kalerkantho

টেক কেয়ার

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



টেক কেয়ার

জাবেদকে আমি ভালো করেই চিনি। ও যখন যার কাছে থাকে, তার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ, তার সব কথা ও বোঝে, ওর সব কথা শুধু সে-ই বোঝে। বোঝে বলে, দুজনের যখন তর্ক হয়, সে তর্ক হয় একমুখী। কিন্তু যা নিয়ে ও তর্ক করে, তা সে ওর মতো অথবা আপাত বিশ্বাস—সিদ্ধান্ত নয়। ওর সিদ্ধান্ত ও কাউকেই বলে না। সে বিষয়ে কেউ কথা তুললে, ও কান খাড়া করে অথবা মুখের দিকে তাকায়—মুখ খোলে না। যখন কাজের সময় আসে, ও ওর সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজটা করে নেয়। তারপর, সবাইকে তাক লাগিয়ে সফলও হয়। সফল হওয়া মাত্রই বলতে আরম্ভ করে, ‘কাজটা ভুল হইল, দোস্ত। নাদানের মতো কাজ হইছে।’ অন্য কেউ যদি বলে ফেলে, ‘এইডা কী করলি, ধুর’, ও হাজারটা যুক্তি এনে বোঝায়, ওর সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল অথবা অন্ততপক্ষে মন্দের ভালো হয়েছে। ও যাই বোঝাক, সবাই এক বাক্যে যেটা বোঝে, সেটা হলো—ওর সিদ্ধান্তটা সাহসী ছিল, কিন্তু ও যে যুক্তিগুলো দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করছে, সেগুলোর কোনোটাই ঠিক নয়—মানুষ এই ভাবনা মাথায় নিয়ে ওই কাজ করে না। ও অন্য কিছু ভেবে ওই কাজ করেছে। সে কথা ও কাউকেই বলবে না। সে কথা ও কাউকেই বলে না।

সেই জাবেদ আজ সকালে দুম করে ঘোষণা করল, আসছে এপ্রিল থেকে ও এক বছর অফিসে যাবে না, বেঙ্গল ইনস্যুরেন্স কম্পানি থেকে এক বছরের অবৈতনিক ছুটি নিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হঠাৎ!’

ও বলল, ‘হঠাৎ-ই।’

‘কেন?’

‘দোস্ত, এমএস করব?’

‘কোথায়?’

‘লন্ডন, ইউকে।’

‘কী বিষয়ে?’

‘লেদার টেকনোলজি।’

‘কস্ কী! তুই ইনস্যুরেন্সে চাকরি করে লেদার টেকনোলজি পড়ে কী করবি?’

‘সাবজেক্ট কোনো বিষয় নয়। উচ্চশিক্ষার জন্য একটা কিছু পড়লেই হয়।’

‘তাই বলে লেদার টেকনোলজি! তা-ও আবার ৪২ বছর বয়সে!’

‘বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল কান্ট্রি। এখানে প্রচুর অ্যাগ্রিকালচার হয়। সব হয় মান্ধাতার সিস্টেমে। আমাকে দেখা তো, এ দেশে কয়জনের লেদার টেকনোলজির ওপর ফরেইন ডিগ্রি আছে? আর বয়সের কথা যে বললি—লেখাপড়ার কোনো বয়স আছে?’

‘স্কলারশিপ পাইছস্?’

‘না, দক্ষিণখানের তিন কাঠার প্লটটা বেইচা দিছি। সাতান্ন লাখ।’

‘কস্ কী! কত লাগব।’

‘ও রকমই লাগব। টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া, ঘোরাঘুরি, শপিং, থিয়েটার...’

‘তাই বলে এত টাকা!’

‘আমার একার নয়, তোর ভাতিজির স্ট্যান্ডার্ড সিক্স, ভাতিজার স্ট্যান্ডার্ড টু...’

‘তার মানে, ভাবিও যাইব?’

‘তাইলে কি এক বছর একা থাকুম?’

‘এত টাকা খরচ কইরা ডিগ্রি নিবি?’

‘নিমুই তো...খালি ট্যাকা ট্যাকা করস ক্যা? তোর ভাতিজা-ভাতিজি যে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে এক বছর থাকব, সেইডা দেখবি না? ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড বুঝস?—ওয়েস্টার্ন ফিলোসপি, সায়েন্স, আর্টস, কালচার, শেকসপিয়ার, বেকন, হিউম, বার্ট্রান্ড রাসেল, স্টোনহেঞ্জ, আয়রন ব্রিজ, স্কটল্যান্ড, ইংলিশ চ্যানেল—সরাসরি এগুলোর ইনফ্লুয়েন্স নিয়া ওরা বড় হইব। পারসেপশনই পুরা চেঞ্জ হইয়া যাইব।...সোশ্যাল গ্রুমিং বইলা একটা বিষয় আছে। এর একটা খরচ আছে না? তুই সেটা দিবি না? এইখানে থাকলে তো ফান্ডামেন্টালিস্ট হইয়া যাইব। সাউন্ড সোশ্যাল গ্রুমিং হইব না।’

‘হুম্্!’

‘...তুই দ্যাখ, রবীন্দ্রনাথ বিলেত গিয়া আইলো মতোই, পুরা পারসেপশন চেঞ্জ—লিবারাল, ডেমোক্রেটিক, ফরওয়ার্ড লুকিং, ফারসাইটেড। ঠাকুর পরিবার ইয়াং ফিলোসফার রবীন্দ্রনাথের ওপর ইনভেস্ট করেছিল। পুরো ভারতবর্ষ তার ফল কী পেয়েছে, একবার দ্যাখ্।’

‘কিন্তু লেদার টেকনোলজির ডিগ্রি দিয়ে বাংলা মুল্লুককে কী দিবি?’

‘দেব, দেব।...এ দেশে ঘরে ঘরে কাঁচা চামড়ার দুর্ব্যবহার হচ্ছে—ওটা ঠিকমতো প্রসেস করতে হবে।’

‘কিন্তু, তোর ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে সেটা কিভাবে যায়?’

‘যায়, যায়...সোজাসুজি না—পাশাপাশি।’

জাবেদ চলে গেল, আমার গালে হাত বুলিয়ে বলে গেল, ‘টেক কেয়ার।’ প্রথম প্রথম, দিনে দুবার না হলেও দুদিনে অন্তত একবার ফোন দিত। তারপর, যা হয়, ওখানে নতুন স্বজন পেয়ে, আমাদের কথা ও আর মনে করত না, তবে মনে পড়ত। চার মাসের মাথায় একদিন ও ফোন দিয়ে জানাল, ‘দোস্ত, দোয়া করিস। বেয়াক্কেলের মতো একটি কাম কইরা ফালাইছি। তোর ভাবি মইরা যাইতে লাগছিল।’

‘কী হইছে!’

‘কাইলকা তোর ভাবির নরমাল হইছে—ভাতিজা।’

‘ভাবির অবস্থা কী?’

‘আইজকা রিলিজ দিয়া দিছে।’

‘আর ভাইস্তা?’

‘দুই পয়েন্ট পাঁচ কেজি—বার্থ সার্টিফিকেট নিয়া রাখছি। সিটিজেন বাই বার্থ—বার্থ রেজিস্ট্রেশনও করাইয়া ফালাইছি...টেক কেয়ার।’

আমিও বললাম, ‘টেক কেয়ার।’



মন্তব্য