদাতার সংখ্যা অনেক বেশি। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী মূলত ডিএসইকেন্দ্রিক। বড় লটের যেকোনো লেনদেনের জন্য তাঁদের একমাত্র ভরসা ডিএসই। নেটিং সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া সিএসইর লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। সিএসই পরিচালকদের বড় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকার খেসারত সিএসইকে দিতে হচ্ছে বলে মনে করেন ড. সালেহ জহুর।

তিনি বলেন, ‘সিএসইর স্বাধীন পরিচালকরা পুঁজিবাজার সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ নন। এ কারণে সিএসইর উন্নয়নে তাঁদের অংশগ্রহণও কম।’

সিএসইর সাবেক পরিচালক ও বি রিচ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া ডুয়াল মেম্বাররা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন করে না বললেই চলে। এমনকি অনেক বোর্ড পরিচালকের ব্রোকারেজ হাউসও সিএসইতে তেমন একটা লেনদেন করে না। বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সিএসই ছেড়ে ডিএসইতে চলে যাচ্ছে। আমার নিজের হাউসেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তাদের তো দোষ দেওয়া যাবে না।’

সিএসইকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হলে সামগ্রিক উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা সক্রিয় নয়, তাদের বাধ্য করতে হবে সক্রিয় হতে। নতুন ট্রেক ইস্যু করার যে প্রক্রিয়া তাতেও গতি আনতে হবে। এরই মধ্যে সিএসই ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলোও কিছু বিএসইসিতে আবার কিছু সিএসই বোর্ডেই আটকে গেছে।’ সবার আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া সিএসইর বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য