kalerkantho

horror-club-banner

হরর ক্লাব: রাবি হলে নিশুতি রাতের সেই গা ছমছমে হাত!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২১:৪১



হরর ক্লাব: রাবি হলে নিশুতি রাতের সেই গা ছমছমে হাত!

প্রতীকি চিত্র

গল্পটা রাজশাহী শহরে আশির দশকে লোকের মুখে মুখে ফিরতো। গল্পের নায়ক রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলো। ঘটনার সময় রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে ছুটি চলছিলো। সম্ভবত ঈদের ছুটি অথবা ছাত্রদের মধ্যে গণ্ডগোলে ক্যাম্পাস বন্ধ ছিলো।  
শক্ত নার্ভের ছেলে হিসেবে ওই ছাত্রটির খ্যাতি ছিল। পুরো ক্যাম্পাস ফাঁকা, তবে কোনো কারণে সেবার হলে থেকে যেতে বাধ্য হচ্ছিলো বেচারা।  

রাজশাহী শহর সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন যে রাজশাহীকে শিক্ষা নগরী কেন বলা হয়। ঈদের ছুটির সময় ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়ি যাবার পর  শহরের লোকসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। আর আজ থেকে ৩০ বছর আগের রাজশাহীতে রাস্তায় ঠিকমতো নিয়নবাতিও ছিলো না। সন্ধ্যার পরই রাস্তাঘাট হয়ে যেতো অন্ধকার আর নিরিবিলি।  

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি তখন শহরের বেশ বাহিরে।

ঈদের ছুটিতে জনমানবশুন্য ক্যাম্পাসে সারাদিন থেকে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। হোস্টেলে একজন দুইজন ছাড়া কোনো ছাত্র নেই। সারাদিন পড়ালেখা তার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগলো।  
আশির দশকে বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র বিনোদন ছিল সিনেমা দেখা। সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে তখন সবাই দল বেঁধে বা একা কমপক্ষে একবার সিনেমা হলে যেত।  

পড়ালেখা করে ইভানের ইচ্ছা চাপলো সিনেমা দেখার। তখন রাজশাহীর সবচেয়ে ভালো সিনেমা হল ছিল বর্ণালী। তবে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূর। সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সিনেমা হলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আটটা বেজে গেলো ইভানের (নামটি অন্য কিছুও হতে পারে)।  

লাস্ট শো, বা নাইট শো ছাড়া উপায় নায়। রাত ৯টা থেকে ১২টার শো। খুব ভালো একটা সিনেমা চলছিলো বর্ণালীতে। অতো রাতে কীভাবে হোস্টেলে ফেরত যাবে সেসব চিন্তা না করেই ইভান সিনেমা দেখতে ঢুকলো। সিনেমা শেষে যখন রাত সাড়ে ১২টায় বের হলো তখন শহরে মানুষ নেই বললেই চলে।  

এমনিতেই শেষ শোতে মানুষ থাকে হাতে গোনা, তারপর দেখা গেলো আশপাশের মানুষরা সবাই ম্যাটেনি শো দেখে হেঁটে হেঁটে বাড়ি চলে গেলো। ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাহসী ইভান আপনমনে ক্যাম্পাসের দিকে হাঁটা ধরলো।  

ক্যাম্পাস অনেক অনেক দূরে। ছাত্র বয়সের জোশের কারণে অতশত চিন্তা করার সময় তার ছিলোনা। রাস্তা দিয়ে কিছুদূর হাঁটতেই পেছনের অন্ধকার থেকে একটা ঠকাঠক আওয়াজ তুলে একটা ঘোড়ার গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ালো। চাবুক হাতে কোচোয়ান বসা তার আসনে। আব্দারের হাসি হেসে বললো, যাবেন নাকি, সাহেব? 

প্রতীকি চিত্র

ইভান যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে, এমন খুশি হলো।  

রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে যাবে বলতেই টমটমওয়ালা বললো, উঠেন। ভাড়ার কথা জিজ্ঞাসা করতেই হেসে বললো দিয়েন- মামু, আপনারা কি আর কম দিবেন!

অন্ধকারে কোচোয়ানের মুখ দেখা যাচ্ছিলো না। তবে বেশ লম্বা চওড়া শরীর। টমটম গাড়িটা যেন উড়ে চললো ইউনিভার্সিটির দিকে। ইভান অবাক হয়ে দেখলো অতোটা রাস্তা খুব অল্প সময়েই পার হয়ে ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে ঢুকে গেছে এক ঘোড়ায় টানা গাড়িটা।  

রাজশাহী ইউনিভার্সিটির হলগুলো অনেক বড়। নিজের হল গেটে থামার পর ‘ভাড়া কত’ জিজ্ঞাসা করতেই ইভানের দিকে না তাকিয়ে টমটমওয়ালা বললো, ‘আপনার ইচ্ছা মতো দেন। ’ 

‘এই নিন’ বলে ৫ টাকার নোটটা কোচোয়ানের দিকে এগিয়ে ধরতেই হাত সামনে এগিয়ে ধরলো লোকটি, ইভানের প্রথমে বিশ্বাস হলো না। কারণ লোকটার হাতের জায়গায় রয়েছে অন্য কিছু! 
আলো-আঁধারিতে ভাল করে খেয়াল করতেই দেখলো- ঘোড়ার সামনের একটি পা মানে পায়ের ক্ষুর তার সামনে বাড়ানো রয়েছে! 

কাঁধ থেকে হাত নেমে এসে কব্জির কাছে ক্ষুর হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে হলের গেটের দিকে দৌড় দিলো শক্ত নার্ভের ইভান। গেটে ঢুকতেই স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো, দেখলো গার্ড মামা এগিয়ে আসছে।  
কী হয়েছে মামা! এভাবে চিল্লাইতেছেন ক্যান? 

ইভান হড়বড় করে সদ্য ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাটি বলতে শুরু করলো হাঁপাতে হাঁপাতে। গল্পের শেষ অংশে আসতেই গার্ড তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, মামা হাতটা কি এমন ছিলো? 

নিশীথ রাতে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ানো ছাত্রটির অবস্থা হলো যেন- এতক্ষণ কড়াইতে ছিলাম এবার চুলায় পড়লাম! ফের প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে ওঠে ইভান। কারণ, গার্ডমামার হাতটিও দেখা যাচ্ছে ওই কোচোয়ানের হাতের মতোই!

প্রতীকি চিত্র

ওদিকে ঘোড়ারক্ষুর সমেত হাতটা ইভানের দিকে মেলে দিয়ে রক্ত ঠাণ্ডা করা অট্টহাসি শুরু করলো হঠাৎ অদ্ভূত ভয়াবহ নেকড়ের রূপ ধরা গার্ড।  

প্রচণ্ড ভয়ের ধাক্কা যেন ইভানের পা দুটোয় মেশিনের গতি এনে দিল। চিৎকার করতে করতে নিজের রুমের দরজায় পৌঁছালো কয়েক সেকেন্ডের মাথায়। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে দিয়ে পুরো হলে তখনো প্রতিধ্বণিত হচ্ছে তার গগন ফাটানো চিৎকার।  

এসময় পরম স্বস্তি পেল সে তার রূমমেটকে এগিয়ে আসতে দেখে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী তাকে জড়িয়ে ধরলো। জানতে চাইলো এভাবে চিৎকারের কারণ। শরীর তার তখনো কাঁপছে। এখনো জ্ঞান না হারানোটা আশ্চর্যের। নিরাপত্তার আশ্রয় পেয়ে রুমমেটকে বলতে শুরু করলো এইমাত্র ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনা দুটি। তবে রুমমেট শুরুতেই তাকে বাধা দিয়ে বললো- বাদ দে, ওসব কিছু না। পরে শোনা যাবে। আগে ঘরে চল।  

দু বন্ধু রুমে ফিরে চললো। দরোজার কাছে এসে রুমমেট ইভানকে বললো, তবে, তুই যা বলতে চাইছিলি, মানে ওই টাঙ্গাওয়ালা আর আমাদের দারোয়ান মামার হাত…

ইভান ওই অবস্থায়ও একটু চমকালো এবং প্রশ্ন করলো, তুই জানলি কী করে? তুই তো আমাকে বলতেই দিলি না ঘটনাটা! তার মানে তোর সঙ্গেও কী ওরকম…

বন্ধুটি এবার অপরিচিতের মতো হেসে উঠলো, অনেকটাই যেন গার্ড মামার মতো। বললো, দেখতো! তাদের হাতগুলোও কি এমনই ছিল না তো? বলে সে তার দু হাত বাড়িয়ে দিল ইভানের দিকে।

শক্ত নার্ভের ছেলে হিসেবে বন্ধুদের কাছে খ্যাত ইভান জ্ঞান হারানের আগে যা দেখলো তা হচ্ছে প্রিয় রুমমেটের হাতদুটোও ঘোড়ার ক্ষুরের মতোই।  

আর একই সময়ে মনে পড়লো, ও তো দুইদিন আগেই বাড়িতে চলে গিয়েছিলো!

পরদিন যখন গার্ডমামা এসে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে তখন সকাল পেড়িয়ে বেলা অনেক উঠে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে গত রাতে তাকে নিজ বাড়িতে যেতে হয়েছিল। তাই রাতে সে হল পাহাড়ায় ছিল না। ইভান সুস্থ হয়ে উঠতেই অনুরোধ করলো, সে যে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বাড়ি গিয়েছিল তা যেন কর্তৃপক্ষকে না জানায়…

সংগ্রাহক: আনিসুল কবীর, লেখক 

 


মন্তব্য