kalerkantho


নিজ অর্থে ভারতের একমাত্র নারী বিলিয়নেয়ার

‘পদে পদে বাধা ছিল’

বাণিজ্য ডেস্ক   

৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘পদে পদে বাধা ছিল’

কিরণ মজুমদার-শ, চেয়ারপারসন ও এমডি, বিকন লিমিটেড

 

 

১৯৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার ডিগ্রি সম্পন্ন করে দেশে ফেরেন ২৫ বছরের তরুণী কিরণ মজুমদার-শ। ইচ্ছা ছিল দেশেই চাকরি করে ক্যারিয়ার গড়বেন, কিন্তু কেউ তাঁকে চাকরি দিতে রাজি হচ্ছিল না, কারণ তিনি একজন নারী।

শেষ পর্যন্ত চাকরির খোঁজে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন স্কটল্যান্ড। চাকরি করে ভালোই সময় কাটছিল। সেখানে পরিচয় হয় আইরিশ উদ্যোক্তা লেসলি উচিনক্লসের সঙ্গে। যিনি ভারতে ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসা করতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। কিরণ মজুমদারকে প্রস্তাব দিলেন তাঁর ব্যবসায় পার্টনার হওয়ার জন্য। কিরণ জানালেন তাঁর পুঁজি কিংবা অভিজ্ঞতা কিছুই নেই। তার পরও তাঁর সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইলেন আইরিশ উদ্যোক্তা। ফলে ১৯৭৮ সালে তাঁরা গড়ে তুললেন ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানি ‘বিকন’।

বর্তমানে ভারতের ওষুধ খাতের অন্যতম বৃহৎএ কম্পানির মূলধন ৪০০ বিলিয়ন রুপিরও (৫.৬ বিলিয়ন ডলার) বেশি। আর ৬৫ বছর বয়সী কিরণ মজুমদারের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। তিনিই ভারতের একমাত্র নারী, যিনি নিজ অর্জিত অর্থে বিলিয়নেয়ার হয়েছেন। তিনি বিকন লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও এমডি।

ভারতের বেঙ্গালুরুর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া কিরণ বলেন, আমি যখন দেশে ফিরে কম্পানিটি শুরু করি তখন আমার কাছে ছিল ১৫০ ডলার। এটাই আমার সারা জীবনের সঞ্চয় ছিল। এ অর্থ দিয়ে নিজের গ্যারেজে কম্পানিটি শুরু করি। তিনি বলেন, শুধু একজন নারী হওয়ার কারণে ব্যবসা করতে গিয়েও পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। কম্পানিতে লোক নিতে গিয়ে বুঝলাম কেউ নারীর অধীনে কাজ করতে আগ্রহী নয়। শুধু পুরুষরা নয়, এমনকি নারীরাও আমার সঙ্গে কাজ করতে আস্থা পাচ্ছিল না। তারা ভাবত আমি কম্পানির মালিক নই কর্মী। অবশেষে ৪০ জন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে একজন কর্মী নিতে পেরেছি।

কিরণ মজুমদার বলেন, কম্পানির মূলধন সংগ্রহ ছিল আরেকটি বড় বাধা। কোনো ব্যাংকই আমাকে ঋণ দিতে রাজি হচ্ছিল না। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। তারা ভাবত এ বয়সী একটি মেয়ের পক্ষে কম্পানি চালানো সম্ভব হবে না। ফলে সব দিক থেকেই আমি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যাই। অবশেষে ১৯৭৯ সালে একজন ব্যাংকার আমাকে ঋণ দিতে রাজি হন।

বিকনের প্রথম পণ্য ছিল ‘এনজিম’। যার বেশির ভাগ ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের। এরপর ক্রমান্বয়ে বায়োফার্মাসিউটিক্যালস তৈরি হতে থাকে। ব্যবসা ক্রমেই বড় হতে থাকে। ২০০৪ সালে ভারতের দ্বিতীয় কম্পানি হিসেবে প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ডলার মূলধন ছাড়িয়ে যায় বিকনের। ওই বছর কম্পানি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। কিরণ বলেন, ওটা ছিল কম্পানির মাইলফলক। এরপর আমরা শুধু এগিয়েই গিয়েছি।

সর্বশেষ অর্থবছরে বিকনের রাজস্ব এসেছে ১৭২ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে মোট মুনাফা এসেছে ১৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ১০০ দেশে কার্যক্রম রয়েছে কম্পানির। আয়ের ৬৮ শতাংশই আসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে।

বিকনের ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক কিরণ মজুমদার কম্পানিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরো বড় করার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, বড় বালকদের আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চাই।’ ব্যাবসায়িক সাফল্যের কারণে এ কর্মকর্তা ভারতের অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি ‘পদ্মা ভূষণ’ পেয়েছেন তিনি।

দেশে নারীদের করপোরেট সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, আমি হতাশ, নিজ পরিশ্রমে আরো নারী বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়নি। তবে আশা করছি, আগামী দশ বছরে আরো অনেক নারী বিলিয়নেয়ার তৈরি হবে নিজ প্রচেষ্টায়। করপোরেট জগতে আরো বেশি নারী নেতৃত্ব আমি চাই। তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যর্থতায় হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ এটা সাময়িক। লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে তবেই সাফল্য আসবে।

কিরণ মজুমদার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট বেঙ্গালুরুরও চেয়ারপারসন। ফিন্যানশিয়াল টাইমসের শীর্ষ ৫০ নারী ব্যবসায়ীর অন্যতম। ২০১৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের জরিপে তিনি বিশ্বের ৮৫তম প্রভাবশালী নারী হন। ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী নারী হিসেবে যথাক্রমে ৭৭তম ও ৭১তম হন। বিবিসি, উইকিপিডিয়া।



মন্তব্য