kalerkantho

তালাক

সত্যজিৎ বিশ্বাস

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তালাক

বিয়ের মাস তিনেকের মধ্যেই হাসান টের পাওয়া শুরু করল, সংসার কী ধরনের রাইসমিল, অর্থাৎ এখানে কত ধানে কত চাল হয়। অনেক ভেবেও ধান-চালের হিসাব মেলাতে না পেরে জীবনের অনেক টানাপড়েন শেয়ার করা বন্ধু শফিককে নিয়ে এসিওয়ালা ফাস্ট ফুডের দোকানে বসল। দুটি কফির অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করতেই বেকুবটা হাসতে লাগল। মাথা চুলকে বলল, ‘কত ধানে কত চাল হয়, এটা না জানার কী আছে? প্রতি ধানে একটা করেই তো চাল হয়।’

হাসানের ইচ্ছা হচ্ছিল একটা কফির অর্ডার ক্যানসেল করে দিতে। অবশ্য ততক্ষণে কফি এসে গেছে। শফিকটাও যেন কী, ওয়েটার কফি রাখতে না রাখতেই ছোঁ মেরে মগ উঠিয়ে নিয়ে চুমুক দেওয়া শুরু করে দিল। মরুভূমিতে কত দিন অভুক্ত থাকার পর তৃষ্ণা মেটাচ্ছে যেন।

ইনভেস্ট যখন হয়েই গেছে, তখন দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য ধরে বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করে যেতে লাগল, ‘আরে ব্যাটা বিয়ে তো করিসনি, তুই কী বুঝবি? আমি যা-ই করি, তাতেই বউ ডাক দেয়। টিভিতে খেলা দেখলে—খেলা দেখো কেন? টিভি অফ করে চুপচাপ শুয়ে থাকলে—মনে মনে কার কথা ভাবো? অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে—কোথায় গিয়েছিলে, কার সঙ্গে দেখা করে এলে? আগে এলে—কী ব্যাপার, আজ এত তাড়াতাড়ি যে? অফিসে যাওনি, নাকি অন্য কোথাও গিয়েছিলে? কিছু করলেও দোষ, না করলেও দোষ। বাজার করে আনলে—বাজারের সব পচা মাছ, তরকারি কি তোমার জন্যই অপেক্ষা করে? না করে ঘরে ঢুকলে—বাজারের কথা মনেই থাকে না, তাই না? মনে এখন কে থাকে, সত্যি করে বলবে?  আগে কী সুন্দর বিছানায় শুয়ে আরাম করে সিগারেট টানতে টানতে ফেসবুকিং করতাম। বিয়ের পর বউয়ের কাছে কনফেস করতে করতেই কূল পাই না। বারান্দার চিপায় দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেতে খেতে সিগারেটে টান দেই, তা-ও তার সহ্য হয় না। বলে—দুটি জিনিস নিয়ে টানাটানি করলে তো চলবে না, একটার প্রতি টান ছাড়তেই হবে। হয় আমি না হয় সিগারেট। এখন তুই-ই বল, এসব ভালো লাগে কারো?’

‘ভাবি তো ঠিকই বলে। একটু সাহস কর। ছেড়ে দে’—বন্ধুর কথা শুনে রাগ হতে গিয়েও রাগ হয় না হাসানের। চোখ বড় বড় করে তাকায় বন্ধুর দিকে—ভেবে বলছিস তো? তুই অবশ্য ঠিক কথাই বলেছিস। ঝামেলা ঝুলিয়ে রাখা কোনো কাজের কথা নয়। ঝামেলা জিনিসটা হলো ক্যান্সার। ঘা দিন দিন বাড়তেই থাকে, কমে না।

বড় একটা শ্বাস নিয়ে আবার বলা শুরু করে হাসান, ‘কিন্তু মানুষ তাতে কী বলবে? আর আত্মীয়-স্বজনরা? সবাই কি ভালোভাবে নেবে ব্যাপারটা?’  

শফিক হাঁ হয়ে তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী বাদ দেওয়ার কথা ভাবছিস রে?’

 

রাগে জ্বলতে জ্বলতে মিলি একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগে কয়েকটি কাপড় নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে পড়ে।  মোবাইল কানে তুলে নিয়ে তার মাকে ফোন দিয়ে একনাগাড়ে বলে যেতে থাকে, ‘আমি আর পারছি না। হাসানের সংসার করার আর ধৈর্য নেই। যে মানুষটা আমাকে মানুষ বলেই গণ্য করে না, আমার কোনো ইচ্ছার দাম দেয় না, তার সঙ্গে দিনের পর দিন কিভাবে কাটাব, বলতে পারো? সে নিজে যেটা ভালো মনে করে, সব সময় তা-ই করবে। আজ হাসান সীমা ছেড়ে গেছে। কী হয়েছে শুনবে?’

এটুকু শুনেই মা ফোনে চিত্কার করে কাঁদতে শুরু করে দেয়, ‘কী বলিস এসব, সীমা কে? সীমার কথা তো আগে বলিসনি। জামাই ওকে ধরলই কবে আর ছেড়ে গেলই বা কবে?’   

মাঝারি সাইজের একটা ধমক লাগাল মিলি, ‘মা, তোমাকে বলি কী আর বোঝো কী? আমি বাসায় আসছি, এসে সব  ঘটনা খুলে বলব। আমি কিন্তু আর ওর ঘর করব না। এটাই আমার শেষ কথা।’

 

মিটিং বসেছে হাসান-মিলির আটতলার ফ্ল্যাটে। কখনো হাসানের পক্ষ অ্যাটাকিংয়ে, কখনো মিলির পক্ষ। কেউ কাউকে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। হাসান-মিলি বিবাহিত জীবনে কোনো ব্যাপারে একমত হতে না পারলেও এই এক বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। দুজনেরই ডিভোর্স চাই।  রেফারি হিসেবে হাসান-মিলির কিছু কমন ফ্রেন্ড এসেছে। হাসানের পক্ষ থেকে যখন মিলির দোষ বলা হচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে এমন পাষাণী বুঝি আর দুই পিস হয় না। আবার মিলির পক্ষ থেকে যখন হাসানের চরিত্র নিয়ে বলা হচ্ছে, শুনে মনে হচ্ছে এমন ভিলেন কী সারা পৃথিবীতে আর আছে!

রেফারিরা কখনো এদিক তাকায়, কখনো ওদিক। চিত্কার, চেঁচামেচি, কান্নাকাটি, তর্কযুদ্ধ—সব মিলিয়ে যখন তুমুল অবস্থা—হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, ‘কী ব্যাপার, নিচে পুলিশের গাড়ি এলো কেন?’

মুহূর্তেই যেন বাজ পড়ল। হাসান হাঁ হয়ে তাকিয়ে দেখল, সামনে মিলি ছাড়া আর কেউ নেই। পুরো বাসা নিমেষে খালি।       

একটু পরেই পুলিশ ঢুকে বলল, ‘কী ব্যাপার, থানায় ফোন এলো এই ফ্ল্যাটে নাকি অনেক গণ্ডগোল হচ্ছে, মারামারি  হচ্ছে। কী কেস? নারী নির্যাতন?’

হাসান মিষ্টি হেসে মিলির কাঁধে হাত রেখে বলল—‘কই, না তো!’



মন্তব্য