kalerkantho


(অ)নিয়ন্ত্রিত জীবন

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



(অ)নিয়ন্ত্রিত জীবন

আশপাশে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনকারী ব্যক্তিরাই আমাকে সারাটা জীবন ঝামেলা দিয়ে গেল। আমি নিজে এসব নিয়ন্ত্রণের ধার ধারি না।

ছেলে-মেয়ে, মা-বাবাকে দেখে শেখে। আমি শিখেছি আমার বাবাকে দেখ। আমার বাবার ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর তিনি চায়ে এক চামচ চিনি বাড়িয়ে খেতে শুরু করেন। এতে নাকি বিষে বিষ ক্ষয় হবে। আমি সেই পরিবারে বড় হয়ে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকি?

আমি কখনোই ভোরে উঠি না, যদি ভোরে কোনো খেলা না থাকে। রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাই না, যদি না ভোরে খেলা দেখতে উঠতে না হয়।

এলাকার মোড়ে বসে নুরুল মিয়ার মালাই চা খাচ্ছিলাম। বন্ধু তারেক চা নিল না। চা না খাওয়ার যুক্তি যেটা শোনাল, সেটি শুনে বন্ধু আশিক আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে দিল।

‘চা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তার সঙ্গে দুধ মেশালে সেটা বিষ হয়ে যায়। ’ তারেকের যুক্তি।

‘তাই বলে চা খাওয়া বন্ধ করে দিবি? রামছাগল বলে কী?’ অবাক রাজু।

‘চা খাব না বলিনি। দুধ-চা খাব না। এখন থেকে গ্রিন টি খাব। সব নায়ক-নায়িকা, মডেল সবাই গ্রিন টি খায়। ’

‘যা ইচ্ছা কর। গ্রিন টি খা, ম্যাজেন্টা টি খা, ব্লু টি খা—তোর ইচ্ছা। কানের সামনে ভ্যানভ্যান করিস না। ’ আমি খেঁকিয়ে উঠলাম।

তারেক উঠে চলে গেল। সেই যে গেল আর কোনো খবর নেই। বেশ কয়েক দিন পর তারেকের মা ফোন করে আমাদের তলব করলেন। ব্যাপার কী? এত জরুরি কেন? আমরা দ্রুত হাজির হলাম। যত না বন্ধুর খাতিরে তার চেয়ে বেশি তারেকের মায়ের হাতের বানানো পাস্তার লোভে।

তারেকের বাসায় গিয়ে তাকে দেখে আমাদের চোখ কপালে উঠে গেল। চোখের নিচে কেমন কালি পড়ে গেছে, চেহারায় একটা বিবর্ণ ভাব।

‘তোরে তো কিশমিশের মতো লাগতেছে রে!’ রাজুর কথায় সবাই হেসে ফেললাম। তারেকের মা যেটা বলল সেটা হলো, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আর খাওয়াদাওয়া করতে সে বাসা থেকে বের হতো না। সারা দিন বাসায় থাকে, কোনো পরিশ্রম নেই। খাবারের রুচি চলে গেছে। এ জন্য এই অবস্থা।

‘তোমরা একটু বুঝাও। ’

হৈ-হুল্লোড় করে আমরা তারেককে আবার বাইরে নিয়ে এলাম। নুরুল মিয়ার দোকানে পর পর দুই কাপ মালাই চা, সঙ্গে নানরুটি দিয়ে খেয়ে তারেকের চেহারায় আভা ফিরতে লাগল।

এরপরের ঘটনা আরেক বন্ধু রাফিকে নিয়ে। রাফি ছেলেটা ভালোই ছিল। হাসিখুশি, স্বাস্থ্যবান। হঠাত্ সে ভূতের কিল খেলো, রামকিল। সে ঠিক করল তাকে বডি বানাতে হবে। জিমে ভর্তি হতে হবে।

‘তারপর কই যাবি? জব্বরের বলি খেলা খেলতে?’

রাফি আশিকের কথার জবাব দিল না। জিমে ভর্তি হয়ে গেল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পেশি গঠন হতে লাগল।

একদিন রাফিকে দেখে এসে রাজু আমাদের জিজ্ঞাসা করল, ‘রাফির বাইসাপ দেখেছিস?’

‘ছাগল কুহানকার! ওইটা বাইসাপ না, বাইসেপ। ’

‘আরে হইল আর কি। দেখছিস? কি দারুণ ফিগার হইছে!’

আমরা দেখলাম। আসলেই রাফিকে দারুণ লাগছে। হিংসার ছোট একটা লাল আগুন আমাদের বুকের ভেতরে কোথাও জ্বলতে লাগল। তারপর অনেক দিন রাফির খবর নেই। পরে তার খবর নিতে বাসায় গিয়ে দেখি, রাফি বিছানায় শুয়ে চিচি করছে।

‘ঘটনা কী? ইন্দুরের মতো করতেছিস ক্যান?’ একগাল হেসে রাজু জিজ্ঞাসা করল। হাতি পাকে পড়লে ওইটাকেও লাথি মেরে আসে রাজু, এতো আমাদের রাফি।

রাফি বলল, জিমে অতিরিক্ত ওজন তুলতে গিয়ে কাঁধের একটা ছোট হাড় ভেঙে গেছে। তিন মাস বেড রেস্ট। আমাদের হাসি দুই কানে গিয়ে ঠেকল।

‘এ জন্যই বলি, কাবিলাতি করতে হয় না। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন থাকে বইপত্রে। বাস্তব জীবনে এসব নেই। ’ সুড়ুত করে মালাই চায়ে চুমুক দিয়ে আমি বললাম।

সেদিনই সন্ধ্যায় নুরুল হকের দোকানে বসে আমরা আলোচনা করছিলাম। হঠাত্ এলাকার সাগর ভাই এসে পাশে বসল। সে জগিং করে এসেছে।

‘আরেক ছাগলা আসছে!’ ফিসফিস করে রাজু জানালো।

‘এই তোরা সারা দিন শুয়ে-বসে কী করস? ব্যায়ামট্যায়াম করতে পারিস না?’

‘করি তো!’ অবাক হয়ে আশিক বলল।

‘কই কী করিস? কখনো দেখলাম না যে। ’

‘আমাদের যেসব বন্ধু ব্যায়াম করত, তাদের হাসপাতালে দেখতে যাই ডেইলি। ’

আশিকের কথায় আমরা সবাই হেসে উঠলাম। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা সদা হাস্যোজ্জ্বল আমরা কয়েকজন।


মন্তব্য