kalerkantho


বেকারিশিল্পে বড় ব্র্যান্ড হবে ওয়েল ফুড : সিইও

মুনাফার চেয়ে সম্মান বেশি খাদ্যের ব্যবসায়

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মুনাফার চেয়ে সম্মান বেশি খাদ্যের ব্যবসায়

সৈয়দ নুরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান ও সিইও, ওয়েল গ্রুপ

চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের মূল ব্যবসা টেক্সটাইল। তবে খাদ্য ব্যবসায় এসে সুনাম কুড়িয়েছে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েল ফুড’। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে এরই মধ্যে ৫৭টি আউটলেট চালু করেছে ওয়েল ফুড। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক গন্তব্যে ওয়েল ফুড পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট টার্নওভারের মাত্র ১০ শতাংশ ওয়েল ফুডের ব্যবসা। কিন্তু এই ১০ শতাংশ ঘিরেই নানা স্বপ্নের কথা জানালেন ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ নুরুল ইসলাম। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশজুড়ে লাইভ বেকারি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, খাদ্যের ব্যবসায় যতটুকু না লাভ তার চেয়ে বেশি যশ-খ্যাতি বা ‘নেইম অ্যান্ড ফেইম’। বেকারিশিল্পে ওয়েল ফুডকে বড় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যের কথা জানান তিনি।

ব্যবসা শুরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়া ভ্রমণে ২০০৬ সালে দেখলাম এক নতুন কনসেপ্ট; অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রুটি-বিস্কুট-কেক ক্রেতার সামনে বানিয়ে তাৎক্ষণিক (লাইভ) বিক্রি হচ্ছে। সেই ধারণা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করল। স্বপ্ন বুনতে লাগলাম এই ধরনের একটি ফাস্ট ফুড-বেকারি শপ বানানোর। দেশে এসে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের ছোট্ট পরিসরে ২০০৬ সালেই যাত্রা শুরু করলাম আমার স্বপ্নের ফাস্ট ফুড শপ; নাম দিলাম ‘ওয়েল ফুড’। ব্রেড থেকে শুরু করে কেক-বিস্কুট প্রায় সব আইটেমই ছিল সেই ওয়েল ফুডে। সঙ্গে যুক্ত করলাম মালয়েশিয়ার বিখ্যাত ফাস্ট ফুড শপ ‘সুগার বান’কে।

সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলছেন, শুরুতেই বেশ ভালো সাড়া পেয়ে শখের শপ আর এই ছোট্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ রইল না; চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পণ্য বানিয়ে ক্রেতার সামনে বিক্রি করা আর সম্ভব হলো না। পরিধি বাড়িয়ে এরপর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে প্রথম কিচেন বা কারখানা করলাম। সেখান থেকেই চট্টগ্রামের শাখা খোলা এবং পণ্য সরবরাহ শুরু হলো। একের পর এক বেড়ে চট্টগ্রামে ওয়েল ফুডের শাখা বেড়ে দাঁড়াল ২৬টিতে। নগরীর সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখন ওয়েল ফুডের শাখা রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর ছাড়িয়ে এখন আমাদের ব্যবসা উত্তরে হাটহাজারী; দক্ষিণে পটিয়া ছাড়িয়েছে।

নুরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের সুনাম কাজে লাগিয়ে আমরা রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রার পরিকল্পনা করলাম। ২০১৩ সালে আমরা প্রথম ঢাকায় গিয়ে ওয়েল ফুডের ব্যবসা শুরু করলাম। পাঁচ বছরের ব্যবধানেই রাজধানী ঢাকায় ওয়েল ফুডের শাখা বেড়ে এখন ২৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এরপর আমরা গেলাম সিলেটে। সেখানে আমাদের শাখা রয়েছে পাঁচটি। অর্থাৎ এই মুহূর্তে তিনটি বড় শহরে আমাদের শাখার সংখ্যা এখন ৫৭টি। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক গন্তব্যে ওয়েল ফুড পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

শখের ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও ওয়েল ফুড দিয়েই লোকজন এখন আমাদের (ওয়েল গ্রুপকে) চেনে। আগে হাজার কোটি টাকার টেক্সটাইল ব্যবসা করলেও কেউ আমাদের চিনত না। ওয়েল ফুডের সেই চেনার জায়গাটাতেই আমরা কাজ করছি। উদ্দেশ্য আরো বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো।

বর্তমানে ওয়েল ফুডের ব্যবসা মাসে গড়ে আড়াই কোটি টাকা উল্লেখ করে সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ওয়েল ফুডের আউটলেটভিত্তিক ব্যবসাকে আমরা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। কয়েক বছরেই দ্রুত কয়েক শ কোটি টাকার ব্যবসা করব এমনটা চিন্তা করি না। কারণ ওয়েল ফুডের ক্রেতা হচ্ছেন উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এই ক্রেতার রুচি-ধরনও আলাদা। তাদের টার্গেট করেই আমরা মান-স্বাদ বজায় রেখেই সামনে এগোচ্ছি। তাই সঠিক মান ও ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রেখে ব্যবসা করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

নুরুল ইসলাম মনে করেন, খাদ্যের এই ব্যবসা যতটুকু না লাভ তার চেয়ে বেশি যশ-খ্যাতি বা ‘নেইম অ্যান্ড ফেইম’ ব্যবসা। যেটিকে আমি বলি ‘ব্র্যান্ড বিল্ডিং’ ব্যবসা। আমি মূলত এটিকে ব্র্যান্ড হিসেবেই জনপ্রিয় করতে চাই। ৫০ বছর পর সেই প্রজন্ম যাতে শুধু ওয়েল ফুডের ব্র্যান্ড বিক্রি করেই কয়েক শ কোটি টাকা পায় সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছি।

‘খাদ্যের ব্যবসাটার দেশে এসে আগামীর হাল ধরার জন্য আমি নিজের মেয়েকে বেকিং ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে একটি ভার্সিটিতে দুই বছরের ডিগ্রিতে পড়াচ্ছি। বলতে পারেন আগামী প্রজন্মের ফুড ব্যবসার জন্য তাকে তৈরি করছি।’—যোগ করলেন এই উদ্যোক্তা।

এদিকে ওয়েল ফুড উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ভালোভাবে আকৃষ্ট করে ফেলার পর এখন নিম্ন ও নিম্নবিত্তের মানুষের কাছে পৌঁছার পরিকল্পনা নিয়েছে; লক্ষ্য ফুড ব্যবসায় দেশে শীর্ষস্থানে ওঠা। এরই অংশ হিসেবে আউটলেটভিত্তিক ওয়েল ফুডের ব্যবসার বাইরে ডিস্ট্রিবিউটরভিত্তিক ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গণমানুষের কাছে ওয়েল ফুডের স্বাদ পৌঁছানোর জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, এর নাম দিলাম ‘মর্নিং ফ্রেশ’। সেই ব্যবসাও প্রথম থেকেই বড় ধরনের সাড়া পাওয়ায় আমরা উচ্চাবিলাসী ও বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে লাগলাম। এরই মধ্যে পেয়ে গেলাম পটিয়া বিসিক শিল্প নগরীর একটি রেডিমেড বিস্কুট কারখানা। সেই কারখানা অত্যন্ত আধুনিক অর্থাৎ ফুল অটোমেটেড করেই আমরা ২০১৭ সাল থেকে উৎপাদন শুরু করলাম। এই কারখানা থেকে আমরা মর্নিং ফ্রেশ, মাল্টি ও নভেলটি এই তিন ব্র্যান্ডের বিস্কুট কুকিজ উৎপাদন করব। মূলত বিস্কুট বেকারিশিল্পে একটি বড় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।

ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা শুধু ‘মর্নিং ব্র্যান্ড’ ‘মাল্টি’ ও ‘নভেলটি’ ব্র্যান্ডের পণ্য প্রতি মাসে ২০ কোটি টাকা ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। আগামী তিন বছরের মধ্যেই সেটি পূরণ করব ইনশাল্লাহ। অর্থাৎ প্রতিবছর এই খাতেই ২৪০ কোটি টাকার ব্যবসার পরিকল্পনা আছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় অনেক ভালো প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে; তবে চট্টগ্রামে আমরাই ইউনিক। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল ব্যবসা হচ্ছে টেক্সটাইল। ওয়েল গ্রুপের মোট টার্নওভারের মাত্র ১০ শতাংশই হচ্ছে ওয়েল ফুডের ব্যবসা। কিন্তু এই ১০ শতাংশ ঘিরেই এখন আমাদের প্যাশন।



মন্তব্য