kalerkantho


ঘোস্ট লেবার

বোরহানউদ্দিন মাহমুদ   

৪ মার্চ, ২০১৭ ২২:৫২



ঘোস্ট লেবার

গার্মেন্টে কাজ করাটা অদ্ভুত এক কষ্টের। তা সে শ্রমিক হোক বা কর্মকর্তা হোক। সাভারের জিরাবোতে এমনি একটা  কারখানায় অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার হিসেবে জাফর চাকরি করে। করে বলতে সেও বেশি দিন নয়, মাত্র তিন মাস হলো।  

এই গত বছর অ্যাকাউন্টস-এ অনার্স পাশ করার পর থেকে হন্যে হয়ে একটা চাকরি খুঁজছিল সে। কত জায়গায় যে ইন্টারভিউ দিয়েছে তার হিসাব নাই। কেউ কেউ অবশ্য বলেছিল, মাস্টার্সটা শেষ করে তারপর যেন চাকরি খুঁজে ।  

কিন্তু অনেক হিসেব নিকেশ করে জাফর দেখল, এখন চাকরিতে জয়েন করতে পারলে যে বেতন পাবে, মাস্টার্স পাশ করার পরও সে বেতনই পাবে। মাঝে আরো বছর দুয়েক বাবা মায়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে।  

বাড়িতে সে ছাড়াও আরো তিন ভাই বোন আছে, সবাই ছোট এবং লেখাপড়া করছে। উপজেলা অফিসের কেরানি বাবার জন্যে একটা বড় বোঝা সব ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ যোগানো।

জাফর অবশ্য যত কম পারা যায়, তত কম প্রেশার দিয়েছে তার বাবাকে। লেখাপড়ার পাশাপাশি দুটা টিউশনি করেছে সে। এতে একটা সময় পর সে নিজের খরচের সিংহভাগ নিজে চালিয়েছে।

এই গার্মেন্টের চাকরিটা ছিল অদ্ভূত। এখানে সে ইন্টারভিউ দিতে আসেনি। যখন দিনের পর দিন সে চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন; এই মাস চারেক আগে তারই ক্লাসমেট শরিফের সঙ্গে একদিন রাস্তায় দেখা। কথায় কথায় শরিফকে বলে যে সে কাজ খুঁজছে।  

শরিফ তখুনি ফোন করে এখানে চাকরিটা যোগাড় করে দিয়েছে। এ গার্মেন্টটা নাকি তার ফুপার। শরিফকে ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ হয়নি। এ ঘটনাটা হয়তো ওর জন্যে একটা সাধারণ ঘটনা, তবে এটি জাফরের জীবনটা পালটে দিয়েছে।

এখানে চাকরির একটা ব্যাপার খুব অদ্ভূত লাগে জাফরের। চাকরি নিয়ে তার ভেতর অনেক ফ্যান্টাসি ছিল, তারপর এই ফ্যাক্টরিতে যোগ দেবার পর সে সব ফ্যান্টাসি ইতোমধ্যে মাথা থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। সকালে সবাই নির্দিষ্ট টাইমে অফিসে আসে, সময়মতো না এলে জরিমানাও হয়, তিনদিন দেরি হলে একদিন অনুপস্থিত ধরা হয়। কিন্তু অফিসটা কখন শেষ হয়, সেটা সে এখনো বুঝতে পারেনি।  

কাগজ কলমে বিকেল পাঁচটায় দায়িত্ব শেষ হবার কথা অফিসারদের। সেটা নিয়েই তার যতো কনফিউশন। শ্রমিকরা তাদের শিফট অনুযায়ী কাজ করে চলে যায়। এক দল থেকে যায় এবং তারপর তাদের কেউ কেউ কাজ করে ওভারটাইমের জন্যে। কিন্তু অফিসারদের ডেস্কের কাজ যতক্ষণ না শেষ হয়, ততক্ষণ অফিস চলতেই থাকে। সপ্তাহে তিন/ চারদিন অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে রাত নটা বেজে যায়।

এগুলোতে অবশ্য জাফর এখন মানিয়ে নিয়েছে। প্রথমে মনে করেছিল, এখানে চাকরি করতে করতে বিসিএসের জন্যে পড়াশোনা করবে। এখন সে চিন্তা ছেড়ে দিয়েছে। খেয়েপরে দিন চলছে এখন, আপাতত এ নিয়েই থাকি- এরকম একটা চিন্তা এখন তার মাথায়।  

মাসের শেষ দিকে কাজের চাপটা বেশি থাকে। শ্রমিকদের বেতন এবং সেগুলোর হিসেব-নিকেশের জন্যে এক্সেল শিট তৈরি করা। প্রথম প্রথম কিছু সমস্যা হচ্ছিল, তার কাছে বিরাট বোঝার মতো মনে হয়েছিল। কয়েক হাজার লোকের বেতনের কাগজপত্র বানানো তো চাট্টিখানি কথা নয়!

সবকিছু ঠিকমতোই চলছিল। সমস্যাটা শুরু হয়েছে এ মাসের প্রথম দিকে। কী মনে করে সে শ্রমিকদের বেতনের কাগজপত্রগুলো চেক করছিল। সবাই যার যার নামের পাশে দেয়া টাকার অংকের পাশে স্বাক্ষর করে। তালিকাগুলো দেখতে দেখতে সে হঠাৎ লক্ষ্য করল যে, বেশ কিছু স্বাক্ষর দেখতে মনে হয় যেন একজন লোকই করেছে।  

ব্যাপারটা দেখে সে কৌতূহলী হয়ে সেকশন অনুযায়ী কাগজগুলো নিয়ে দেখল এরকম আরো আছে। কী মনে করে সে এইচ আর থেকে মোট লেবার কতজন, সেটা এনে দেখল, তাদের তালিকা অনুযায়ী সবই ঠিক আছে। কিন্তু মনের ভেতর থেকে কাঁটার মতো খচখচানিটা গেল না। লোক যদি আলাদা হয়, তবে হাতের লেখা একরকম হলো কেন? নাহ! বিষয়টা জানতেই হবে। এবার একটা সেকশনে গিয়ে সে সেকশনের নামের তালিকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটা নাম ধরে লোক খুঁজল। যা ভেবেছিল তাই, ওই নামে এখানে কোনো লোকই নাই। তাহলে এসব নামে বেতন কারা নিচ্ছে মাস মাস? ভাবতেই ভয়ে তার হাত পা ঠাণ্ডা হবার যোগাড়। কারণ, বেতনের কাগজতো সেই বানায়।

ব্যাপারটা এমন যে, কাউকে বলাও যাচ্ছে না আবার একা একা সহ্যও করা যাচ্ছে না। অনেক সাহস করে সে তার ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে বয়স্ক লোক মাহবুব কেরানির আছে গেল, তাকেই ব্যাপারটা বলল। তিনি তো এমন ‘সিরিয়াস বিষয়’ শুনে হেসেই খুন। তারপর বলল

- আরে শোনো, এদেরকে বলে ঘোস্ট লেবার। এরা কাগজকলমে আছে, বাস্তবে নাই।

শব্দটা জাফরের জন্যে নতুন। ঘোস্ট মানে তো ভূত! 

কিন্তু ভূত কিভাবে লেবার হয়? সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল।

- আরে না, আসলে ভূত না, এরা কাগজ-কলমে থাকে। ম্যানেজমেন্টের কিছু লোক কাগজকলমে কিছু লোককে দেখায়। এদের বেতন উপরের বড়কর্তারা ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলে। আমাদের ২৮৭৪ জন লেবারের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার শ ঘোস্ট লেবার আছে। ম্যানেজমেন্টের এই কয়েকটা লোকের জন্যেই তো এমডি সাহেবের কোটি কোটি টাকার এই প্রজেক্ট কোনো লাভের মুখ দেখছেনা।

- ও আচ্ছা। বলে চুপ করে গেল জাফর।

এখন এ মাসের শেষ দিকে চলে এসেছে। বেতনের এক্সেলশিট লিখতে লিখতে তার কেবলই মনে হচ্ছে এই নামগুলোর মধ্যে না জানি কে কে ঘোস্ট লেবার! ঘোস্ট মানে তো ভূত! 

ধূর, মাথা থেকে এই ভূত শব্দটাই যাচ্ছে না।

                                                                                              *

একা একা কাজ করে যাচ্ছে জাফর অফিসে, আজ অনেক কাজ ছিল। রাত এগারোটার মতো বাজে। হাতের কাজগুলো শেষ করে তবে উঠবে- এমন জেদ চেপেছে। যাতে কাল অন্তত অফিস টাইমেই বের হতে পার। কাজের এক ফাঁকে তার মনে হলো- একটু হেঁটে আসি, ফ্যাক্টরির ফ্লোরে একটু পায়চারি করা আর কি। বসে কাজ করতে করতে পিঠে ব্যথা ধরে গেছে।

তার অফিস রুমের সামনেই যে ফ্লোর, সেখানে কেউ নেই। সেখানেই একটু পায়চারি করা যেতে পারে। ভেবেই জাফর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ফ্লোরের এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত তিন-চারবার হেঁটে আসা যেতে পারে।  

সে হাঁটা শুরু করল। শেষ মাথা পর্যন্ত এসে আবার উলটা ঘুরে হাঁটা। ফ্লোরে লাইটগুলো সব বন্ধ, শেষ মাথায় তার রুমের লাইটটা দেখা যাচ্ছে। কিছুদূর আসতেই তার মনে হলো ডান দিকের অকেজো আর বাতিলপ্রায় মেশিনগুলোর পেছনে কারা যেন আছে।  

এখন আবার সেখানে কে? কী মনে করে জাফর সেদিকে এগোল। দেখল তিনটা কিম্ভূত আকৃতির মানুষ মাটিতে বসে আছে আর ফিঁসফিঁস করে নিজেরা কী যেন বলাবলি করছে, সেই সাথে একটু পর পর এক অদ্ভূত আওয়াজ করে হাসছে।

জাফর ভয় পেয়ে গিয়েও জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা?

- আঁমরা ভূত। আঁমরা ঘোঁস্ট লেঁবাঁর।  

এবার ভয়ে কাঠ হয়ে গেল জাফর। এমন পরিস্থিতিতে জীবনে পড়ে নাই। আমতা আমতা করে বলল, মা...ম মা...ম মা...নে?

- আঁমরা ভূঁত। আঁমরা আঁপনাঁর কোঁন ক্ষঁতি কঁরঁব না। আঁপঁনি ভাঁল মাঁনুঁষ। আঁমাঁদেঁর বেঁতঁনটাঁ দিঁয়ে দিঁতে বঁলঁবেঁন, স্যাঁর। নাঁ দিঁলে ওঁই লোঁকদেঁর মাঁথা চিঁবিঁয়ে খাঁব, স্যাঁর।

জাফর হতবিহবল হয়ে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। ওরা আবার বিচিত্র স্বরে হাসতে হাসতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এভাবে ওদের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা জাফর আর সহ্য করতে পারল না।  

এরপর জাফরের আর কিছুই মনে নাই।  
                                                                                              *
উপরের ঘটনাটা প্রায় তের বছর আগের। ঘটনাটা নিয়ে একটু জটিলতা দেখা দিয়েছিল অবশ্য। পরদিন অফিস স্টাফরা অজ্ঞান অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে তার অফিসের ফ্লোর থেকে। কিন্তু সে পড়ে গিয়েছিল ওই মেশিনগুলোর পাশে। অন্তত জ্ঞান হারানো পর্যন্ত তো সে সেখানেই ছিল! তাকে যখন উদ্ধার করা হয় প্রচণ্ড জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওয়ার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সবাই জানে ডেঙ্গুর কারণেই এমন হয়েছিল ওর। কিন্তু জাফর তো জানে... তবে এসব নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেনি। কী জানি হবেও হয়তো... হয়তো সে জ্বরের ঘোরে স্বপ্নই দেখছিল সেদিন...

                                                                                               *
তের বছর পর সেই জাফর এখন কনজ্যুমার পণ্য বাজারজাতকারী একটা কোম্পানির অ্যাকাউন্টস জিএম। ভূয়া নামে লোক নিয়োগ বা ভূয়া কারো নামে কোনো খরচ সে মোটেই সহ্য করতে পারে না। এ নিয়ে কর্পোরেট জগতে তার বেশ সুনাম রয়েছে। নামি-দামি প্রতিষ্ঠান তাকে লুফে নিতে দক্ষ উেইকেটকিপার মুশফিকুর রহিমের মতো প্রস্তুত হয়ে আছে। নিজেরা সৎ না হলেও আমাদের অধীনস্থ লোকটা তো সৎ চাই! এটাই কারণ।

জাফর সবই বোঝে।  

তবে ঘোস্ট লেবারদের বিষয়টা প্রতিদিনি তার মাথায় অন্তত একবার আসে। আগে ভয় পেত মনে মনে - এখন মুচকি হাসে। আফটার অল, বয়স হয়েছে তো একটু-আধটু!

 


মন্তব্য