kalerkantho


কিকিসির একটি সকাল

ধ্রুব নীল   

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



কিকিসির একটি সকাল

আঁকা : বিপ্লব

সাতসকালে মেজাজ খারাপ কিকিসির। ব্রেইনবুকের ইনবক্সে এক উটকো লোকের বার্তার অ্যালার্মে ঘুম ভেঙে গেল।

চেনা নাই-জানা নাই আচমকা সতর্কবার্তা। যেন কিকিসিকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নাই। হাত ইশারা করতেই একটি হলোগ্রাফিক বাকশো এসে হাজির। হালকা ফুঁ দিতেই খুলে গেল ইনবক্স। বার্তায় চোখ বোলালো কিকিসি—
‘আপনার বন্ধু বা আত্মীয়দের মধ্যে পরপর তিনজন যদি আপনাকে ব্রেনবুকে ফোন দিয়ে কী রে, কেমন আছিস বলে, তাহলেই সতর্ক হয়ে যাবেন। সঙ্গে সঙ্গে লাইন কেটে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ব্রেনবুক থেকে লগ-আউট করবেন। কারণ, পরপর তিনজনের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর আপনি চিন্তায় পড়ে যেতে পারেন। নিজে কেমন আছেন, সেটি আপনি বুঝতে পারবেন না। তারপর আপনি চিন্তার অতলে হারিয়ে যাবেন। এভাবে হারাতে হারাতে একপর্যায়ে আপনার মাথায় ঘুরতে থাকবে, আমি কেমন আছি...আমি কেমন আছি। এই সুযোগে আপনার ব্রেনবুকে ঢুকে পড়বে দুশ্চিন্তা নামের একটি হ্যাকিং অ্যাপ। হ্যাক হয়ে যাবে আপনার মনোজগত্। আপনি আর আপনি থাকবেন না। এরপর আপনি বন্ধুদের সন্দেহ করতে শুরু করবেন..., এরপর আপনি ধীরে ধীরে আত্মহত্যা...। ’
বাকিটা পড়ার ধৈর্য হলো না। আয়েশ করে হাই তুলতে যাবেন, অমনি মিনিত্রির ফোন। ‘কী রে! কেমন আছিস! কেমন আছিস! কেমন আছিস!’
‘এক কথা এতবার বলছিস কেন!’
‘আরে! বলিস না। পরপর তিনবার কেমন আছিস না বললেই বিপদ! তুই আত্মহত্যা করে বসতে পারিস! তোকে বাঁচিয়ে দিলাম!’
‘তোদের যন্ত্রণায় তো মনে হচ্ছে সেটি করে বসতে হবে। দুই দিন পর পর একটা করে হুজুগ নিয়ে হাজির। ’
‘আরে নাহ! খুব সিরিয়াস। মাথা একবার হ্যাক হলে আর উপায় নেই। আমাদের ক্লাসে পড়ত, রুহিহিহি, ওর বড় মেয়েটা এখন কারো সঙ্গে কথা বলে না। ওকে কেমন আছ জিজ্ঞেস করলেই হু হু করে কান্না শুরু করে দেয়। আবার মিসিনিদির বড় ছেলের মাথা কে জানি হ্যাক করেছে। প্রগ্রামিং আর যন্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকত ছেলেটা, সে এখন সারা দিন উচ্চাঙ্গ সংগীত গায়। ১০ কোটি টাকা চায় হ্যাকার। না দিলে নাকি ছেলেটা বাকি জীবন সারেগামা করেই কাটাবে। ’
‘খুব ভালো কথা। আমরা গান শুনতে যাব কবে?’
‘সাবধানে থাকিস। অচেনা কারো অনুভূতি ফিল করতে যাস না। ট্যাগ অপশন বন্ধ রাখ। ’
‘উফ্ফ! এত জটিলতা আর ভালো লাগে না! ব্রেনবুক-ট্রেনবুক অ্যাকাউন্ট বাদ দিয়ে দেব এখনই। ’
‘তুই একটা সেকেলে। যা যা, তোর জন্য ফেসবুকই ভালো। আর শোন, আমার পিএইচডি থিসিসের টপিক রেডি। পেপারটা তুই লিখে দিবি দোস্ত। না করিস না। আর হ্যাঁ, টপিক হলো বাংলাদেশে সেলফ ভিউর বাজার। ’
‘এ ছাড়া আর কিছু পাসনি? নিজের আর্টিফিশিয়াল ভার্সন প্রজেকশনের আবার বাজার কিসের?’
‘আছে আছে! দাদুদের সময় সেলফির বাজার ছিল না একসময়! ওই রকম এটারও হবে। এখন আমাকে বল, আমার আর্টিফিশিয়াল ভার্সন বানাতে আইফোন একান্ন নাকি বায়ান্ন, কোনটা ভালো হবে?’
‘জাহান্নামে যা। আমি ঘুরতে বের হব আজ। ফুল লগ-আউট হবো একটু পর। এরপর ঠিক করেছি, ধীরে ধীরে সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেব। ’
‘বলিস কী! তার মানে তুই ব্রেনবুক রাখবি না?’
‘না, আমার মাথার চিন্তাভাবনা মাথায়ই থাক। কেউ আবার হ্যাকট্যাক করলে মুশকিল। মাঝেমধ্যে পুরনো ফেসবুকটা নেড়েচেড়ে দেখব। ’
‘ব্রিমু অ্যাকাউন্টও বন্ধ?’
‘হুম। ’
‘ব্রুইটার, ইমুস্কি, হামব্রা, ব্যা ব্যা, ঘেউই?’
‘সব মুছে দেব! সব!’
‘তুই নির্ঘাত রুপালি ইলিশ গেমটা খেলা শুরু করেছিস! ডাঙায় ওঠার দুই মিনিটের মধ্যে মারা যাবি বন্ধু!’
‘গেলে যাব। তোদের কী! আমি অফলাইনে গেলাম। ’
‘এই অফলাইনে যাওয়াটা তোর কত নম্বর টাস্ক? যা-ই হোক, অন্তত ব্রেন কানেক্টর অ্যাপটা রাখিস! তা না হলে তোর অনুভূতি জানব কী করে। ’
‘নাহ...ওটাও রাখব না। এসব কৃত্রিম অনুভূতি জেনে কাজ নেই। আমি কেমন আছি দেখতে হলে আমার ঠিকানা তো জানিস, বাসায় আসবি। মুখে বলে দেব। ’
‘অ্যা মা! ছি! শুনেই বমি বমি লাগছে। তোর একটা সেলফ ভিউ পাঠা তো, দেখি তোর চেহারাটা কেমন। ’
‘এসে দেখে যা!’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর কথাই রইল। মাঝেমধ্যে অন্তত কুককুরুকে একটা বার্তা দিয়ে রাখিস। ’
লাইন কেটে দিল কিকিসি। ফোনটার দিকে তাকাল। পাতলা ফিনফিনে একটা যন্ত্র। ডান হাতের তালুতে বিশেষ একটা আঠা দিয়ে সেট করা। অনেকটা সময় নিয়ে সেটি খুলল। হাতটা কেমন খালি খালি লাগছে। এরপর ঘাড়ের পেছনে লাগানো সূক্ষ্ম পিনটা ধীরে ধীরে বের করতে শুরু করল। কাজটা সাবধানে করতে হয়। সূক্ষ্ম একটা ব্যথা হয়। তবে সহ্য করা যায়। মগজ থেকে পিনটা সরিয়ে নিতেই লগ-আউটের শব্দ পেল কিকিসি। আহ! শান্তি শান্তি, একটা অনুভূতি সারা শরীরে বয়ে গেল। মাথার ভেতর যেন এতক্ষণ একটা গুবরে পোকা বিজবিজ করছিল। পোকাটা যা বলে, সেটিকেই মনে হতো সত্যি। এখন ছাড়া পেয়ে ফুরুত্ করে পালিয়ে গেল ওটা। কিকিসি ভাবল, আরো মিনিট দশেক ঘুমিয়ে নিলে মন্দ হয় না।


মন্তব্য