kalerkantho


গরুর হাটে জানে আলম

মেহেদী আল মাহমুদ

২৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



গরুর হাটে জানে আলম

বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে জানে আলম। ও লেভেল, এ লেভেল দেশে শেষ করলেও উচ্চশিক্ষা তিনি লন্ডনে সেরেছেন।

এই কয়েক দিন আগে দেশে ফিরেছেন তিনি। সামনে ঈদ। সে উপলক্ষে ঠিক করেছেন, বাবাকে কোরবানির গরু উপহার দেবেন। আর তাই তিনি রওনা দিয়েছেন গাবতলী পশুহাটের দিকে।

জানে আলম যখন গাবতলী হাটে পৌঁছলেন, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। আগে কখনোই তিনি গাবতলী হাটে আসেননি। সত্যি বলতে কি, এটাই তাঁর জীবনের প্রথম গরু কেনা। দিনের আলো থাকতে থাকতে বাসায় পৌঁছানোর জন্য মা বলে দিয়েছেন। অগত্যা দেরি না করে হাটের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এক বিক্রেতাকে তাঁর পছন্দ হলো। কাছে গিয়ে মোলায়েম সুরে বললেন, ‘দোকানদার ভাইয়া, আপনার কাছে কি গরু হবে?’

ছলিম মিয়া সিজনাল গরু ব্যবসায়ী। প্রতিবছর ইন্ডিয়া থেকে রাজস্থানি গরু আমদানি করেন। এবার করতে পারেননি। তাই তিন ট্রাক দেশি গরু এনেছেন। এই মুহূর্তে তাঁর মেজাজ গরম। কিছুক্ষণ আগে এক কাস্টমারের সঙ্গে গরুর দাম নিয়ে ক্যাচাল করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি উদ্ভট প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, তাহলে মেজাজ আরো গরম হওয়াটাই স্বাভাবিক। ছলিমের সেটাই হলো। তিনি প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে গরম স্বরে বললেন—‘জি না, ভাই। গরু হইব না। তয় সুমাত্রার নাক লম্বা বান্দর আছে। দিমু নাকি এক পিস?’

ব্যাপারীর ব্যবহারে জানে আলম একটু কষ্ট পেলেন, ‘রাগ হচ্ছেন কেন, ভাইয়া? না থাকলে বলবেন নাই!’ ছলিম নিজেকে কন্ট্রোল করে বললেন, ‘রাগ হব না? চারপাশে গরু নিয়ে বসে আছি, আর আপনি গরু আছে কি না জিজ্ঞেস করেন! যা-ই হোক, দেখেন কোনটা পছন্দ হয়। ’ জানে আলম ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে মুহূর্তেই পছন্দের গরু নির্বাচন করে ফেললেন। তারপর সেই গরুর দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘এটা একটু দেখান। ’

ছলিম গরুটাকে অন্য গরুদের থেকে আলাদা করে কাস্টমারকে দেখার সুযোগ করে দিয়ে পাশে দাঁড়ালেন। তারপর লক্ষ করলেন, কাস্টমার গভীর মনোযোগ দিয়ে গরুর চামড়ায় কী যেন খোঁজার চেষ্টা করছেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার কি কিছু খুঁজবার লাগছেন?’

জানে আলম বললেন, ‘এক্সপায়ার ডেটটা খুঁজছিলাম। আমি আবার এক্সপায়ার ডেট না দেখে কোনো জিনিস কিনি না। একটু হেলথ সচেতন তো, তাই। তা ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট আর এক্সপায়ার ডেটটা কোথায় লিখেছে?’

ছলিম অবাক, ‘স্যার কী কইলেন বুঝবার পারি নাইক্যা? এক্সটায়ার ফায়ার আমাগো গরুতে পাইবেন না। তয় গরু ভালো। নিশ্চিন্তে নিয়া যান। তেজি জিনিস। ’

জানে আলম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তার মানে আপনারা ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট আর এক্সপায়ার ডেট দেননি! পুলিশ আপনাদের এভাবে প্রডাক্ট বিক্রি করতে দেয়?’ তারপর একটু আফসোস করে বললেন, ‘দেশটার যে কী হবে! হায় রে অভাগা দেশ!’

ঘটনার এ পর্যায়ে ছলিম কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বললেন—‘স্যার, গরু পছন্দ হইছে?’

জানে আলম বললেন, ‘গরু ঠিক আছে, তবে কালারটা কেমন যেন ফেড মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আপনার কাছে আর কী কী কালারের গরু আছে? আই মিন ডিপ ব্লু কালারের হবে? আই লাভ ব্লু। ’

ছলিম একটু বিভ্রান্ত; ‘স্যার, গরু তো সাদা কালা আর লাল ছাড়া আর কোনো কালারের হইতে দেখি নাই। আপনে যে কালারের কথা কইতাছেন, সেই কালারের মাল তো জন্মেও শুনি নাই। ’

ব্লু কালারের গরু নেই শুনে জানে আলম সত্যিকার অর্থেই হতাশ হলেন। ব্যাপারীকে বললেন, ‘গরুটা ঠিকমতো দুধ দেয় তো?’

জানে আলম বললেন—‘স্যার, এইডা তো গাই গরু না যে দুধ দিব! এইডা ষাঁড় গরু। ষাঁড় গরুর কাছে দুধ চাইলে গরুতে হাসব। ’

জানে আলম ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘আপনার গরু দুধ দেয় না! তাইলে তো ডিফেক্ট আছে। ’

ছলিম কাস্টমার ছাড়তে চান না। তিনি বললেন—‘স্যার, একেবারে দেয় না তা না। ভালো খাবারদাবার দিলে, ভালো পরিবেশে রাখলে এরাও দুধ দেয়। ’

জানে আলম বিক্রেতার কথায় একটু সন্তুষ্ট হলেন, ‘আমাদের বাসার পরিবেশ অবশ্য ভালো। এসি আছে। ফাইন, আগে বাসায় নিয়ে যাই, তারপর ব্যাপারটা দেখব। আপনার গরু নিলাম। প্রাইজ ট্যাগটা কোথায় লাগানো, দেখি। ’

ছলিম বললেন, ‘কী কইলেন স্যার, বুঝলাম না। ’

জানে আলম অবাক হয়ে বললেন, ‘বুল শিট, আপনাদের প্রাইজ ট্যাগও নেই! আপনারা এভাবে দোকানদারি করেন কেন, ভাইয়া? একটু নিয়ম-কানুন তো মানবেন, তাই না। যা-ই হোক, দাম বলেন। ’

ছলিম বললেন, ‘৮০ হাজার টাকা দিবেন স্যার। হাসিলের টাকা আলেদা। ’

জানে আলমের এক দামে জিনিসপত্র কিনে অভ্যাস। তিনি আর দামাদামির মধ্যে গেলেন না। পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে ছলিমের হাতে দিয়ে বললেন, ‘ওকে, ডান। এখান থেকে টাকাটা ব্যালান্স করে নিন। আর হ্যাঁ, গরু অবশ্যই র্যাপিং পেপারে র্যাপিং করে দেবেন। গিফটের গরু তো, তাই। তবে র্যাপিংয়ের জন্য আমি আলাদা কোনো কস্ট দিতে পারব না। ’ 
mahedialamahmud@gmail.com


মন্তব্য