kalerkantho

জীবন মানে

হেলাল নিরব   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



জীবন মানে

ক্লাস সেভেনপড়ুয়া ছাত্রীর অঙ্ক বোঝাতে গিয়ে খেয়াল হলো, তার ছোট ভাই এসে আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে। ছেলেটা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। হেসে বললাম, কিছু বলবে?

বলো তো ভাইয়া, জীবন মানে কী?

সাত বছরের ছেলের মুখে জীবনমুখী টাইপের প্রশ্ন শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। মুহূর্তে আকাশ-পাতাল ভেবে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম, কিন্তু কোনো তল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে মনে ভাবলাম, আসলেই তো। কখনো জীবনের মানেটাই জানতে চাইনি। এত ব্যস্ত থাকি যে জীবন কী, তা বোঝার চেষ্টাই করিনি।

হঠাৎ আমার ছাত্রী ধমক দিয়ে ওর ভাইকে চলে যেতে বলল।

আমি কোমলমতি শিশুমনে আঘাত দিতে চাই না। তাই ওকে আশ্বস্ত করলাম, ভাইয়া, তুমি ১৫ মিনিট পরে এসো। আমি ততক্ষণে উত্তর খুঁজি। কেমন?

তত্ক্ষণাৎ ছাত্রীর বইয়ে দাগ কেটে অঙ্ক করতে দিয়ে ভাবতে বসলাম, জীবন মানে কী? জীবনটা আসলে কী, কোনো মানে হয়?

ছাত্রী মাঝেমধ্যে আমার চিন্তাশীল ভাবসাব দেখে লুকিয়ে হাসল। খেয়াল করলাম না। আমার মনে-প্রাণে তখন একটাই চিন্তা। ছেলেটা যে পরিমাণ পাজি, আমাকে ঠিক ১৫ মিনিট পরে এসে আবার জানতে চাইবে, জীবন মানে কী?

শিশুদের তো ভুল শেখানো ঠিক না। তাই অনেক ভেবে সাহিত্যিক, দার্শনিক, এমনকি রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করে জীবনের একটা মানে দাঁড় করালাম। সেটা এ রকম, জীবন মানে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করা। ভালো একটা চাকরি জোটানো। পরে যথাসম্ভব একটা সুন্দরী মেয়ে জুটিয়ে সংসার করা। একসময় ছেলে-মেয়ে হলে লালন-পালন করা। আস্তে আস্তে বৃদ্ধ হয়ে গেলে, নাতি-নাতনিদের পুরনো দিনের কাহিনি শোনানো। শেষে কোনো একসময় নতুনদের জায়গা ছেড়ে দিতে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া। এটাই তো! এর বেশি আর কী হতে পারে?

কিন্তু সেদিনের শিশুকে এত কঠিন ও ভাবগম্ভীর ব্যাখ্যা তো দেওয়া যাবে না। কোমলমতি শিশুদের মাথায় চাপ ফেলার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। তাই ওর জন্য প্রযোজ্য সহজ উত্তর খুঁজতে লাগলাম।

ঠিক ১৫ মিনিট পরে বান্দা হাজির হলো।

ভাইয়া, এবার বলো, জীবন মানে কী?

আমি নিজের অপারগতা চেপে, মুখে আদুভাই টাইপের হাসি দিয়ে ওর কাছেই জানতে চাইলাম, তুমিই বলো, আমি জানি না।

ফিক করে হেসে পিচ্চি বলল, আপু দেখো, তোমার ‘স্যার’ জীবন মানেই জানে না! হে হে হে...

আমি প্রচণ্ড বিব্রত বোধ করছিলাম। স্বাভাবিক হওয়ার জন্য একটু হাসার চেষ্টা করে আবার বললাম, তুমিই বলে দাও উত্তরটা।

জীবন মানে, জি-বাংলা!

আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সাত বছরের বাচ্চাটার দিকে। মায়ের সঙ্গে বসে সিরিয়াল দেখতে দেখতে এদের মাথাটা গেছে। জি-বাংলা চ্যানেলের স্লোগানটাই এখন ওদের কাছে জীবনের মানে।

 

 


মন্তব্য