kalerkantho


নির্বাচন ও বদরুল চাচা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচন ও বদরুল চাচা

ছোটকালে নির্বাচন আমাদের জন্য একটা উত্সবের মতো ব্যাপার ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল নির্বাচনের সময় আমরা গ্রামের দিকে রওনা দিতাম। কেননা প্রতিবার আমার বড় চাচা মুন্সি বদরুল ভোটে দাঁড়াতেন। আর নিশ্চিতভাবেই হেরে যেতেন। হার-জিত নিয়ে আমরা তেমন মাথা ঘামাতাম না। গ্রামে গিয়ে দৌড়-ঝাপ দেওয়া, আর ‘মার্কা আছে? আছে! কোন সে মার্কা?’—এই সব স্লোগানে আশপাশ মুখরিত করে রাখতাম। এখন শহরে নির্বাচনের আগে খালি ফেসবুকজুড়ে নানা খবর আর ট্রল দেখি। এর মধ্যেই একদিন বাসায় বড় চাচা এসে হাজির। ঘটনা হলো, এবারও তিনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন। আমার কাছে এসেছেন বিভিন্ন সাজেশনের জন্য। আমার আম্মা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এই বয়সে আর নির্বাচনে না নামলে কী হয় না?’

‘এসব কি বলো বউ মা? এটাই আমার শেষ নির্বাচন। এবার আমি জয় নিয়ে ফিরতে চাই।’

বড় চাচা আমার রুমে এসে উঠলেন। বললেন, ‘ভাতিজা কথা মন দিয়ে শোনো। তোমার কাছে আইছি মার্কা ঠিক করতে। তোমরা ডিজিটাল পোলা। এবার আমি তোমাদের পাশে নিয়ে জিততে চাই।’

আমি তখনই চাচার মার্কা কী হতে পারে সেটা জানতে চেয়ে নগদে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলাম।

এক বন্ধু বলল, ‘আনারস মার্কা দে। আনারস আমাদের অনেক উপকার করে। আনারস খেলে কৃমি কমে।’

সেই কমেন্টে আমার স্ট্যাটাসের চেয়েও লাইক বেশি পড়ল।

একজন কমেন্ট করল, ‘লিপস্টিক মাখা লাল ঠোঁট হোক তোর চাচার মার্কা।’

আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। চাচা খানিক বাদে আগ্রহভরে জানতে চাইল আমার বন্ধুরা কী জানাচ্ছে।

আমি অনেক কষ্টে এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে বললাম, ‘চাচা জানাচ্ছি।’

আমি কমেন্টে বললাম, ‘দেখ মশকারি না। ভালো একটা মার্কা বল। ওই মার্কার স্যাম্পল নিয়ে আমরা যেন পুরো গ্রাম ভড়কে দিতে পারি।’

একজন বলল, ‘বাঘ মার্কা দে। সুন্দরবন থেকে একটা বাঘ ধরে নিয়ে

আসুম নে।’

আমি বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম এক বান্ধবী কমেন্ট করেছে, ‘পানি মার্কা দে। পাশে ব্র্যাকেটে লেখা থাকবে H2O. একটা সায়েন্টিফিক সায়েন্টিফিক ভাব আসবে।’

সেই কমেন্টে আরেকজন রিপ্লাই দিল, ‘কি পানি? লাল পানি না সাদা?’

হঠাত্ করেই আমার মাথায় এলো ‘আসলেই তো, পানিই হবে মার্কা। ট্যাগ লাইন হবে, মুন্সি বদরুলের চরিত্র, পানির মতো পবিত্র।’

চাচাকে ঘুম থেকে তুলে বসালাম। এরপর একটা গ্লাস নিয়ে ওটার অর্ধেক পানি ভরে চাচাকে দেখিয়ে বললাম, ‘চাচা কী দেখছেন, বলেন।’

চাচা আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে বললেন, ‘সকালে পানি না খাইলে টয়লেট ক্লিয়ার হয় নারে ভাতিজা!’

আমি দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে আবার হাফগ্লাস পানি ভরে নিয়ে আসলাম। চাচাকে শুনিয়ে দিলাম পানি নিয়ে সেই বিখ্যাত বাণী, ‘এই গ্লাসের অর্ধেক খালি অর্ধেক ভরা। হতাশাগ্রস্ত লোক দেখবে খালি অংশ। আমরা আশাবাদীরা দেখব ভরা অংশ। আর চাচা আপনার মার্কা হবে পানি H2O.’

চাচা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।

আমার বন্ধুবান্ধবের সাতজনের একটা দল নিয়ে বড় চাচাসহ গ্রামে চলে গেলাম। গ্রামে আমরা ঢুকলাম স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে—

পানি পানি পানি চাই, পানি দিয়ে বাঁচতে চাই।

পানি ছাড়া মার্কা নাই, পানি ছাড়া রক্ষা নাই।

মুন্সি বদরুলের চরিত্র, পানির মতো পবিত্র।

আমাদের একটা দল গ্রামে ঘুরে ঘুরে নিরাপদ পানির গুরুত্ব বোঝাতে শুরু করল। এর মধ্যেই দেখি চাচার মন খারাপ। ব্যাপার কী? ব্যাপার হলো সবাই নাকি এই মার্কা নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমাদের গ্রুপের থিংক ট্যাংক রাজু  চিন্তাভাবনা করে বলল, ‘চাচা কাল গ্রামের কিছু মুরব্বিকে দুপুরে খেতে বলেন।’

‘এটা ভালো বুদ্ধি।’ পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বন্ধু আশিক বলল।

‘তোর প্ল্যান কী?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম রাজুকে। সে ভাব নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টাইম হলেই বুঝবি!’

রাহুল রেগে বলল, ‘এহ ভাব কী! থিংক ট্যাংক হইছে। ট্যাংকি ফেটে পানি বের হয়ে গেলে বুঝবি।’

পর দিন মুরব্বিদের জন্য এলাহি আয়োজন হলো। সবাই পেটপুরে খেল। কিন্তু টেবিলে কোনো পানি ছিল না। প্রথমবার শুধু হাত ধোয়ার পর আর কোনো পানির জগ বা গ্লাস দেওয়া হয়নি। খাওয়ার পর সবাই যখন পানি খুঁজছে তখন চাচা রাজুর শিখিয়ে দেওয়া বুলি বলল, ‘আসলে পানি নাই।’

‘পানি নাই মানে?’ চেঁচিয়ে উঠল এক মুরব্বি। উনার হাতে মুরগির রান ধরা।

‘আসলে আমার মার্কা পানি হওয়ায় অনেকেই এটা নিয়ে হাসাহাসি করতেছে। তাই পানি রাখি নাই। আপনারা যদি আবার হাসেন।’

ততক্ষণে অনেকের গলায় ভাত আটকে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা। শেষ মুহূর্তে রাজু দুই জগ ঠাণ্ডা পানি  নিয়ে হাজির হলো। সবাই পানির ওপর হামলে পড়ল। আমরা রাজুর দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালাম। রাজু ভাব নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল।

‘আমাদের থিংক ট্যাংক তো ফাটিয়ে দিছে রে। এখন পানি বাইর না হইলেই হয়।’

পাঠক এখনো নির্বাচন হয়নি। আমরা জোর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের গ্রামে এসে কান পাতলেই শুনতে পাবেন,

অন্য কার কি দরকার, বদরুল ভাই চমত্কার!

পানি ছাড়া মার্কা নাই, পানি ছাড়া রক্ষা নাই।

বদরুল চাচা সবার দোয়াপ্রার্থী।



মন্তব্য