kalerkantho

বায়োপিক

মো. সাখাওয়াত হোসেন

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বায়োপিক

আঁকা : সামির

মানুষ খাল কেটে কুমির আনে। আমি নীল তিমি নিয়ে আসছিলাম।

বিশাল নীল তিমি।

প্রথম থেকেই বলি। আমাদের এলাকায় বার্ষিক পিকনিক হয়। সে পিকনিকে প্রতিবছর একটা নাটকের আয়োজন থাকে। আমরা এলাকার নুরুল চাচার দোকানে বসে চা পান করতে করতে আলোচনা করছিলাম, এবার কী নিয়ে নাটক করা যায়। একেকজন একেক আইডিয়া দিচ্ছিল। আশিক বরাবরের মতো প্রেমের প্রতি জোর দিল। প্রেম-প্রীতির দিকে ওর আবার ঝোঁক বেশি!

‘আমরা এবার একটা বায়োপিক করি না কেন?’ আমি বুদ্ধি দিলাম।

‘আবার বায়োপিক? কারটা?’ পরপর দুটি প্রশ্ন ছুড়ে দিল রাজু।

‘বাবলু ভাইয়ের!’ বোমা ফাটালাম আমি।

বাবলু ভাই আমাদের পাড়ার একজন নামকরা বড় ভাই ছিল। এলাকার মুরব্বিরা যাকে মাস্তান বা গুণ্ডা বলে ডাকতেন। তবে মাস্তান বা গুণ্ডা বলতে যে রকম নৃশংসতা বোঝানো হয়, তখন তা মোটেও ছিল না। বাবলু ভাই ছিল অনেকটা ‘কোথাও কেউ নেই’য়ের বাকের ভাইয়ের মতো। এলাকার চায়ের দোকানে বসে গান শুনতে শুনতে চা খাওয়া আর বিকট শব্দে বাইক নিয়ে এলাকার মধ্য দিয়ে ছুটে যাওয়াই ছিল তার মূল কাজ। এলাকার রুমি আপুর সঙ্গে ছিল তার উথালপাতাল প্রেম। কিন্তু বিজ্ঞানের চিরাচরিত সূত্র মতে, রুমি আপুর বাবা অন্য জায়গায় তার বিয়ে ঠিক করেন। বিয়ের দিন অনুষ্ঠানস্থলে দলবল নিয়ে হাজির হয় বাবলু ভাই। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। সেখানে বলা বাবলু ভাইয়ের ডায়ালগ অনেক দিন আমাদের এলাকার লোকজনের মুখে মুখে ফিরছিল।

প্যান্ডেলে ঢুকে বাবলু ভাই বলেছিল, ‘কেউ নড়বেন না। আমরা কারো কোনো ক্ষতি করব না। রুমির অন্য জায়গায় বিয়ে হচ্ছে, এতে আমার কিছু করার নেই। আমরা শুধু ছেলের বাবাকে তুলে নিয়ে যেতে আসছি, উনিই মূলহোতা। বাকিরা এখানেই থাকেন। ’

তখন রুমি আপু স্টেজ থেকে উঠে বলে—‘বাবলু, তুমি চলে যাও, প্লিজ!’

বাবলু ভাই খুব অবাক হয়ে রুমি আপুর দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে বের হয়ে যায়। এরপর অনেক দিন তাকে দেখা যায়নি। পরে যখন সে এলাকায় ফেরে, তখন তার লম্বা চুল-দাড়ি। এরপর আবার গায়েব। আর তাকে দেখা যায়নি।

‘এলাকার মুরব্বিরা যদি কোনো ঝামেলা করেন?’ সাকিব জিজ্ঞাসা করল।

‘আমরা কি কাউকে বলব নাকি?’

‘পরে বুঝলে?’

‘আরে বুঝলে বুঝবেন। ’

আমরা জোরেশোরে নাটকের মহড়া শুরু করলাম। যথারীতি নাটক হলো। বাবলু ভাইয়ের চরিত্রে রাজু একেবারে ফাটিয়ে দিল। রুমি আপুর চরিত্রে সানজিদার অভিনয়ও বন্ধুমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হলো। নাটক প্রচারের পর এক সন্ধ্যায় আমি আর রাজু এলাকা থেকে বের হয়ে পাশের এলাকার দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাত্ একটা কালো মাইক্রোবাস পাশে এসে থামল। একজন কালো মতো লোক মুখ বের করে বলল—‘আচ্ছা, সিরাজের বাড়িটা কোন দিকে?’

আমরা পথ বাতলে দেওয়ার পরও লোকটা বলল, ‘একটু আমাদের সঙ্গে চলো, দেখিয়ে দেবে। ’

আমরা দুই রামছাগল রাজি হয়ে গেলাম। মাইক্রোবাসে উঠতেই আরেকজন কোথা থেকে উঠে পাশে বসে আমাদের দুজনকে মাঝখানে ঠেলে দিল। মাইক্রোর দরজা বন্ধ হতেই পাশের লোকটা বিশাল দর্শনের একটা ছুরি বের করে ফেলল।

‘কথা না বলে চুপচাপ ঝিম ধইরা বইয়া থাক। টুঁ শব্দ করলে কান কেটে বাসায় কুরিয়ার সার্ভিস করে পাঠিয়ে দেব। ’

‘আপনারা মনে হয় ভুল করে...’ আমাদের পুরো বাক্য শেষ করার আগেই রাজুর কানের ওপর বিশাল এক চড় পড়ল।

এরপর আমাদের একটা পুরনো বিল্ডিংয়ে নিয়ে একটা রুমে ঢুকিয়ে দুজনকেই চেয়ারে বেঁধে ফেলা হলো। পুরো ব্যাপারটা তখনো আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না।

একটু পর একজন এসে বলল, ‘ওস্তাদ আসতেছে। যা জিজ্ঞাসা করবে, ঠিকঠাক জবাব দিবি। নইলে জিব কেটে হাতে দিয়ে দেব। ’

একজন লোক এসে আমাদের সামনের চেয়ারে বসল। লম্বা লম্বা চুল, মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি।

‘বাবলুকে নিয়ে নাটক করার বুদ্ধিটা কার?’

আমরা সঙ্গে সঙ্গে বাবলু ভাইকে চিনে ফেললাম।

‘ইয়ে মানে ভাইয়া, ওটা তো পুরোপুরি আমরা আপনার ওপর বেইস করে করিনি। মানে ওটা কোনো বায়োপিক না। ’

‘তাহলে?’

‘ওটা জাস্ট আপনার ঘটনা থেকে ইন্সপায়ার হয়ে করা। ’

‘ইন্সপায়ার। এই বয়সে রঙ্গ-তামাশা দেখি শিখে ফেলছ। তোমরা পুরা ঘটনাটা জানো?’

‘মানে?’ আমরা অবাক হলাম।

‘পুরো ঘটনা না জেনেই একজনের ওপর নাটক বানিয়ে ফেললে? আমার মতো একজনের সঙ্গে বিয়ের আগে সম্পর্ক ছিল বলে বিয়ের পর রুমি চরম অশান্তিতে থাকে। এরপর ওর ডিভোর্স হয়। ওকে আমি বিয়ে করি। আমাদের ছোট দুটি বাচ্চা আছে, আমাদের এখন সুখের সংসার। ’

আমরা হাঁ হয়ে গেলাম।

‘তোমরা আবার একটা নাটক বানাবা। ওখানে আমাদের এই হ্যাপি এন্ডিংটা দিবা। মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করা সহজ নাকি?’

‘এইবার ঠিকঠাক মতো বায়োপিক না হইলে টুথপিক দিইয়া চোখ তুইলা কাচের বয়ামে ভইরা দিয়া দিমু। ’ ঘাড়ের ওপর থেকে বাবলু ভাইয়ার সাগরেদ বলল।

আমাদের আবার এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হলো।

‘মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করা সহজ না। ’ এলাকায় নেমেই রাজু ফিসফিস করে বলল।

‘তার ওপর জীবিত মানুষের!’ আমিও ফিসফিস করলাম।

 


মন্তব্য