kalerkantho


দ্য জঙ্গল বই

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



দ্য জঙ্গল বই

জঙ্গলে আরেকটি রোদ ঝলমলে দিন। নিজের গুহার সামনে বসে বিশাল হাই তুলল বনের রাজা সিংহ। ধারালো দাঁতগুলো দেখে পাশে বসা তার ব্যক্তিগত সহকারী শিয়াল পণ্ডিত কেঁপে উঠল। মোটা ফ্রেমের চশমা খুলে মুছতে লাগল।

‘খাবারদাবারের কী অবস্থা পণ্ডিত?’ শিয়ালকে জিজ্ঞেস করল সিংহ।

‘এইতো, মহারাজ। এসে পড়ল বলে।’

‘কী এসে পড়ল বলে? সেই সকালে উঠেছি। এখনো কোনো খবর নেই? গ্যাস্ট্রিকের ঝামেলা হবে তো। কাকে দিয়ে আনাচ্ছ খাবার?’ আরেকটা হাই তুলল পশুরাজ। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে ফেলল শিয়াল।

‘মহারাজ, পাণ্ডাকে দিয়ে আনাচ্ছি। দ্রুত ফুড পৌঁছে দেওয়ার জন্য ও একটা সার্ভিস খুলেছে। অর্ডার করলেই বাইকে চেপে পৌঁছে দেবে।’

‘আরেকটা সার্ভিস কে যেন খুলেছে এ রকম? ওই দিন জঙ্গলের এক গাছে অ্যাড দেখলাম।’

‘জি, মহারাজ। কচ্ছপ খুলেছে। সমস্যা হলো, ও একটু দেরি করে ফেলে। ওই দিন এক হালি ডিম অর্ডার দিয়েছিলাম। ও আনতে আনতে ওগুলো বাচ্চা ফুটে বড় হয়ে মুরগি হয়ে পালিয়ে যায়। সেই অর্ডার এখনো পূরণ হয়নি।’

‘কচ্ছপ খুলছে ফুড সার্ভিস। তামাশা আর কি! আচ্ছা, খাবার এলে আমাকে জানাবে। এই নাও টাকা, বিল দিয়ে দিয়ো। আমি আরেকটু গড়িয়ে নিই। রাত জেগে লা লিগা দেখার অভ্যাসটা ছাড়তে হবে মনে হচ্ছে।’ আরেকটা হাই তুলে গুহায় ঢুকে পড়ল পশুরাজ।

একটু পরেই তরতাজা মাংস নিয়ে হাজির হলো পাণ্ডা সার্ভিস।

‘এত দেরি?’ নাকের ডগায় চশমা ঠেলে দিয়ে প্রশ্ন শিয়ালের।

‘আরে বোলো না। কুমিরের বাচ্চার জন্মদিন। কেক অর্ডার ছিল। ওটা ডেলিভারি দিয়ে আসতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল।’

‘কুমির আগে, না সিংহ আগে?’ খেপে গেল শিয়াল।

‘দেখো ভাই, আমি নেমেছি ব্যবসা করতে। জলে নেমে কুমিরের সঙ্গে কেন ঝামেলা করব, আবার ডাঙায় উঠে সিংহের সঙ্গে কেন?’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে যাও।’

‘আজকেও বিল দেবে না?’ পাণ্ডা প্রশ্ন করল।

‘তোমার সাহস তো কম না! বনের রাজা থেকে বিল খোঁজো?’

‘আসলে দেখো, পশুরাজ তো আমাদের স্টার গ্রাহক। এমনিতেই ডিসকাউন্ট পাবে। এখন যদি সেই টাকাও দিতে না চাও, তাহলে কিভাবে?’

‘কথা বাড়িয়ো না। শান্তিতে ব্যবসা করতেছ করো।’ ঝাড়ি দিল শিয়াল।

বিদায় নিল পাণ্ডা। বিদায় নিতেই দুটি কাজ করল শিয়াল। মাংসের একটা অংশ সরিয়ে ফেলল। আর সিংহ থেকে যে টাকাটা পাণ্ডাকে দেওয়ার জন্য নিয়েছে, সেটাও পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল।

দূর থেকে এ সব কিছু খেয়াল করল রাজ্যপরিষদের দুই সদস্য খরগোশ আর বানর।

‘শালার কাণ্ডটা দেখলি?’ খরগোশ বলল বানরকে।

‘গাছেরটাও খাবে আবার তলারটাও কুড়াবে!’ বানরের জবাব।

‘পুরা বান্দরের স্বভাব!’ ফোড়ন কাটল খরগোশ।

‘একটা লাথি খাবি। আমি কি ওই শিয়ালের মতো পণ্ডিত কোটায় ঢুকছি নাকি? রাত জেগে পড়ালেখা করে তারপর পরীক্ষা দিয়ে।’ বানর ভাব নিল।

‘আমিও তো। সাধারণ জ্ঞান পড়তে পড়তে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিলাম।’

‘আজকে আমাদের বাচ্চারা কখন চাকরি পাবে কে জানে? বাঘ ঢুকে যাচ্ছে মামা কোটায়, ময়ূর সুন্দরী কোটায়, বিড়াল মাসি কোটায়, কচ্ছপ ২জি কোটায়, কোকিল সারেগামাপা কোটায়, ঘোড়া ডিম কোটায়। আমরা সাধারণ পশুরা পাচ্ছি খালি ৩০ শতাংশ!’

‘বসে না থেকে একটা কাজ করি না কেন? আমাদের ছেলে-মেয়েদের বলি আন্দোলন শুরু করতে। যারা যারা কোটার আওতায় নিই তাদের সবাইকে।’

পরদিন সকালে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো জঙ্গল। রাজ্যের যত খরগোশ, বানর, হাতি, সাপ—সবাই হাজির হলো। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠল গাছের পাতা। সব পথঘাট বন্ধ করে দেওয়া হলো। অচল অবস্থায় পশুরাজের খাবার আসাও বন্ধ হয়ে গেল। আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করে তিনি দেখা করতে রাজি হলেন।

‘কী সমস্যা তোমাদের?’ জলদগম্ভীর কণ্ঠ পশুরাজের।

‘মহারাজ, মাফ করবেন।’ এক খরগোশ হাত জোড় করে বলল। ‘আজ আমরা চাকরিবাকরি না পেয়ে পথে পথে ঘুরছি। চাকরির কোনো গাইড বাকি রাখিনি। প্রতি মাসে বের হওয়া ‘জঙ্গল অ্যাফেয়ার্স’ ঠোঁটস্থ মুখস্থ। তার পরও চাকরি পাচ্ছি না।’

‘এখন যারা কোটায় চাকরি পাচ্ছিল, তারা কোথায় যাবে? এরা কি যোগ্য না?’ জানতে চাইল সিংহ।

‘মহারাজ, কোটায় চাকরি পাওয়া অনেকেই আপনার পাশে থেকে মাংস আত্মসাৎ করছে!’

‘কী বলো? কে সে?’ নিজের সভাসদের খরগোশের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়ল পশুরাজ।

‘মহারাজ, নাম বললে চাকরি থাকবে না!’ মিনমিন করে বলল খরগোশ।

‘তাড়াতাড়ি বলো। না বললে বরং চাকরি যাবে তোমার?’

ভিড়ের মধ্যে কে যেন বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘শিয়াল পণ্ডিত!’

‘তুমি আবার শিয়ালের নাম বলো ক্যান?’ রাজা বলল।

‘মহারাজ, শিয়ালই এই কাজ করে। আপনি খোঁজ করে দেখেন।’ বানর বলল।

শিয়ালের বাসায় নগদ অর্থসহ প্রচুর মাংস পাওয়া গেল। কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরো জোরদার হলো।

‘কোটায় চাকরি পাওয়া সবাই তো আর খারাপ না। এখন থেকে কোটাও থাকবে, সঙ্গে মেধাবীরাও। আর কোটা নিয়ে কোনো খোঁটা দেওয়া যাবে না।’ রায় জানাল সিংহ।

সবাই রাজার নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগল। এই সময় কচ্ছপ ঢুকল এক বক্স গরম দুধ নিয়ে।

‘আমি দুধ দিয়ে কী করব?’ সিংহ অবাক।

‘আসলে মহারাজ, আমি আপনার আইসক্রিম নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম। আসতে আসতে ওটা গলে যায়। এতক্ষণ ঠাণ্ডা ছিল। এরপর একদম গরম হয়ে গেছে!’

হেসে উঠল রাজ্যের সবাই।


মন্তব্য