kalerkantho


কেচি গেট ভেদ করে হেঁটে আসা সেই তিনজন...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ জুলাই, ২০১৮ ২১:২৮



কেচি গেট ভেদ করে হেঁটে আসা সেই তিনজন...

প্রতীকি চিত্র

অফিস শেষ হওয়ার পরে প্রায়ই আমার বাইক দিয়ে পাঠাও বা উবারে রাইড শেয়ার করি। ওইদিন দুইটা রাইড খুব ভালোভাবেই শেষ করি। ঘটনাটি ঘটে তৃতীয় রাইডের সময়। তখন ঠিক মাগরিবের আযানের কিছু সময় আগে তৃতীয় নম্বর রাইড শুরু করি। 

এ সময় রাইডার আমার বাইকে উঠেই বলেন, ‘ভাই আমাকে ২০ মিনিট সময় দিবেন? একটা কাজ আছে ওটা সেরে আপনাকে নিয়ে গন্তব্যে যাব। সমস্যা নেই, আপনাকে ভাড়া বাড়িয়ে দিবো।’ 

তখন আমিও ওই ২০ মিনিট সময়কে তেমন সমস্যা মনে না করে রাজি হয়ে গেলাম। বাইক চলতে চলতে হঠাৎ তিনি বললেন ‘ওই’ হাসপাতালটার (সঙ্গত কারণে হাসপাতালটির নাম গোপন রাখা হলো) ভেতর চলুন, ওটার পেছনে আমার একটা কাজ আছে। হাসপাতালটার বাউন্ডারিটা অনেক বড় হওয়ায় অনেকটা ঘুরেই যেতে হলো সেখানে। 

এবার তিনি আমাকে বললেন ‘ভাই এখানে একটু দাঁড়ান, আমি খুব তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে চলে আসছি।’ আমি গাড়িটা সাইড করে দাঁড়ালাম সেখানে। এর মধ্যে আযান শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো।

ওই জায়গাটা ছিল একেবারেই নির্জন। আশপাশে লোকজন তো দূরের কথা- কাকপক্ষিও নেই। ওখানে দাঁড়িয়ে ধারণা করলাম লোকটা কোনো একটা ডেভলপার কম্পানিতে কাজ করে তাই নির্মাণাধীন ভবনে হয়তো কোনো কাজ আছে তার। যাইহোক, দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে। 

কিছুক্ষণ পরেই ওই রাইডার লোকটা যে ভবনে ঢুকেছে তার উল্টো পাশের একটা ভবন থেকে তিনটা লোক আসতে দেখলাম আমার দিকে। দেখে মনে হলো তারা খুব ক্লান্ত। তারা নিজেদের মধ্যে আস্তে আস্তে কথা বলতে বলতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। 

তাদের মধ্যে একজন আমাকে বললো ‘কি ভাই, কি করেন এখানে? ভালো আছেন তো, নাকি আমাদের মতো’ এটা বলেই ক্লান্ত হাসি তার। আমি ভাবলাম হয়তো নেশা একটু বেশিই করেছে তাই উলটা-পালটা বকছে। 

আমি বললাম- ‘ধূর মিয়া! সবাইকে কি আপনাদের মতো পাগল ভাবেন নাকি? তাদের মধ্যে একজন বললো-‘রেগে যাচ্ছেন কেন ভাই! আমরা তো সবাই মানুষ, একদিন তো সবাইকেই মরে যেতে হবে। আপনি কী করেন ভাই?’

প্রশ্নের উত্তর দিব কি, তাদের শরীর থেকে প্রচুর দুর্গন্ধ আসছে, তাই এখান থেকে দৌঁড়ে পালাতে পারলে বেঁচে যেতাম বলে মনে হচ্ছে আমার। যাইহোক, তাদের প্রশ্নের উত্তরটা সংক্ষিপ্ত আকারে দিলাম। তখন তাদের দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম আমি যখন কথা বলি তখন তারা আমার দিকে তিনজনই খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় তারা চোখের কোনো পলকই দেয় না। 

আমি বললাম, আপনারা কী করেন? কোথায় থাকেন? আপনারা তো মনে হয় নেশা করেছেন? আমার প্রশ্ন কয়টা শুনে তারা শুধু হাসতে থাকে। এমন হাসি প্রায় ২ থেকে তিন মিনিট চলে। পরে একজন বললো-‘কিছুই করি না।’ আবার অন্যজনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, ‘এই তুমি কিছু করো নাকি? ওতো কোনো কাজই করতে পারে না।’ এরপর হা হা হা করে আবার হাসতে থাকে তিনজনেই। 

এসময় আরেকজন বললেন ‘নেশাতো দুনিয়ার সবাই করে, আপনিও করেন, ভেবে দেখেন।’ আর কোথায় থাকি সেটাতো বলবো না!’ এই বলে আবার হাহাহা করে হাসতে থাকলো তারা। এবারও ২ থেকে তিন মিনিট ধরে হাসতেই থাকলো। এরপরে কোনো কথা না বলে হাসতে হাসতে যে ভবন থেকে বের হয়েছিল তারা সেই ভবনে আবার ঢুকে পড়লো। 

কিছুক্ষন আবার একা দাঁড়িয়ে থেকে একটু এগিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম তারা কোথায় ঢুকলো। তাকিয়ে দেখে এমন ভয় পেলাম যে আমার জীবনে এতো বড় ভয় আমি কখনো পাইনি। শরীরে ঝিন ঝিন শুরু হয়ে গেছে। মেশিনের মতো শরীর কাঁপছে। দেখলাম একটা কেচি গেট, বড় একটা তালা লাগানো ওই গেটে। ওপরের দিকে বড় করে লেখা ‘মর্গ’... হাসপাতাল, ...ঢাকা, বাংলাদেশ। 

মোটামুটি দৌড়ের মতো হেঁটে বাইকের কাছে গিয়ে ফোন দিলাম সেই রাইডার লোকটাকে। বললাম ‘ভাই আপনাকে সময় দিলাম দুই মিনিট। এর মধ্যে না এলে আমি চলে যাবো।’ তিনি বললেন- ‘আমার আসতে সময় লাগবে আর ৩০ সেকেন্ড, এইতো হাঁটছি, আপনার কাছাকাছিই আছি।’

তাকে বাইকে তুলে বললাম, এখানে কি একা একা দাঁড়িয়ে থাকা যায়, ভাই? আমি তো সেই রকমরে ভয় পাইছি! 

জবাবে তিনি বললেন- ওহ! স্যরি ভাই। আপনাকেও আমার সঙ্গে ভেতরে নেয়া উচিৎ ছিল, ভয় পাওয়ারই কথা। কারণ, সামনে একটা মর্গ আছে। 

যাইহোক তাকে আর বিস্তারিত কিছুই বললাম না। তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে সোজা বাসায় চলে গেলাম।

এমন ঘটনার মুখে আর পড়তে চাই না সজ্ঞানে। 

-এম সুজন আকন



মন্তব্য