kalerkantho


মা এবং শাশুড়ির গল্প

তাসলিমা নীলু

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মা এবং শাশুড়ির গল্প

♦ আছমা বেগম মনে মনে ভাবলেন, ‘আজ এখনো তো কেউ দুপুরে খেতে ডাকল না।’

তিন মাস আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে প্রথম মাস ঠিকই ছিল। দ্বিতীয় মাস থেকে দুই ছেলে মাকে ভাগ করে নিল। মানে মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত মায়ের খাবারের দায়িত্ব নিল বড় ছেলে মিজান, আর ১৬ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত দায়িত্ব নিল ছোট ছেলে হাসান। গত মাস তো ঠিকই গেল, এ মাসেও তো কোনো অসুবিধা হয়নি! তাহলে আজ কেন খেতে ডাকছে না কেউ?

আছমা বেগম আবার ভাবতে বসলেন, ‘একবার নিচের তলায় গিয়ে ছোট বউমাকে বলব নাকি? কাল তো এই সময় ছোট বউমা খাবারের জন্য ডেকেছিল। নাকি আজ থেকে আবার ওপর তলায়?’

তারপর কি মনে করে আছমা বেগম বালিশের তলা থেকে চশমাটা বের করে চোখে চাপিয়ে হেঁটে এগিয়ে যান ক্যালেন্ডারের সামনে। আজ শনিবার, মার্চ মাসের ৩১ তারিখ।

 

♦ এক মেয়ে তার বাবার কাছে নালিশ করে বলল, ‘বাবা, তুমি কেমন ঘরে বিয়ে দিয়েছ?’

বাবা : কেন, জামাই কি খারাপ ব্যবহার করেছে?

মেয়ে : তোমার জামাই তো দুই মাস পর পর বাড়ি আসে। সমস্যার কারণ তো আমার শাশুড়ি। সারা দিন বলে শুধু এটা করো, বউমা ওটা করো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধুই খিটখিট করে যান। আমার একটুকুও ভালো লাগে না।

বাবা : আরে এই বয়সে মানুষ একটু এ রকম করেই।

মেয়ে : না বাবা, ওই বুড়ি যত দিন পর্যন্ত না মরছে, আমি আর ওই বাড়িতে ফিরে যাব না।

বাবা : এ রকম কথা বলতে নেই মা।

মেয়ে : তুমি তো ডাক্তার, এমন একটা কিছু ওষুধ দাও, যাতে ওই বুড়ি তাড়াতাড়ি মারা যায়।

বাবা : আমি ডাক্তার, কসাই না; এই কাজ আমি করতে পারব না।

মেয়ে : বাবা, তুমি কি চাও না, তোমার মেয়ে সুখে সংসার করুক।

বাবা : (একটু চিন্তা করার পর) ঠিক আছে মা। তোর মুখের দিকে তাকিয়েই আমি এই কাজ করছি, তোকে আমি একটা ওষুধ দিচ্ছি। এই ওষুধটা প্রতিদিন দুই ফোঁটা করে গরম দুধের সঙ্গে খাওয়াবি। দেখবি এক মাসের মধ্যেই তোর শাশুড়ি মারা যাবে। তবে এই এক মাস তুই তোর শাশুড়ির সেবা করবি। এটা আমাকে কথা দে।

মেয়ে কথা দিল।

পাঁচ দিন পর শাশুড়ি লক্ষ করলেন যে তাঁর বউমা আর আগের মতো নেই। এখন সে তাঁর আর কোনো কথারই অবাধ্য হয় না। আগের মতো আর তাঁর ওপর বিরক্ত হয় না। আর খুবই সেবা করছে।

২০ দিন পর শাশুড়ি তাঁর বউমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতে লাগলেন। তখনই তিনি নিজের বউমার জন্য স্পেশাল মেন্যু বানিয়ে খাওয়ালেন। বউমাকে আর আগের মতো কোনো কাজের জন্য না বলে সেই কাজটা নিজেই সেরে নিতেন। বউমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষা না করে নিজেই চা বানিয়ে, বউমার কাছে নিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে তার সামনে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বউমা চা খাও। দেখো আমি তোমার জন্য বানিয়েছি।’

বউমা : কেন মা, আপনি আমাকে ডাকতে পারতেন তো।

শাশুড়ি : কি যে বলো বউমা, তুমি সারা দিন ধরে এত খেটে আমার সেবা করছ, আর আমি এইটুকু করতে পারব না? এত দিন শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কটা মা-মেয়ের সম্পর্কে পরিণত হয়ে গেছে। তখন মেয়েটি তার বাবার কাছে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে বলল, ‘বাবা, তুমি আমার শাশুড়ি মাকে বাঁচাও। আর মাত্র তিন দিন বাকি। আমি চাই না যে আমার শাশুড়ি আমাকে ছেড়ে চলে যাক। তিনি আমার মায়ের মতো।’

বাবা : চোখের জল মুছে ফেল মা। আমি জানতাম একদিন তুই তোর ভুল ঠিকই বুঝবি। তাই আমি তোকে বিষ দিইনি। ওই ওষুধ খেলে তোর শাশুড়ির শরীরে পুষ্টি হবে। যা মা সুখের সংসার কর।

মেয়েটি হাসিমুখে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আই লাভ ইউ বাবা।’



মন্তব্য