kalerkantho

horror-club-banner

নিশুতি রাতে কলতলায় কে!

মীর মো. স্বরনিয়াত   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০২:০৮



নিশুতি রাতে কলতলায় কে!

আমার নানাবাড়ি ঢাকা থেকে প্রায় ১৫৩ কিলোমিটার দূরে ফরিদপুর জেলার মধুখালী থানার জামালপুর গ্রামে। এককালে এটি জমিদার বাড়ি ছিল। বোস নামে এক হিন্দু জমিদার এ বাড়িতে বাস করতেন। একটি বিশাল এলাকা নিয়ে আমার নানাবাড়ি।

আমার নানা মুক্তিযুদ্ধেরও বহু আগে এই বাড়িটা কিনেছিলেন। লোকমুখে শোনা যায় এই বাড়িতে রাতের বেলা নাকি জীন-পরী চলাচল করে। আমার আম্মাও একজন প্রত্যক্ষদর্শী। আমার তেমনি এক অভিজ্ঞতার একটি গল্প প্রথমে বলি।

সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। শুধু আমার আম্মা আর তার মেঝোবোন ছাড়া সবাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন তাদের বিয়ে হয়নি।

আমার মেঝো খালা ছিল সাহসী আর আম্মা ভীতুর ডিম প্রকৃতির।

এত বড় বাড়ি, সন্ধ্যা হতেই আম্মা তো ভয়েই অস্থির। রাতে দুই বোন গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে রয়েছেন। গল্পে গল্পে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন তা মনে নেই। হঠাৎ কল চাপার শব্দ শুনে আম্মার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার নানু বাড়িতে ছিল চাপকল। সেই চাপকল চাপার আওয়াজ হচ্ছে এত রাতে।   আম্মা তাড়াতাড়ি মেঝো খালাকে ডেকে তোলেন।

এত রাতে কল চাপার শব্দ শুনে সেও কিছুটা অবাক হয়। ওদিকে, আম্মা তো খালাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। আম্মুকে সরিয়ে খালা মনে সাহস নিয়ে জানালার কাছে গেল। তবে খালারও সাহস হলো না সরাসরি জানালা দিয়ে কিছু দেখতে। জানালার নিচের দিকে একটা ফুটো আছে। সেই ফুটো দিয়ে কল দেখা যায়। তখন তিনি সেই ফুটো দিয়ে দেখলেন কয়েকজন লোক অজু করছে কল পাড়ে। সবার গায়ে সাদা কাপড়। তাদের শরীর থেকে যেন আলো বের হচ্ছে। খালাম্মা এটা আম্মাকে ডেকে দেখাতেই আম্মা সাথে সাথে অজ্ঞান।

পরেরদিন নানা বাসায় এলে আম্মা-খালা নানাকে সব বলেন। নানা তাদের বললেন, এরা হচ্ছে জীন। তারা রাতের বেলা অজু করছিলো। তবে আম্মাকে মানা করে দেয় যেন আর কখনো এগুলো না দেখে।

দুই

এই ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা। তখন আমরা ঢাকার হাজারীবাগে এক ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমার স্বাস্থ্য খুব খারাপ। একদম হালকা পাতলা শরীর। আমাদের বাড়িওয়ালার মা আমাকে দেখে আম্মাকে বললেন, তুমি মা তোমার ছেলেকে কোনো কবিরাজ দেখাও। আমাদের একজন ভাল মহিলা কবিরাজ আছে। তার ঘাড়ে একটা জীন আছে। সেই মহিলা জীনের মাধ্যমে সবার রোগ সারায়।

আম্মা রাজি হলেন।

একদিন সন্ধ্যায় সেই মহিলাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসা হলো। মহিলা আম্মাকে বললেন, যখন হুজুর (জীন) আসবে তখন আপনি আপনার সমস্যার কথা বলবেন। এরপর তিনি দোয়া পড়তে লাগলেন। হঠাৎ তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এরপর কে যেন নাকি সুরে কথা বলা শুরু করলো। প্রথমে সালাম দিল, তারপর কী সমস্যা তা জানতে চাইলো। জবাবে আম্মা সব সমস্যা বললো। এরপর হুজুর বললেন ঠিক আছে। আমি একটা তাবিজ দেব। সেটা ও (আমি) যে খাটে ঘুমায় সেখানে বেঁধে রাখবে।

বাড়িওয়ালার মা হঠাৎ বলল, হুজুর আমাদের মিষ্টি খাওয়ান। বলার সাথে সাথে এক প্যাকেট মিষ্টি এসে পড়লো আমাদের সামনে। আমরা তো অবাক! কারণ ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ ছিল। কোথা থেকে মিষ্টি এলো? এই রহস্যের সমাধান আজো করতে পারিনি। তবে আমার শরীর কিন্তু আগের মতোই আছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিন
এটা আমার বড় খালার মুখ থেকে শোনা। এই ঘটনাটাও আমার নানু বাড়িতে ঘটেছে। তখন আমার নানু বাড়িতে একটা তাল গাছ ছিল। সেটা ছিল শীতকাল। সবাই রোদের জন্য উঠানে বসে থাকতো। নানা তাল গাছের নিচে একটা চৌকি পেতে দিয়েছিলেন। যাতে সবাই সেখানে আরাম করে বসতে পারে।

আমার বড় খালার ছেলের নাম মিজান। মিজান দাদা দেখতে খুব সুন্দর। একদিন দুপুরে মিজান দাদা সেই চৌকিতে ঘুমিয়ে ছিল। তখন উঠানে কেউ ছিল না। মিজান দাদা তো ঘুমে অচেতন। এমন সময় আমার বড় খালাম্মা ঘরের জানালা দিয়ে দেখলেন মিজান দাদা ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। বড় খালাম্মা তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে নানাকে বললেন এই আজব ঘটনা। নানা বাইরে এসে দোয়া-দরুদ পড়ে মিজান দাদাকে ফুঁ দিলেন।

পরে মিজান দাদাকে ঘুম থেকে তুলে ঘরে নিয়ে যাওয়া হল।

বড় খালাম্মার কাছে শুনেছি রাতের বেলা নাকি ওই গাছে আগুনের গোলা একবার উপরে একবার নিচে নামে। নানা যদি মিজান দাদাকে না আটকাতেন তাহলে নাকি মিজান দাদাকে পরীরা নিয়ে চলে যেত। সেই তাল গাছটা আর নেই।

চার
এই ঘটনাটি আমার নিজের চোখে দেখা। তখন আমি খুব ছোট। বয়স আট কি নয় বছর হবে। তখন আমার নানা বাড়িতে একটা ছেলে কাজ করত। তার নাম শাহা আলম। তাকে আমরা নাম ধরেই ডাকতাম। সে আমাদের খুব আদর করত। তার একটাই দুঃখ ছিল, মাথায় কোনো চুল ছিল না। অনেক চিকিৎসা করিয়েছে, কিন্তু ফল পায়নি।

আমাদের গ্রামে তখন এক পাগল ছিল। মহিলা পাগল। সবাই তাকে নানী পাগল বলে ডাকত। নানী পাগল আমাদের নানা বাড়িতে প্রায়ই আসত। নানী পাগল এলে নানু তাকে অনেক খাবার দিত। নানী পাগল আমাদের খুব পছন্দ করত।

এমনি একদিন নানী পাগল আমাদের নানা বাড়ি এসেছে। তখন শাহা আলম এসে নানী পাগলির পা জড়িয়ে ধরে বলল, নানী আপনি আমার মাথা চুল গজিয়ে দেন। নানী পাগল কী মনে করে যেন উঠান থেকে গোবর নিয়ে শাহা আলমের মাথায় লাগিয়ে দেন। শাহা আলম তো রেগে আগুন। চিৎকার করে বলে, বুড়ি তুই যখন আমার মাথায় চুল গজাতে পারবি না, তাহলে গোবর দিলি কেন!

এর প্রায় এক সপ্তাহ পর শাহা আলম তার মাথায় হঠাৎ হাত দিয়ে দেখে মাথা খোঁচা খোঁচা চুলে ভরে গেছে যেন। ব্যাপারটা পরীক্ষা করে সে তো খুশিতে আটখানা। এরপর সে বাজারে গিয়ে নানী পাগলকে খুঁজে নিয়ে আসে। নানী পাগলকে সে একটা শাড়িও কিনে দিয়েছিল।

এখন শাহা আলমের মাথায় ঝাঁকড়া চুল। এই মাথায় যে এক কালে চকচকে টাক ছিল তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তবে  নানী পাগল এখন আর সেখানে নেই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না।


মন্তব্য