kalerkantho


‘ইউ আর ফাইনালি সিলেকটেড’

মো. ওবায়দুল ইসলাম খান    

৩০ মে, ২০১৮ ১১:১১



‘ইউ আর ফাইনালি সিলেকটেড’

চাকরির জন্য সাক্ষাত্কার। অম্লমধুর এক অভিজ্ঞতা। রায়হান রহমানকে ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডেভেলপমেন্ট শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার 

স্কুল ও কলেজে পড়েছি মফস্বলে। ঢাকায় এসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে আর দশজনের মতো আমিও চাকরির ভাইভা দিতে শুরু করি। আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আছে চারটি ভাইভা। ২৯তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়ার আগে দুটি বেসরকারি কম্পানিতে কাজ করেছি।

প্রথম ভাইভার মুখোমুখি হই ইন্ডাস পাওয়ার সিস্টেম নামের একটি টাওয়ার কম্পানিতে। সব কাগজপত্র দেখে ভাইভা বোর্ডে আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কত টাকা বেতন চাও? উত্তরে বলেছিলাম, আট হাজার টাকা। ভাইভা বোর্ডের কর্মকর্তারা আমাকে এই বেতনেই চাকরি দিয়ে দেন। বাইরে অপেক্ষমাণ বন্ধু বিষয়টি জানতে পেরে বলে, আমি ভুল করেছি। সে আমাকে ফের ভাইভা বোর্ডে যেতে বলে। তত্ক্ষণাৎ বোর্ডে প্রবেশ করে বলি—স্যার, না বুঝে বেতন কম বলে ফেলেছি। আমাকে আরো হাজার দুয়েক টাকা বাড়িয়ে দিন। বোর্ড কর্মকর্তারা বেতন বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করে দেন। বিষয়টি মনে হলে আজও হাসি পায়।

কিছুদিন পর ভাইভার জন্য ডাক পড়ে টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান এরিকসনে। ভাইভা বোর্ডে ছিলেন ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা। একটি স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং দেখিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এতে কয়টি রড আছে? বিষয়টি আমার জন্য সহজ ছিল। খুব দ্রুত হিসাব কষে বলে দিই রডের সংখ্যা। টাওয়ারের আর্থিং নিয়েও প্রশ্ন করেছিলেন। আমার উত্তরে খুশি হয়ে ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা বললেন, ‘ইউ আর ফাইনালি সিলেকটেড।’ পরদিনই আমাকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

পরের ভাইভাটা ছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে। একটি প্রশ্নই করেছিলেন বোর্ড সদস্যরা, তুমি চাকরি করবে? আমি বলেছিলাম, অবশ্যই করব। পরে কিছুক্ষণ আমার সিভি দেখে বোর্ডের সদস্যরা বললেন, ঠিক আছে আসো। এই চাকরিটি হয়নি।

সর্বশেষ ভাইভার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২৯তম বিসিএসে। ভাইভা বোর্ডের প্রথম প্রশ্নটি ছিল—তোমার জন্ম তারিখ ইংরেজিতে বলো। আমি উত্তর দিয়েছিলাম টোয়েন্টিফোর্থ অক্টোবর নাইনটিন এইট্টি। উত্তর শুনে প্রশ্নকর্তা বললেন, তোমার জন্ম তারিখটি আবার বলো। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ভুল বুঝতে পেরে সঠিক উত্তরটি দিয়েছিলাম। বললাম, টোয়েন্টিফোর্থ অক্টোবর নাইনটিন হান্ড্রেড অ্যান্ড এইট্টি। নিজের ভুল সংশোধন করে দ্রুত সঠিক উত্তর দিতে পারায় ভাইভা বোর্ড আমার ওপর খুশি হয়েছিল। এটি পরের সাত-আট মিনিট খুব কাজে দিয়েছে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বিসিএস জেনারেল ক্যাডারে কেন আসতে চাচ্ছি? বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় মনে হয়েছিল, বুয়েটে পড়লে আমার জন্য ভালো হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে জনগণকে বেশি সেবা করার সুযোগ পাব। তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল—ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে আমাদের ভূ-রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত—এটি ইংরেজিতে বলো। আমি বলেছিলাম, আমাদের দেশের তিন দিকেই ভারত। যদিও ভারতের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। তার পরও নিজেদের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। উদাহরণ দিয়ে বলেছিলাম, আজ ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে কাল থেকে দেশে পেঁয়াজের সংকট সৃষ্টি হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এটি দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করছি। অন্যদিকে চীন আমাদের অনুদান দেয় সত্যি, তার পরও চাইলে খানিকটা চীনকে এড়িয়ে চলা সম্ভব। কারণ দেশটি আমাদের থেকে দূরে। আমার উত্তর শুনে প্রশ্নকর্তা খুশি হয়েছিলেন। সব শেষে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ কত? আমি বলেছিলাম, ১২ বিলিয়ন ডলার। উত্তর শুনে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন—টাকায় কত হয়? জবাব দিয়েছিলাম, স্যার কনভার্শন রেট ৮০ দিয়ে গুণ দিলেই হয়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই বোর্ডের সদস্যদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। কারণ তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন ১২ বিলিয়ন ডলারে বাংলাদেশি টাকায় কত হয়? আমার কাছে মনে হয়েছে, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর ও বিনয়ী আচরণের জন্যই সেবার পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছিলাম।

নতুনদের উদ্দেশে বলব, ভাইভার জন্য পোশাক-পরিচ্ছদ, মানসিক প্রস্তুতি ও সাধারণ জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনয়ের সঙ্গে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। অস্পষ্ট, ভুল উত্তর বা কথায় আঞ্চলিকতার প্রভাব প্রশ্নকর্তাদের বিরক্ত করে। কৌশলে বোর্ডকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে বলি, বোর্ডে এমন অনেক প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর বিভিন্নভাবে দেওয়া যায়। উত্তরে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো জানেন, তা যোগ করার চেষ্টা করুন। যেমন—আপনাকে ১৯৭১ নিয়ে বলতে বলা হলো, কিন্তু আপনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিস্তর জানেন। উত্তরে যদি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পত্তন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই। তখন দেখা যাবে, বোর্ড সদস্যরা আপনাকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। 



মন্তব্য