kalerkantho

ভূতের গল্প

‘ভেজাল এফএম’ রেডিওতে আপনাদের স্বাগত। আমরা এখন শুনব আবুল মিয়ার জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর একটি ভূতের গল্প। দুর্বল চিত্তের শ্রোতাদের অনুরোধ জানাচ্ছি রেডিও বন্ধ করে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য। পরে কোনো সমস্যা হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। আসুন তাহলে, আমরা শুনি আবুল মিয়ার ভূতের গল্প।

আদিত্য রহিম   

২৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভূতের গল্প

সেদিন ছিল আষাঢ় মাস। আমি বাজার কইরা বাড়ি ফিরতাছি। অমাবইস্যার রাইত। ঘুটঘুটা আইন্ধাইর। একহাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। তখন আবার ম্যালা রাইত। গ্রামের রাস্তা তো, একটা কাকপক্ষীও নাই। আমি তো ভয়ে অস্থির। আমার হাতে ছিল দুইখান ইলিশ মাছ। সাড়ে ৬০০ টাকা দিয়া কিনা। দাম চাইছিল দুই হাজার। আমি কইছি থাপ্পড় দিয়া তোর দাঁত ফালায়া দিমু হারামজাদা! চিনোস আমারে!

আমরা মূল গল্পে ফিরে আসি।

যা-ই হউক, ইলিশ মাছ নিয়া বাড়ি ফিরতাছি। ইলিশ মাছ আবার ‘তেনাগো’ বিশেষ পছন্দের জিনিস। সেই কারণে আমার ডর আরো বাইড়া গেল। অবশ্য এখনকার ইলিশে আগের সেই গন্ধ আর সুয়াদ (স্বাদ) নাই। ইলিশ আনতেন আমার নানাজান! আহা রে, কী গন্ধ! কী টেস্ট! আইনা নানিরে কইতেন, ‘ও করিমের মা...’

আমরা সে গল্প না হয় আরেক দিন শুনব।

যা-ই হউক। কিছু দূর হাঁটার পর হালকা চান্দের আলোতে দেখি, সামনে মিয়াবাড়ির বটগাছ দেখা যায়।

কিন্তু আপনি তো বললেন অমাবস্যার রাত!

ইশ! ভাইজান, আপ্নে বড়ই সমস্যা করেন। কইলাম না এইটা ভূতের গল্প। এইখানে চান্দ মিনিটের মধ্যে উঠব, মিনিটের মইধ্যে নামব। এত প্রশ্ন করলে কইলাম আমি নাই, ডাইক্কা আইন্না বেইজ্জতি।

আচ্ছা, আচ্ছা। আমরা ঘটনায় ফিরে আসি। আপনি বটগাছ দেখলেন...তারপর?

এই বটগাছের আবার বিরাট কাহিনি। এই গাছের ডালে ফাঁস দিয়া কুলসুমা মরছিল। আহারে কুলসুমা! দেখতে বড়ই সুন্দর ছিল। স্কুলে আইতে-যাইতে কুলসুমের সঙ্গে রং-তামাশা করতাম। ‘টুনির মা’ কইয়া ডাক দিতাম। কুলসুম কিছু কইত না। ডরে তার মুখ দিয়া কথাই বাইর হইত না। খিক খিক খিক।

কুলসুমার কথা বাদ দেন, গল্পে আসেন।

যা-ই হউক, পূর্ণিমার রাইত, সব কিছু পষ্ট দেহা যাইতাছে। আতকা দেখি, আমার সামনে একটা কালা বিলাই। আমি বুঝলাম, এইটা কুলসুমা ছাড়া আর কেউ না। আমারে শাস্তি দিতে আইছে। আমি মাথা ঠাণ্ডা রাইখা কইলাম, ‘তুমি আমারে মাফ কইরা দ্যাও।’ বিলাইয়ে কয়, ‘ম্যাও’। বড়ই আজিব ব্যাপার! এই দিকে ‘ভাদ্র’ মাসের গরমে আমি ঘামে ভিইজা জুবজুবা। কুলসুমারে (বিলাই) কইলাম, ‘আমি আর জিন্দেগিতে কোনো মাইয়ার দিকে চউখ তুইলা তাকামু না, কেউরে মিসকল দিমু না, বাড়ি যাইতে দ্যাও।’ কুলসুমা কয়, ‘ম্যাও’। এমন সময় শুনি, পেছনে বেটা মাইনষের গলার আওয়াজ। আমি আপনাদের অনুষ্ঠানের মতো কইরা ডাক দিলাম, ‘কেডা? কেডা ওনে?’ আওয়াজ আইল—‘জি, আমি রহিম। ভালা আছেননি, ভাই?’ রহিমরে দেইখা আমার জানে শান্তি আইল। আবার লগে ডরও লাগল। এত রাইতে রহিম এইহানে কী করে? সামনে তাকায়া দেখি, কুলসুমা (কালা বিলাই) নাই! তহন আমার মনের সন্দেহ আরো বাইড়া গেল। তাইলে কি বিলাইটা রহিমের রূপ ধইরা আইল? আমি তাকায়া দেহি, আমাগো রহিমের মতো এই রহিমের শইল্যের রং ধলা না, কালা! বিলাইয়ের রংও কালা আছিল। কুলসুমার গায়ের রংও কালা আছিল। দুইয়ে দুইয়ে চাইর হইতে সময় লাগল না।

তারপর?

তয় আমি যে ভয় পাইছি, সেইটা রহিমরে (না কুলসুমার আত্মা?) মোটেও বুজবার দিলাম না। একবার যদি ব্যাটা টের পায় আমি ভয় পাইছি, আমার ঘাড় মটকাইয়া খাইব। আমি জোরে জোরে হাঁটতে থাকলাম। বাড়ি আমার আরো মিনিটদশেকের পথ। কেমতে যে যাই! এই দিকে রহিম আমার পিছ পিছ হাঁটতাছে।

খুবই ডেয়ারিং স্টোরি। তারপর?

রহিমের সঙ্গে হালকা গপসপও করা শুরু করলাম। এর মধ্যে দুইবার রহিম জিগাইল, আমার ব্যাগের মধ্যে কী? আমি কিছু কইলাম না। ও যদি একবার টের পায় ইলিশ মাছ, তাইলে আমার আর বাঁইচা থাহনের কোনো আশা নাই। কিছু সময় পর আমি রহিমরে কইলাম, চইত্র মাসের গরম টের পাইতেছ রহিম? কেমুন গা জ্বলতাছে? কিন্তু পেছনে কোনো উত্তর নাই! আমি কইলাম, ‘ও রহিম, রহিম!’ উত্তর নাই। পেছনে তাকায়া দেহি, রহিম নাই। আমার ধারণাই সত্যি হইলো। আমি জানের ডরে উইঠা দিলাম দৌড়! কুলসুমার ভূত আবার কোন সময় চইলা আসে ঠিক নাই।

সত্যি সত্যিই দৌড় দিলেন?

সত্যি না তো কি মিথ্যা? আজিব প্রশ্ন! তারপর শুনেন। এমন সময় পেছন থাইকা শুনি, রহিমের গলা—‘ও মিয়া ভাই, ও মিয়া ভাই।’ কুলসুমার ভূত আবার চইলা আইছে। আমি দৌড় থামাইলাম না। জানের শক্তি দিয়া দৌড়াইতে থাকলাম। কুলসুমার ভূত ‘রহিম’ও আমার লগে দৌড়াইতে থাকল। আর কইতে থাকল—‘ও মিয়া ভাই, আমারে লইয়া যান, আমারে লইয়া যান।’ আরে আমি কি আর এতই বোকা যে ওরে লইয়া যামু? শেষে দৌড়াইতে দৌড়াইতে বাড়ি আইসা পৌঁছাইলাম। এখন আর আমার কোনো ডর নাই! এমন সময় কুলসুমার ভূত রহিমও আইসা উপস্থিত। আমি কইলাম—‘কুলসুমা’, তুই এইহান থাইকা যা। নইলে কিন্তু আমি গেন্দা ওঝারে ডাকমু।

ভূত কী কইল?

ভূত রহিম কইল, ‘ও ভাইজান, আপনের কী হইছে, আমারে কুলসুমা কন ক্যান?’ আমি ভালো কইরা খেয়াল কইরা দেখলাম, রহিমের শরীরের ছায়া মাটিতে পড়তেছে। তার মানে এইটা ভূত না, ভূতের শরীরের কোনো ছায়া থাকে না। এইটা আসলেই রহিম। আমি রহিমরে কইলাম, ‘আমার পেছন থাইকা আতকা তুই গেসিলি কই?’

রহিম শরমের হাসি দিয়া কইল, ‘পিশাব পাইছিল ভাই।’ আমি কইলাম, ‘শালা কইয়া যাবি না?’ রহিম কইল, ‘ক্যাম্নে কমু ভাই? এই সব কতা কইতে শরম লাগে; কিন্তু আপ্নে দৌড় দিলেন ক্যান? কী হইছিল?’ আমি সত্য ঘটনা না কইয়া কইলাম, ‘কিছু না, মনে হয় কুলসুমারে দেখছিলাম, তাই দৌড় দিলাম।’

ও অবাক হইলো না?

না, উল্টা রাগ কইরা কইল, ‘তাই বইলা আমারে রাইখা দৌড় দিবেন? যে ভয়ডা পাইছিলাম। যা-ই হউক, একখান লুঙ্গি দেন।’ আমি জিগাইলাম, ‘লুঙ্গি চাস কেন?’ রহিম আবারও শরমের হাসি দিয়া কইল, ‘অর্ধেক কামের মধ্যে আপনে উইঠা দিলেন দৌড়। আমিও দিলাম দৌড়। বাকি অর্ধেক দৌড়াইতে দৌড়াইতেই...’

আমি কইলাম, ‘ছি, রহিম! তুই এত ডরাস? তোরে আমার ছুটো ভাই পরিচয় দিতেই লজ্জা করব। যাউক গা, লুঙ্গি বদলাইয়া বাড়িত যা, কাইলকা ফেরত দিছ।’ রহিম লুঙ্গি লইয়া বাড়িত চইলা গেল। আমিও খেতা মুড়ি দিয়া আরামসে ঘুমাইতে গেলাম। আর ভাইবা দেখলাম, রহিম যদি সময়মতো না আইত, তাইলে ওই কুলসুমার ভূত ‘কালা বিলাইটা’ আমারে জানে মাইরা ফেলত। কার দোয়ায় বাঁইচা আইছি কে জানে?



মন্তব্য