kalerkantho

GUN বাজনা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



GUN বাজনা

আমার ছোট চাচার দুটি স্বপ্ন ছিল। এক. কিছু না করা, আর দুই. সংগীতশিল্পী হওয়া।

প্রথম স্বপ্ন তিনি প্রায় বাস্তবায়ন করেছেন। পুরো জীবনে একটি বিয়ে করা ছাড়া আর কিছুই করেননি। আর দ্বিতীয় স্বপ্ন?

তখন আমরা স্কুলে পড়তাম। ছোট চাচা আমাদের বাসায় থাকতেন। প্রতিদিন সকালে উঠে তিনি বিকট শব্দে গার্গল করতেন। এতে নাকি কণ্ঠ পরিষ্কার হয়! এরপর শুরু হতো তার হেঁড়ে গলার রেওয়াজ। সেই রেওয়াজে ভোর ৬টায় বাসার সবার ঘুম ভেঙে যেত। আমাদের একটা অ্যালার্ম ঘড়ি ছিল, যেটা কোনো কাজেই লাগত না। শুধু ছোট চাচা কখনো গ্রামের বাড়ি গেলে আব্বা বলতেন, ‘সফিউল তো বাড়িতে।

সকালে তুলে দেবে কে? দেখি, ঘড়িটা বের কর, বেল দিয়ে রাখি। ’

এই ছিল ছোট চাচার গান। আমার ছোট বোনের গান শেখার খুব শখ ছিল। ছোট চাচার গান শুনে ভয়ে সে আর গান শিখল না। ছোট চাচার গানের শখ শেষ হয় তাঁর বাসর রাতে। স্ত্রীকে প্রথমেই একটা গান শোনাতে চেয়েছিলেন। নববধূ গান শুনেই হেসে ফেলেন। সেই দিন থেকেই চাচা গান ছেড়ে দেন। এসেই চাচার গান বন্ধ করার সাফল্যে শ্বশুরবাড়িতে খুব দ্রুত সবার মন জয় করে নেন ছোট চাচি।

যখন কলেজে উঠলাম, তখন আমরা বেশ ব্যান্ডের গান শুনতাম। ছোট ছোট অডিও ক্যাসেট কিনে গান শুনতাম। তখন আর্ক অনেক পপুলার। হাসানের গান শুনতাম আর তাঁর মতো চিকন গলায় বন্ধুরা মিলে গাইতে চেষ্টা করতাম।

‘হে হে হে...

সুইটি তুমি আর কেঁদো না। ’

মনে হতো, আহা রে, হাসান বেচারার মনে অনেক কষ্ট! বিকেলে যে গলিতে খেলতে যেতাম, ওখানে আমি আর এক বন্ধু মিলে এই ‘সুইটি’ গানটা সারা দিন গাইতাম। একদিন সে খবর আনল, সুইটি গানটা আর গাওয়া যাবে না। গলিতে নতুন একটা মেয়ে এসেছে, যার নাম সুইটি। মেয়ে আমাদের চেয়ে এক বছরের ছোট। বাবা জজকোর্টের উকিল। হেভি গরম পাবলিক। মাইরা ছাল তুইলা ফেলবে।

আমরা সুইটি গাওয়া বন্ধ করে দিলাম। তারপর এক বিকেলে সুইটিকে দেখলাম। লম্বা দীঘল কালো চুল, সাদা একটা ড্রেস পরে গলি আলো করে হেঁটে যাচ্ছে। বন্ধু কানের সামনে ফিসফিস করল, ‘ওই যে সুইটি যায়। ’

এরপর সুইটি গানটা আবার গাওয়া শুরু করলাম, তবে মনে মনে। সেটি আরেক ফিলিংস। সেই বয়সেই হাসানের দুঃখটা একটু একটু অনুভব করতে পারছিলাম।

এরপর ভার্সিটিজীবন। নবীনবরণে অরুণা নামের এক মেয়ে রবি ঠাকুরের ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’ গেয়ে সব ছেলের মন কেড়ে নেয়। ‘সখী ভালোবাসা কাহারে কয়’—অরুণার এই প্রশ্নের জবাব দিতে সব ছেলের লাইন পড়ে। আমি ভাবলাম, এই মেয়ের মন পেতে হলে গানই গাইতে হবে। ভার্সিটির একটা অনুষ্ঠানে সাহস করে গানে নাম দিয়ে ফেললাম। সেদিন গান গাওয়ার সময় অতিরিক্ত উত্তেজনার বশে স্বাভাবিকভাবেই স্টেজ থেকে পড়ে গেলাম। পা গেল ভেঙে। মজার ব্যাপার হলো, আমাকে হাসপাতালে দেখতে এলো অরুণা। আমার বন্ধুরা মুখ কালো করে বলল, ‘এ রকম জানলে তো আমরাও স্টেজ থেকে পড়ে পা ভেঙে ফেলতাম। ’

যখন চাকরিজীবনে এলাম, তখনো অদ্ভুতভাবে গান আমার সঙ্গে লেগে রইল। ছোট চাচার অভিশাপ নাকি কে জানে! এখানে অবস্থা আরো ভয়াবহ। আমাদের বস একজন সংগীতানুরাগী মানুষ। তাঁর গান গাওয়ার জন্য সবই আছে। শুধু একটা জিনিসের অভাব। গলায় সুর বলতে কোনো জিনিসই নেই। এই একটা জিনিসের অভাবেই তাঁর সব আয়োজন লবণ ছাড়া তরকারির মতো হয়ে যায়। অফিসের কোনো অনুষ্ঠানের আগে আমাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হতো। কারণ বসের গানের প্র্যাকটিস চলত। সেই গান শুনে আমাদের পিয়ন মতলব মিয়া পর্যন্ত মাথা নাড়তে নাড়তে বলত, ‘এই জায়গায় আর বেশি দিন চাকরি করন যাইব না!’ আর আমাদের মোসাহেবির কারণে বস ভাবতেন, আসলেই তিনি ভালো গান। ঘটনা ঘটল গত সপ্তাহের করপোরেট নাইট অনুষ্ঠানে। বস হেঁড়ে গলায় গান শেষ করে ডিনারের সময় আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন হলো?’

‘সেই রকম হইছে স্যার!’

‘ফাটাই দিছেন বস!’

এসবের মাঝে আমাদের কলিগ তামান্না খুব স্পষ্ট আর ঠাণ্ডা স্বরে বললেন—‘স্যার, সত্যি কথা বলতে আপনার গলায় সুর বলতে কিছু নেই। ’

আমার হাত থেকে স্যুপ ছলকে আমার সাদা শার্ট ভিজে গেল। পাশে বসা দেবাশীষ বাবু পানি পান করতে গিয়ে বিষম খেয়ে নাকেমুখে করে ফেলল।

‘কী বললে?’ স্যার জানতে চাইলেন আবার।

‘স্যার, সত্যি কথা বলতে—আপনি গান ভালোবাসেন ঠিক আছে; কিন্তু আপনার গলায় ওই জিনিস ফোটে না!’

পুরো অনুষ্ঠানে স্যার আর কোনো কথাই বললেন না। রেস্টুরেন্ট থেকে নামার সময় আমরা সবাই ঘিরে ধরলাম মিস তামান্নাকে।

‘কী করলেন এটা?’

‘পাগল নাকি আপনি?’

‘আমি আগামী সপ্তাহ থেকে অন্য জায়গায় জয়েন করছি। ’ মিস তামান্না হেসে বললেন। হাসলে তাঁকে অসাধারণ লাগে


মন্তব্য