kalerkantho


বিশু বলতো, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে পড়ে থাকে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ মার্চ, ২০১৭ ২৩:১৬



বিশু বলতো, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে পড়ে থাকে

প্রতীকি চিত্র

                                                                                                    (১)

বার ছোটবেলাগুলোতে অদ্ভুত কিছু কিছু ধারণা আর বিশ্বাস থাকে। এগুলোর অধিকাংশই সমবয়েসীদের কাছে শোনা বা তাদের থেকে শেখা। রতনেরও এরকম কিছু ধারণা আর বিশ্বাস এখনো আছে। ছোটবেলায় পুরাতন ঢাকার আরমানিটোলায় থাকতো ওরা। আরমানিটোলা মাঠের পূর্বকোণে দুটা স্কুল ছিল। ছিল মানে এখনো আছে। 

রতনরা থাকত বেচারাম দেউড়ীতে। বেচারাম দেউড়ী আর চারপাশের এলাকার ছেলেপুলেরা মাঠের পূর্বকোণের যে দুটা স্কুল, সেদুটোর কোন না কোনটাতেই পড়ত। স্কুল ভিন্ন হলেও সমবয়সী সবাই ছিল বন্ধু। রতনের বন্ধু নয়ন ছিল একটু গম্ভীর ধরণের । ক্লাশ সেভেনে পড়লেও বাকী সবার চেয়ে একটু ভারিক্কি ছিল তার আচরণ। এর কারণ হয়তো ছিল তার জ্ঞান-গম্যি। নয়ন প্রচুর বই পড়ত। 

আরমানিটোলা মাঠের পাশেই বাংলাদেশ পরিষদের একটা পাঠাগার ছিল। নয়ন প্রতিদিন বিকেল বেলা সেখানে বই পড়তে যেত। ওর বাদবাকি বন্ধুদের মধ্যে বিশু ছিল একটু ইঁচড়ে পাকা, খুব বানিয়ে বানিয়ে কথা বলত। যা কিছুই বলত, তার সবই দেখা যেত বানিয়ে বানিয়ে আর বাড়িয়ে বলছে। বিশু নিজেও বুঝত না যে, সবাই তার কথা মোটেই বিশ্বাস করছে না। সবাই তাকে এজন্যে মুখের উপর চাপাবাজ বলত।  রুবেল ছিল খুব চালাক। কথাবার্তায় বুঝা যেত না। কিন্তু রাজ্যের যতো দুষ্টামী, সব থাকত তার মাথায়। সারাক্ষণ কাকে কীভাবে অপ্রস্তুত করা যায় সেসব নিয়ে সে রীতিমতো গবেষণা করত।

আরমানিটোলা এলাকাটা তখনো ট্রান্সপোর্টের এলাকা ছিল, এখনো আছে। দিনভর কেবল ট্রাক আর ট্রাক। সেসময়কার দিনগুলোতে অবশ্য ট্রাক কম ছিল। এখনতো দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা সে জায়গাটা জ্যাম হয়ে থাকে ট্রাকের কারণে।
                                                                                         (২)
সেই ছোটবেলায় বিশু বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু বললেও কিছু কিছু বিষয় মাথার মধ্যে এক্কেবারে গেঁথে আছে এখনো রতনের। সেগুলো অনেকটা ধারণাগত বিশ্বাস হয়ে গেছে, বোধহয়। সকালে বাসায় ফেরার সময় নিজেদের গলির উল্টা দিকের ডাস্টবিনের পাশে একটা মরা কাক দেখেই বিশুর কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় বিশু বলত, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়। কী অদ্ভুত কথা। কোথায় যে বিশু এসব পেতো! সাথে সাথে আরেকটা কথা মনে পড়ল। আরমানিটোলায় তখন একটা বিশাল বটগাছ ছিল। পাশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের, ও নাহ; তখন ওটা কলেজ ছিল। তাদের একটা হোস্টেলও ছিল এখানটায়। নাম ছিল আবদুর রহমান হল।  

এই বটগাছের পাশেই জোনাকী ট্রান্সপোর্ট আর তার পাশে একটা হিন্দু হোটেল ছিল, সেটার নামও ছিল বটতলা হিন্দু হোটেল। এই জায়গাটায় কারা যেন দুটা না তিনটা কুকুর পালত। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় রতনের রাস্তায় পড়ত কুকুরগুলো। কুকুরকে এমনিতেই খুব ভয় পায় সে। এখনো সেই ভয় আছে। তখন প্রতিদিন কুকুরগুলোকে পার হওয়া বা পাশ কাটিয়ে যাওয়াটা ছিল একটা ভয়ানক দুঃসাহসের কাজ। কিন্তু রতন সব সময়েই দেখত, বিশু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে কুকুরগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিশুর এত সাহস দেখে রতন তাকে রীতিমতো হিংসে করত। 

এ ব্যাপারটা বিশু অবশ্য বুঝত। পরে সে একদিন রতনকে বলল, তুই যদি আমাকে বেলালের চটপটি খাওয়াস, তবে আমি তোকে শিখিয়ে দেব- কিভাবে কুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। 

বিশুরদাবি মতে, এমনকি কুকুর যদি পাগলাও হয়, তবুও সে নাকি কামড়াবে না! অতি লোভনীয় প্রস্তাব।

রতন অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করল চটপটি খাওয়ানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পরে আহমেদ বাওয়ানী স্কুলের সামনে বেলালের দোকানে গিয়ে বিশুকে ফুচকা খাইয়ে কায়দাটা শিখে নিয়েছিল রতন। 

বুদ্ধিটা ছিল এরকম যে, কুকুরের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ডান হাতের বুড়ো আংগুলের ডগাটা অনামিকার দ্বিতীয় ভাঁজে  ছুয়ে থাকতে হবে। মানে আংগুলে সাত গুনতে গেলে বুড়ো আংগুল যেখানটা ছুঁয়ে থাকে, সেখানে ছুঁয়ে হেঁটে যেতে হবে। এতে নাকি কুকুর কখনো কামড়ায় না। আজব এসব জিনিষ বিশু যে কোথায় পেত, এখনো রতন ভেবে পায় না! নয়ন আর রুবেল এগুলো শুনে খুব হাসাহাসি করত। রতনও হাসত। 

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপারটা অন্যখানে। রতন এখনো রাস্তায় কুকুর দেখলে হাতের আংগুলগুলোকে সেরকম করে কুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। রাস্তার কুকুর দেখে সে এখন মোটেই ভয় পায়না। আর মরা কাক দেখলেই মরা ভূতের কথা ভেবে বিশুর কথা মনে পড়ে যায়। এই যেমন এই সকাল বেলাতেই আজ বিশুর কথা মনে পড়ে গেল।
                
                                                                                             (৩)
রতন একটা আইটি ফার্মের কর্ণধার। নিজে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন প্রোগ্রামার। বিদেশে কিছুদিন কাজ করে হঠাৎই মনে হলো বিদেশে এতসব পরিশ্রম করে কী হবে? নিজ দেশে চলে এলেইতো হয়। যেই ভাবনা, তেমনিই কাজ শুরু করল। ছয়মাসের মাথায় আমেরিকার পাট চুকিয়ে সোজা ঢাকায়। 

বউটা প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও পরে সব মেনে নিয়েছে। বাইরের একটা বড় কোম্পানির একটা বড় প্রজেক্টের কাজ করছে সে। মগবাজারে বিশাল অফিস করেছে। সারারাত একদল চটপটে- দক্ষ কর্মী কাজ করে। দিনের বেলাতেই বরং তার অফিস একটু ঠাণ্ডা। নিজে প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে অফিসে যায়, সারারাত থাকে, ভোর বেলা চলে আসে। গত পাঁচ মাস ধরে এভাবেই যাচ্ছে। 

সন্ধ্যার পর পর বন্ধুরা আসে, ঘণ্টা খানেক থাকে তারপর চলে যায়। সেও সবাইকে বলে দিয়েছে যে, যদি কেউ আসেই, রাত নটার পর থেকে কোন আড্ডা নয়। অফিস মানে কাজ, সে এটা সফলভাবে প্রিয় স্যাঙাতদের সবাইকে বুঝিয়ে দিতে পেরেছে-এটা একটা স্বস্তির ব্যাপার। মাঝে মাঝে রাতদুপুরে অনলাইনে জরুরি কিছু ভিডিও কনফারেন্সও করতে হয়। সব মিলিয়ে রাতে অফিস করাটাই এ প্রজেক্টের জন্যে সুবিধাজনক, অবস্থাটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছে- এটা স্বস্তির ব্যাপার।

                                                                                            (৪)
রাত আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে মাঝে মাঝে রতন অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসে। মিনিট দশেক হাঁটে। সিগ্রেট খায়। আজও বের হল। বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মগবাজার রেলক্রসিংয়ের উপর এসে দাঁড়ালো। 
রেললাইনের উপর দাঁড়াতে রতনের বেশ ভাল লাগে। নিজের মধ্যে কেমন একটা ‘থ্রিলিং’ ভাব আসে। এই ট্রেন লাইন, কত হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে করে এদিক ওদিক যায়- সবাই এই লাইন ধরেই চলে।

আচ্ছা, যদি এমন নিয়ম হতো যে, মানুষ যেখানেই যাকনা কেন সবাইকে এই লাইন ধরেই যেতে হবে এবং সবাইকে হেঁটেই যেতে হবে-  কী অবস্থাটাই না হতো তখন! দিনরাত মানুষে গিজগিজ করত এই লাইনটা। আর ঠিক এই লাইনের উপরেই সে এখন দাঁড়িয়ে আছে। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে ট্রেন লাইনে দাঁড়িয়ে রইল রতন, স্থানূর মতো।

এত রাতে এখানে কী করছেন? কে যেন জিজ্ঞেস করতেই সম্বিত ফিরে পেল রতন।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তার পেছনেই একটা লোক, মোটামুটি বেশভূষা। মধ্যবিত্ত চেহারা। এত রাতে এ লোক এখানে কোথা থেকে এল, ভাবনাটা মাথায় আসতেই আবার ভাবল- তার মতোই কেউ বুঝি। আশেপাশে কাজ করছে আর এখন বুঝি হাঁটতে বেরিয়েছে।

-না, মানে এমনিই এলাম। স্মিত হেসে রতন বলল।

এভাবে রেললাইনের উপর দাঁড়াতে নেই। বিশেষ করে রাতের বেলা। লোকটা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল।

অদ্ভুত কথাতো। এটা কেমন কথা। রাতের বেলা এমনিতেই লোকজন নাই, ট্রেন যায় কালে ভদ্রে। তার মধ্যে সমস্যাটা কোথায়? মনে মনে এসব ভেবে রতন জিজ্ঞেস করে, দাঁড়াতে নেই কেন? এখন তো ট্রেনও নাই, রাস্তায় গাড়িঘোড়া নাই, চারদিকে লোকজনও নাই। এখন এ লাইনের উপর দাঁড়াতে সমস্যা কোথায়?

- না, মানে আপনি আমার চলার পথ আটকে রেখেছেন তো, তাই বললাম। লোকটার কণ্ঠ আগের মতোই নির্লিপ্ত।

- ওহ, স্যরি, আপনি এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন! স্যরি, স্যরি। আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। আপনি যান। কথার ভঙ্গিতে রতন কিছুটা অতিরিক্ত সৌজন্য দেখায় এবার।

- না, ভাই। শুধু আমার জন্যে সরে দাঁড়ালে তো চলবে না। শুধু আমি একা নই। আমার সাথে আরো অনেকেই আছে।
লোকটার জবাব শুনে অবাক হয়ে রতন বলল- ভাই, আমিতো দেখছি আপনি একা লোক। বাকী কাউকে তো দেখছিনা!

-আপনি একটু সরে গিয়ে দাঁড়ান। তাহলেই দেখতে পাবেন। লোকটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেও রতন কিছু বলল না। কি মনে করে রেললাইন থেকে নেমে দাঁড়ালো।

একটু পরেই অবাক হয়ে দেখল, কাওরান বাজারের দিক থেকে অনেক অনেক লোক রেললাইন ধরে এগিয়ে আসছে। ঠিক ঠিক অবাক হয়ে গেল রতন।

অনেকটা ঠিক এরকমই কিছু একটা না সে ভাবছিল একটু আগে। মগাবাজারের দিক থেকে আসা রাস্তাটায় যেখানে  রেলক্রসিং হয়েছে ঠিক সেখানেই রাস্তার মাঝে সে রেললাইন থেকে সরে ফ্লাইওভারের নিচের আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে।

যে লোকটা তাকে সরে যেতে বলেছিল, সে কাওরান বাজারের দিকে এগিয়ে গিয়ে সঙ্গীদের সবাইকে ডেকে আনল।
তারপর একটা অপার্থিব ধীর গতিতে সবাই সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে এল। সবার প্রথমে সেই লোকটা, যে তার সাথে কথা বলেছিল।

সারিবদ্ধ লোকগুলো এগিয়ে আসছে। সেই লোকটা যখন তার সামনে দিয়ে পার হচ্ছিল, কি মনে করে রতন তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কারা ভাই? এতরাতে একসাথে কোথায় যাচ্ছেন?

- ভাই আমরা বিভিন্ন সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলাম। আমরা তো গাড়িতে উঠতে পারিনা। তাই পায়ে হেঁটে বাড়ি যাচ্ছি। লোকটা বলল।

একথা শুনেই রতনের মাথাটা ঘুরে গেল। ও তাহলে কাদের সাথে কথা বলছিল এতক্ষণ! এরা তাহলে কেউই মানুষ না!

ঠিক এসময়েই মগবাজারের দিক থেকে মাঝরাতের ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ঊর্ধশ্বাসে একটা গাড়ি ছুটে এল। রাস্তার উপর রেললাইনে এতগুলো লোক দেখেও গাড়িটা স্পিড কমালো না। ভৌতিক মানুষগুলো সবাই গাড়িটা দেখে সরে দাঁড়ালেও একজন সরে যেতে পারল না। গাড়ির ধাক্কায় সে মানুষটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই ছিটকে এসে রতনের ঠিক পাশেই গোত্তা খেয়ে পড়ল। মাথাটা আইল্যান্ডে ঠুকরে গেল সরাসরি। রতন বুঝল- মানুষ হয়ে থাকলে এ তো সাথে সাথেই শেষ। আর সহ্য করতে পারল না। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল তার।

                                                                                             (৫)
রাত সাড়ে তিনটার দিকে রমনা থানার পেট্রোল পুলিশ মগবাজার রেলক্রসিং এ মাথা থেঁতলে যাওয়া একটা মরা কাকের পাশে একজন লোককে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখল।

রতনকে গাড়িতে তুলেই পেট্রোল পুলিশের কমান্ডার এসআই সাইফুল ওয়্যারলেস থানার ডিউটি অফিসারকে জানাল 
- স্যার, রেললাইনের পাশে একজন পড়ে আছে। জ্ঞান নাই, তবে বেঁচে আছে। দেখতে ভদ্রলোকই মনে হচ্ছে, মনে হয় অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েছিল। 

কোনো স্ট্যাব, আঘাত? জিনিসপত্র মানে মানিব্যাগ, মোবাইল...

কোনো আঘাত নাই, স্যার। কিন্তু সঙ্গে মোবাইল, মানিব্যাগ সবই আছে। এখন ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাচ্ছি। জ্ঞান ফিরলে বিস্তারিত জানতে পারব।

 

  



মন্তব্য