kalerkantho

মমতা স্টোর

জুয়েল সেনোবা   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:৫৫



মমতা স্টোর

প্রতীকি চিত্র

ঢাকায় আসার পর থেকে মন ভাল নাই ইয়াসিনের। গত শনিবার ঢাকা আসার পর আজ চারদিন হয়ে গেল। বাড়িতে জিদ দেখিয়ে বলে এসেছে ঢাকা এসে একটা কিছু করে সে বাড়ি ফিরবে। বেকার থেকে থেকে একে তো নিজের মনে ভীষণ কস্ট এবং আহহেপ, তার উপর বাড়িতে বড় ভাই আর বাবা কানের কাছে সারাক্ষণ বলছেন যে বসে বসে আর কতদিন খাবি? 

ডিগ্রি পাস করে দু বছর হয়ে গেল। কত্তো জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছে পাস করার পর থেকে, কোথাও কোন গতি হলো না। লোকজন ইন্টার্ভিউ নেয় লোক দেখানোর জন্য। একেকবার একেক জায়গায় ইন্টার্ভিউ দিতে গেলেও বাবার থেকে প্রতিবার টাকা নিতে হয়েছে। তখন আবার কিছু কথা শুনতে হয়। দিনে দিনে জীবনের উপর মহা বিরক্ত হয়ে শেষমেশ ঠিক করেছে, বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যাবে। যাতে কেউ তার সন্ধানও না পায়, তাই নিজের বহুদিনের পুরনো সীমটাও ফেলে দিয়েছে।  

ঢাকা আসার সময় পাশের বাড়ির মনসুরের কাছ হতে কিছু টাকা ধার করে এনেছে আর ঢাকায় মনসুরেরই এক চাচাত ভাই থাকে।

জামাল, উর্দু রোডের ঢালে এক মেসে থাকে। তার কাছে এসে উঠেছে। জামাল ইয়াসিনকে আগে থেকেই চেনে। গ্রামের মানুষেরা আশেপাশের মানুষদের এক পরত বা দুই পরত পর্যন্ত আত্মীয় সজনদের চেনে। শহরের বাসিন্দাদের এসব নেই। এখানে কেবল কাকেরাই অন্য কাকদের চেনে।  

এই চারদিন ইয়াসিন কত্তো জায়গায় যে গেল! কাছাকাছি কয়েকটা অফিসে গিয়েছে, অনেকগুলো দোকানেও গিয়েছে। একটা চাকুরী তার খুব দরকার। নিজের সার্টিফিকেটগুলো দেখিয়ে আকুতি মিনতি করে বলেছে। এখানে চেনা জানা না থাকলে নিজের কোন অস্তিত্ব নেই- গত চারদিনে ইয়াসিন এটা খুব ভাল করে বুঝেছে। এই ঢাকা শহরে একা অচেনা মানুষের কোন জীবন নাই, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত পলিথিনের টুকরার মতো লাগছে তার নিজেকে।

কাল সকাল হলেই আবার বেরোবে। জামাল তাকে বলেছে নবাবপুরের দিকে যেতে, সে রাস্তা চিনিয়ে দেবে। নবাবপুরে নাকি মেশিনপত্তরের ব্যাবসা। একটু লেখাপড়া জানা থাকলে সেখানে চাকরি নাকি পাওয়া যায়। অবশ্য জামাল এ চারদিনে এখানকার রাস্তাঘাট চেনার পদ্ধতি শিখে ফেলেছে। তেমন কোন আহামরি বুদ্ধি না, তবে কাজ হয়। যে কোন রিক্সাওয়ালাকে বললেই দেখিয়ে দেয়। তবে বুড়ো বয়স্ক রিক্সাওয়ালাদের জিজ্ঞেস না করাই ভাল। এরা কেবল খ্যাঁক খ্যাঁক করে।  

রাতে মেসের ঘরটা গুমোট হয়ে থাকে। একই রুমে ওরা দুজন ছাড়াও আরো দুজন থাকে। এরা সকালে চলে যায় আর রাত্রে ফেরে। লালবাগে কোথায় নাকি স্যুটকেসের দোকানে কাজ করে।  শুয়ে শুয়ে রুমের ছাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে ইয়াসিন।  আজ সারাদিন বাবার কথা মনে পড়েছে। কিন্তু একটা চাকরি তার খুব দরকার। খুউব দরকার। একটা চাকরি পেলেই সে যেন বেচে যায়। রাত যতো গভীর হচ্ছে, আজ কেন যেন মনে হচ্ছে বাড়ি থেকে এভাবে চলে আসাটা ঠিক হয়নি। বাড়ির সবাইতো তার ভালোর জন্যেই তাকে এসব বলত, বকাঝকা করত। কোথাও একটা গতি হলে তো এরকম উঠতে বসতে কথা শুনতে হতোনা।  

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই ইয়াসিনের মোবাইলটা বেজে উঠল। রাত কত হলো! এত রাতে কেই বা ফোন করল? ইয়াসিন মোবাইলটা নিয়ে নাম্বারটার দিকেও খেয়াল করল না, পাছে কেউ জেগে উঠে- তাই মোবাইলের কলটা রিসিভ করেই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলল:
- হ্যালো।
- বাবা ইয়াসিন, কেমন আছিস তুই?' বাবার গলা।
- বাবা। বাবা, আসসালামু আলাইকুম। আপনি কেমন আছেন? ইয়াসিনের গলা কেমন যেন চাপা কান্নায় বুজে এল।
- এই যে বাড়ি থেকে গেলি, ফোনও করলি না, খোঁজও নিলিনা। কেমন আছিস রে বাবা? 
- আমি ভাল আছি, বাবা। এখনো কিছু করতে পারিনি বাবা, চাকরি খুজছি।  
- বেশি অস্থির হোসনে। দেখবি একটা চাকরি হয়ে যাবে। আল্লাহ চাইলে কালও হয়ে যেতে পারে। চিন্তা করিসনা বাবা।
- জ্বী বাবা।  
- আর শোন, একবার নবাবপুরের দিকে যাবি। সেখানে আরজু হোটেলের পাশেই মমতা স্টোর নামে একটা দোকান আছে। মালিকের নাম হাসমত আলী। গিয়ে আমার কথা বলিস।
- জ্বী, বাবা।  
- এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকিস না। এখন ঘুমাতে যা।
- জ্বী বাবা, আসসালামু আলাইকুম।

ফোন নিয়ে রুমে ঢুকে চুপচাপ শুয়ে পড়ল ইয়াসিন।  মনের ভেতরের ভার ভার ভাবটা  কেন যেন কেটে গেছে।  

ঠিক ঠিকই নবাবপুর চলে এসেছে ইয়াসিন। পথে কয়েকটা রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে হয়েছে। আরজু হোটেলের পাশে মমতা ট্রেডার্স নামের দোকানটাও খুজে পেয়েছে। দোকানে ঢুকেই ইয়াসিন বলল যে হাসমত সাহেব কি আছেন? পাঞ্জাবী পরা এক লোক পান চিবোতে চিবোতে বলল যে সেই নাকি ঐ লোক। ইয়াসিন তার 
বাবার নাম বলে বলল যে সে একটা চাকুরি খুঁজছে।  

হাসমত আলী হুমড়ি খেয়ে তার হাত ধরে টেনে কাছে এনে বসালো। আহারে, কত বড় হয়ে গেছ ইয়াসিন, সেই কোন ছোটবেলায় তোমাকে দেখেছিলাম ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে লাগল হাসমত আলী। এর মাঝে কাকে যেন ডেকে বলেও দিলেন চা, সিংগারা দিতে। বাড়ির খোঁজখবর নিলেন।  

আধঘন্টার মাথায় ইয়াসিন যখন ওই দোকান থেকে বেরিয়ে এল, তখন তার পৃথিবীর রঙ পালটে গেছে। তার চাকুরি হয়ে গেছে।  

মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেছে। বাড়িতে একটা ফোন করা দরকার। বাবাকেই ফোন করি, ভেবে ইয়াসিন মোবাইলটা বের করে কাল রাতের কল চেক করল। কি আশ্চর্য, বাবা না কাল ফোন করলো! নাকি কখন চাপ লেগে মুছে গেছে। যাকগে, নাম্বারতো জানিই; ভেবে বাবার নাম্বারে রিং করল ইয়াসিন।  

ওপাশে রিং বেজেই চলছে।

-হ্যালো। মার গলা।

- মা',  ইয়াসিন খুশিতে উড়ছে।  

ইয়াসিনের গলা শুনেই তার মা চিৎকার করে কাদতে লাগলেন।  

- কি হয়েছে মা, ও মা কি হয়েছে? ইয়াসিন অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল।

মা ওপাশে তখন কাঁদছেন।

ফোনে তখন বড় ভাই এর গলা। তিনি যা বললেন, তাতে ইয়াসিনের মাথা ঘুরতে লাগল।
সে যেদিন সকালে ঢাকা রওনা দিয়েছে, সেদিনই দুপুরে বাবা মারা গেছেন। সে তার সীম ফেলে এসেছিল রাগ করে, তাই তাকে কেউ জানাতেও পারেনি সংবাদটা।  আজ পাঁচদিন হয়ে গেছে, বাবা মারা গেছেন।
ইয়াসিন রাস্তায় মাটিতে বসে কাঁদছে। কান্নার ভেতরেই কাল রাতের কথা ভেবে তার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। তার নম্বর তো বাবার জানার কথা না, তাহলে বাবা কীভাবে এই নাম্বারে ফোন করলেন? তাছাড়া বাবা তো চারদিন আগেই....

কিন্তু আরজু হোটেলের পাশে মমতা স্টোর দোকানতো ঠিকই আছে, বাবার কথামতো আজইতো তার চাকরিটা হয়ে গেছে... তাহলে!
 


মন্তব্য