kalerkantho


ড্রাইভার মুসা ও এজাজের ‘তৃতীয় সূত্র’

জুয়েল সেনোবা   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০৩:০৯



ড্রাইভার মুসা ও এজাজের ‘তৃতীয় সূত্র’

সব ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে!

কোন বিজ্ঞানীর কয় নম্বর সূত্র যেন এটা? মনে পড়ছে না এজাজের। কিন্তু গত কয়দিন ধরে জিনিসটা মাথায় হুদাই চক্কর খাচ্ছে। ভুলতে পারছে না।
 
এদিকে, আজও অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গেল। পত্রিকা অফিসের চাকরিতে মাঝে মাঝে গভীর রাত করে বাড়ি ফিরতে হবে- এটা স্বাভাবিক। তার ওপর এজাজ অনলাইন সেকশনে কাজ করে। কাজেই তার অফিসের সময়টা একটু অদ্ভূত ধরণের।  

লাইভ নিউজ পোস্ট করার ব্যাপারটা অনলাইনে খুব গুরুত্বপুর্ণ। এর সাথে সাথে প্রতিদিন পত্রিকার ই-পেপার ভার্সনে কী পরিমাণ ট্রাফিক এলো, কতজন ইউনিক ভিজিটর, বা কোন নিউজে আজ হিট বেশি হয়েছে, এগুলো তো আছেই। আর যাই হোক, পত্রিকার সাইট র‍্যাংকিং নামতে পারবেনা। এটা হলে ম্যানেজমেন্টের কাছে শত ব্যাখ্যা দিয়েও পার পাওয়া যায় না।

এগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে রিপোর্টারদের ফোন, মেইল এসব তো আছেই।  

পত্রিকার অনলাইন সেকশনটা সারাক্ষণ যেন একটা সরগরম পরিস্থিতির ভেতর থাকে। এই ফোন বাজছে, কেউ মেইলে আসা নিউজ পড়ছে, এদিকে নিউজ এসেছে, ছবি দেয়নি কেন- এজন্যে কেউ কেউ মোবাইলে করেসপন্ডেন্টের সাথে কথা বলছে, খেপে যাচ্ছে, কখনো বা নিজেদের ভুলে কোনোকিছু মুছে ফেলার পর উল্টো মফস্বল প্রতিনিধিকে সেলফোনে রীতমতো তেলমর্দন- লক্ষী ভাই, আরেকবার পাঠান! 

ওদিকে ক্রিয়েটিভ কন্টেন্ট রাইটাররা মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে চারপাশ দেখে, এরপর কিছুই হয়নি ভাব নিয়ে ফের মনিটর-কীবোর্ড-মাউজ নিয়ে বিভোর। তারা হয়তো ভাবে যে, চারপাশের সবাইকে এক বাটনে যদি মিউট করে দেয়া যেত, তাহলে কাজে মন বসাতে সুবিধা হতো।
 
বাসায় বউটা আজও রাগ করবে, আবার এত রাতে শিউলীর রাগ ভাঙানোর জন্যে কিছু যে কিনবে, তারও জো নেই- ভাবতে ভাবতে অফিসে থেকে বেরিয়ে এল এজাজ। শিউলী খুব চায় যে, এজাজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসুক। সারাদিনে সাত আটটা বাক্য ছাড়া কথাও হয় না। এজাজ এটা খুব ভাল বুঝে। কিন্তু কি করবে! পত্রিকার চাকুরী অন্য সব চাকুরীর চেয়ে আলাদা। অফিসের নীচ তলায় মাইক্রোটা দাঁড়িয়ে আছে। অফিস থেকে বাসায় আসা যাওয়ার জন্যে গাড়ি দিয়েছে। গাড়িটা একটু পুরাতন। অসুবিধা কি, তবুও তো গাড়ি। ড্রাইভারটা হয়ত পাশে ড্রাইভারদের রেস্ট রুমে ঘুমুচ্ছে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে- এসময়ে আবার মনে পড়লো কথাটা। রাত জেগে গাড়ি চালালে এমন তো হবেই! তার মানে প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া এটা। কিন্তু এরপর এজাজের ফের মনে পড়লো- কিন্তু এজন্য তো ওরা দিনে ঘুমায়। তাইলে, রাতে আবার ফের এই ‘ওভারটাইম ঘুমের’ চেষ্টা কেন! মদ-তাড়ি বা গাঁজা-টাজা খায় মনে হয়, মনে মনে ভাবে এজাজ।

কিন্তু প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটা সমান... কে যেন বলছে এই কথাটা, মনেই করতে পারে না এজাজ। কলিগদের কাউকে জিজ্ঞেস করলেই হয়, কিন্তু সবাই ভাববে, শালা এই বিষয়টাও জানে না! গুগলে খোঁজ করলে তো আধা সেকেন্ডেই জানা যায়। কিন্তু গত কয়দিনে যে কয়বার পিসি অফ করেছে তারপরই মনে পড়েছে এটা। আর মোবাইলে নেট থাকলেও তার ব্রাউজার গণ্ডগোল করছে, তাই তাতেও সার্চ দেয়া হয়ে উঠে না। মোবাইলটা বদলাতে হবে।    

সাত-পাঁচ এসব ভাবতে ভাবতে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে এজাজ সিকিউরিটিকে হাঁক দেয়- ড্রাইভার মুসাকে ডেকে দাও। সিগ্রেট যখন আধখানা, তখন চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে প্রায় ঝিমোতে ঝিমোতে লাটসাহেব মুসা এসে হাজির। এসেই বলল
: স্যার, চলেন।

রাগ করে ধমক লাগাতে গিয়েও কী মনে করে মুসাকে কিছু না বলে সুবোধ বালকের মতো গাড়িতে উঠে বসল এজাজ।

বরাবরের মতো দুই বারের মাথায় গাড়িটা স্টার্ট নিল।  

গাড়ি চলতে চলতে এজাজের হঠাৎ মনে হলো, হাতের সিগ্রেটটার ছাই ফেলতে হবে। ভাবতে ভাবতে জানালা দিয়ে হাত বাড়াতেই চমকে গেল। এত অন্ধকার কেন চারপাশ? লোড শেডিং নাকি!

লোড শেডিং হলেও চারপাশের বাড়িগুলোতে তো আলো জ্বলে! এ এলাকা তো ধনীদের এলাকা। ঘরে ঘরে  আইপিএস আছে।  

গাড়ি চলতে চলতে এজাজ চারপাশে ভাল করে দেখল। অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এত অন্ধকার কেন সব, আজ? 

রাস্তায়ও তো কোনো আলো-ই নেই। ল্যাম্পপোস্টের একটা আলোও তো দেখা যাচ্ছে না যদ্দূর চোখ যায়! কোথায় এখন গাড়িটা? এমনতো কখনো হয়না। কিছু হয়েছে নাকি আজ ঢাকা শহরে? পুরো ব্ল্যাক আউটের মতো অবস্থা!

সামনে কিছু দেখা যাচ্ছে না।  মুসা কীভাবে রাস্তা ধরে এগোচ্ছে? আচ্ছা, মুসা গাড়ির হেডলাইট জ্বালালো না কেন? অবাক কাণ্ড, মুসা কীভাবে চালাচ্ছে তাহলে? 
 
: স্যার, কর্তৃপক্ষকে বলেন গাড়িটা একটু মেন্টেনেন্স করার জন্যে। দেখেন, আজ হেডলাইটগুলোও জ্বলছে না। যেন এজাজের মনের কথা বুঝতে পেরেই মুসা কথাটা বলল।
 
মুসা কিভাবে ওর মনের কথা বুঝতে পারল? চমকে উঠল এজাজ। আচমকা রাজ্যের ভয় এসে তাকে গ্রাস করল। গভীর আঁধার, মুসাকেও ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না।  
এদিকে মুসা বলল
: স্যার, কী ভাবছেন? 
এজাজ যেন একটু ভরসা পেল। সাহস করে বলল- না, কিছু না।
: স্যার, একটা কথা বলি? 
: বল। আনমনে এজাজ বলল।
: ছোটবেলায় পুরান ঢাকায় যখন থাকতেন, তখন কি আপনি খুব দুষ্টু ছিলেন? 
: হ্যাঁ, তা ছিলাম। প্রশ্নটার ধরণ শুনে অবাক হলেও সাদামাটা জবাব দিল।
: স্যার, আপনি আপনার ক্লাসমেট জামালকে কলম দিয়ে খোঁচা দিয়ে উনার একটা চোখের খুব ক্ষতি করেছিলেন?
এক অজানা ভয়ে সারা শরীর মুহূর্তেই ঘামে ভিজে গেল এজাজের। এ ঘটনা মুসা কীভাবে জানল!
: ত তু তুমি একথা জানলে কেমন করে?
সামনে নিকশ অন্ধকারে এক অদ্ভূত গলা ভেসে এল, যেন সেই ছোটবেলার জামালের গলা- চিনতে পারলিনা, দোস্ত? আমিই তো জামাল।
এজাজ পাথরের মূর্তি হয়ে গেল, যেন কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যাওয়ার অবস্থা।  

নিকষ অন্ধকারে ড্রাইভার মুসার জায়গা থেকে এবার যেন অন্য লোকের গলা ভেসে এল। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে শিউলীর সাথে প্রেম করতে করতেও সুমিত্রা নামে একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক করেছেন। পরে শিউলীর সাথে বিয়ে হবার সংবাদ পেয়ে মেয়েটা সুইসাইড করেছিল।
: ত তু তু তুমি এসব জানো কেমন করে? ভয়ে হীম হয়ে যাওয়া এজাজ অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল।

অচেনা স্বর তখনো বলেই যাচ্ছে- শনিবার বিকেল বেলায় অফিস থেকে বেরিয়ে কার কাছে যান, সে খবর তো শিউলী ম্যাডাম জানে। কিন্তু সংসারের মায়ায় আপনাকে কিছু বলে না।
: থামো। থামো। গাড়ি থামাও। গাড়ি থামাও! বলেই এজাজ গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করতে লাগল- বাঁচাও, বাঁচাও।
 
: বাসায় যাবেন না, এজাজ ভাই? চলেন। আজ খুব ধকল গেছে আপনার ওপর, বস। চলেন চলেন। বাইরের তাজা বাতাস দরকার। সহকর্মী সগিরের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেয়েই লজ্জায় লাল পেয়ে গেল কালোমতো দেখতে এজাজ। ক্লান্তিতে কখন যেন ডেস্কেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
 
: স্বপ্ন দেখছিলেন বুঝি? নাকি শরীর খারাপ করেছে? ঘেমে গেছেন একেবারে। চলেন রাত দেড়টা বেজে গেছে। উঠেন, ভাই।  
ভাল লজ্জাই লাগছে এজাজের। এরকম কখনো হয়না।

শরীর নড়তে চাইছে না। ভেতর ভেতর স্বপ্নে দেখা পরিস্থিতিটা তাকে এখনো আতংকের ঘোরে রেখেছে।  

নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও ব্যাগটা গুছিয়ে নিচে নামতেই দেখল মুসা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুসাকে দেখেই বুকটা কেন যেন ছ্যাঁত করে উঠল।
কেন যেন মুসার চোখের দিকে তাকাতেও পারছেনা। এ লোকটা সত্যিই কি সব জানে তার! ধূর, নাহ। ওটাতো স্বপ্ন ছিল!
 
সগির আর সে পাশাপাশি বসেছে। গাড়িটা গুলশান আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে চলছে।
সগির হঠাৎ বলল
: বস, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? 
: বলো। এজাজ বলল।
: জামালের চোখটা নষ্ট করে দিয়েছিলেন একেবারেই? প্রশ্নটা শুনতেই আবার তীব্র আতংক ছেয়ে ধরল এজাজকে।
প্রায় সাথে সাথেই ড্রাইভার মুসাও সামনে থেকে ঘাড় না ফিরিয়েই বলল
: সুমিত্রার সুইসাইডের ব্যাপারটাও জিজ্ঞেস করেন, স্যার।


চারদিক হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল, নাকি সে জ্ঞান হারালো– এজাজ নিজেও জানেনা। তবে এসময়ে ফের গত কয়দিন ধরে মাথায় চক্কর দেওয়া লাইনটা যেন বেজে উঠলো ভাঙা রেকর্ডের মতো- প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীত... ব্যাটা নিউটন...তাহলে তুমিই সেই লোক...


মন্তব্য