kalerkantho


রাইটার্স ব্লক

মো. সাখাওয়াত হোসেন

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রাইটার্স ব্লক

অসম্ভব রকম কষ্টে দিন যাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারের ফর্দ আর অফিসের ফাইল ছাড়া কিছু লিখতে পারতেছি না।

মাথাভর্তি বস্তাপচা আইডিয়া আর গল্প নিয়ে বসে আছি। কলম নিয়ে বসলে আর কিছু বের হয় না। ওই দিন একটা সাদা কাগজ নিয়ে লিখতে বসলাম। এমনিতেই কলম ঘুরাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, পুরো পেইজ ভর্তি করে ফেলেছি ‘ব্যা ব্যা ব্যা ব্যা’ লিখে। বড় আপু দেখে বলল, ‘ছাগল ছিলি জানতাম। সেই ছাগলের আগে একটা রাম ছিল জানতাম না। ’

এক বন্ধুকে কল দিলাম। সে-ও টুকটাক লেখালেখি করে।

কণ্ঠে এক সাগর বেদনা ফুটিয়ে বললাম, ‘দোস্ত আমি কিছু লিখতে পারতেছি না। ’

‘কেন, ল্যাপটপ নষ্ট?’

‘আরে ব্যাটা ল্যাপটপ না। রাইটার্স ব্লক ধরছে। ’

‘দূর হালা। ওইটা তো শুধু বিখ্যাত লেখকদের ধরে। তোর অন্য কিছু হইছে। ’ এই বলে সে লাইনটা কেটে দিল।

মনে কষ্ট পেলেও এটা ভেবে সান্ত্বনা পেলাম যে বিখ্যাত কিছু একটা হচ্ছি বোধ হয়। আরেক লেখক বন্ধুকে কল দিলাম। পুরো ব্যাপারটা সে মন দিয়ে শুনে বলল, ‘কোন হাত দিয়ে লিখিস তুই?’

‘ডান হাত। ’

‘তাহলে তুই ডান হাতের একটা আঙুল কেটে ফেল। কোনো বিখ্যাত এক লেখক রাইটার্স ব্লক হওয়ার পর এটাই করেছিলেন। ’ লাইনটা কেটে দিল সে।

এবার ভাবলাম, লেখক কোনো বন্ধু না। সাধারণ কোনো একজন থেকে সলিউশন নেওয়ার চেষ্টা করা যাক। আরেকজনকে কল দিয়ে সমস্যাটা বলতেই সে একগাল হেসে বলল, ‘আরে আমার তো এই মাসেই সাতটা রাইটার্স ব্লক হলো। ’

আমার হাত থেকে মোবাইল পড়ে যাওয়ার দশা। যে লেখালেখি করে না তার সাতটা রাইটার্স ব্লক। তা-ও এক মাসে!

‘ক্যামনে দোস্ত?’

‘আর বলিস না, ফেসবুকে সাতটা রাইটার্সকে ব্লক করলাম। বইমেলা শুরু হওয়ার পর এরা এত ঝামেলা করতেছিল। ’

কী করব, কোথায় যাব, ভেবে না পেয়ে নেট খুলে বসলাম। রাইটার্স ব্লক নিয়ে লেখাগুলো পড়া শুরু করলাম।

এক বিখ্যাত লেখকের কাছে এক প্রকাশক এলো।

‘আমরা আপনার একটা বই বের করব। আপনার যেহেতু অনেক ভক্ত ফলোয়ার, তাই আপনাকেই এর প্রচার-প্রসার চালাতে হবে। আর আমি জানি, আপনার বেশ কিছু ভালো আর্টিস্ট বন্ধু আছে। তাদের কাউকে বলেই একটু প্রচ্ছদের কাজটা করিয়ে নেবেন। ’

প্রকাশকের সব কথা শুনে লেখক বললেন, ‘এ ছাড়া বই যেদিন প্রকাশ হবে, সেদিন আপনি একটা আলোচনা সভার আয়োজন করবেন। যেখানে আমার কিছু পরিচিত লেখক বন্ধুকে আমন্ত্রণ করবেন। কিছু সাংবাদিকও আমার পরিচিত আছে। তাঁদের আমন্ত্রণ জানালে তাঁরা সহজেই এর কাভার করবেন। ’

‘তাহলে তো খুবই ভালো হয়। ’ খুশি হয়ে উঠল প্রকাশক।

‘কিন্তু আমি শুধু একটা কাজ করতে পারব না?’ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল লেখক।

‘এত কিছু করতেছেন আর একটা কাজ না করলেও হবে। ওটা আমরাই করব। বলেন, কী কাজ?’

‘শুধু লিখতে পারব না। আমার রাইটার্স ব্লক হয়েছে!’

নেটে এসব পড়তে পড়তেই ফান ম্যাগাজিনের একজন সম্পাদক কল করলেন।

‘কী ব্যাপার শাখাওয়াত, লেখা কই?’

‘ভাই, আমি আসলে লিখতে পারতেছি না। ’

‘আপনার দুইটা চেক জমা হইছে। আরেকটা হলেই একসঙ্গে জমা দিয়ে দেব। আরেকটা লেখা দিয়ে দিন। ’

এই প্রথম কেউ একজন ভালো জায়গায় হাত দিল। চেক জমা হয়েছে। আরেকটা লেখা হলেই গোলগাল ফিগারের একটা টাকার পরিমাণ জমা পড়বে। এর চেয়ে ভালো প্রেরণা আর হতে পারে না।

আমি আমাদের এলাকার চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। মেহেদী ভাই নামের একজন বড় ভাই একবার বলেছিলেন, ‘লেখা না এলে টংয়ের চায়ের দোকানে বসে যাবেন, অথবা লোকাল বাসে উঠে যাবেন। ’

আমি চোখ-কান খোলা রেখে চায়ের দোকানে

বসে গেলাম। এলাকার চার-পাঁচজন মুরব্বি বসে ছিলেন। তাদের চা আসতেই তাঁরা কথা শুরু করলেন।

একজন বললেন, ‘আরে নুরুল, চায়ে দেখি একটা মাছি সাঁতার কাটছে। ’

আরেকজন বলল, ‘এবারের অলিম্পিকে সাঁতারে আমাদের একটা মেয়ে পুরস্কার পাইছিল না?’

‘সাঁতারে আমাদের আরো ভালো করার কথা। নদীমাতৃক দেশ। নদী দিয়ে আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা আরো ভালো করার কথা। ’

‘এই যে রাস্তাঘাটে এত দুর্ঘটনা—এসব তখন

কমত। ’

‘এদের শাস্তি দিলেও দোষ। দেখেন না, একজনকে শাস্তি দেওয়ায় কত কাহিনি করতেছে। ’

‘কী ঐক্য এদের মধ্যে, খেয়াল করছেন?’

‘সেটাই। আমাদের মধ্যেই খালি ঐক্য নেই। ’

আমি অবাক হয়ে বসে রইলাম। চায়ের কাপের মাছি শেষ হলো পরিবহন ধর্মঘটে এসে। এভাবেই তো একটা লেখা সৃষ্টি হয়। আগে শুরু তো করতে হবে। বাসায় দৌড় লাগালাম। আমি লিখতে পারব। ল্যাপটপ খুলে বসলাম। ভাবলাম, আমার রাইটার্স ব্লক দিয়েই শুরু করি।

‘অসম্ভব রকম কষ্টে দিন যাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারের ফর্দ আর অফিসের ফাইল ছাড়া আর কিছু লিখতে পারতেছি না...’


মন্তব্য