kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

একদা একদিন

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



একদা একদিন

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম অনেক সমস্যা নিয়ে। প্রথম সমস্যা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য।

অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েছি। লাভ হয়নি। এক বন্ধু বুদ্ধি দিল, টয়লেটে বসে কবিতা পড়বি। কবিতা মন শান্ত করে।

আমি বললাম, ‘মন শান্ত করে লাভ নেই। আমার পেট শান্ত করতে হবে। ’

বন্ধু বুঝিয়ে দিল। মন শান্ত হলেই শরীরের সব নার্ভ শান্ত হবে। আমিও একদিন কবিতার বই নিয়ে ঢুকে পড়লাম। পুরো কবিতাসমগ্র শেষ হয়ে গেল কিন্তু আমার কিছুই শান্ত হলো না। যা-ই হোক, বিছানা থেকে উঠেই নাশতা সেরে কাস্টমার কেয়ারের দিকে দৌড়ালাম। ইন্টারনেট প্যাকগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে না। আজকাল ব্রেন ঠিকঠাক কাজ না করলেও চলা যায়, কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া অসম্ভব।

কাস্টমার কেয়ারে ভিড় কম। টোকেন নিলাম। নম্বর চার দুই। পরে আরেকটা শূন্য পড়লে একেবারে সোনায় সোহাগা হয়ে যেত। সার্ভিস ডেস্কের দিকে তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ আটকে গেল। তিন তরুণ আর এক তরুণী সার্ভিস দিচ্ছে। ক্যাটরিনা কাইফকে কালো ফ্রেমের চশমা, লাল জামা আর সাদা ওড়না পরালে যেমন লাগবে, তরুণীকেও ঠিক তেমনি লাগছে। সে হাসছে যেন ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার টিকিট ঝরে পড়ছে। কবিতাও মনে আসছে অনেক। টয়লেটে বসে কবিতা তো আর কম পড়িনি! তরুণীর কাউন্টার নম্বর ৩। এইবার সেই তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন মনে পড়ল। ‘আমার ডাক কি মেয়ের ডেস্কেই পড়বে?’

আশপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি দেখলাম। আমি নিয়ে মোট ছয়জন অপেক্ষায়। বিদেশি স্বামী-স্ত্রী আছে। নিজেদের ভাষায় কথা বলছে। ঝগড়া করছে না প্রেম করছে বোঝা যাচ্ছে না। সাবটাইটেল থাকলেও হতো। এরপর দুই বান্ধবী। আছে এক বয়স্ক চাচা, যে আমার পাশে বসেছে।   আমিসহ মোট ছয়জন।

চাচার সমস্যা গুরুতর বোঝা যাচ্ছে। মোবাইলের সমস্যা না, পেটের। একটু পরপর গুড়গুড় করে আওয়াজ হচ্ছে। গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট খেতে মনে হয় দেরি হয়েছে।

‘টোকেন নম্বর শূন্য তিন আট। কাউন্টার নম্বর এক। ’

বিদেশি দম্পতির মহিলা উঠে গেল।

কাউন্টার দুই, তিন, চারে সার্ভিস চলছে। তরুণী হেসে হেসে এক ভদ্রলোককে বোঝাচ্ছে। ভদ্রলোকের ওঠার নাম নেই। টিফিন ক্যারিয়ারে করে বোধ হয় লাঞ্চ নিয়ে এসেছে। এখানেই করবে, ব্যাটা ফাজিল।

এর মধ্যেই চার নম্বর কাউন্টার খালি হলো।

‘টোকেন নম্বর শূন্য তিন নয়। কাউন্টার নম্বর চার। ’

দুই বান্ধবীর একজন উঠে চলে গেল। আমার বুক কেঁপে গেল। তিনটা হার্টবিট মিস হলো। তিন নম্বর কাউন্টার খালি হয়েছে।

‘টোকেন নম্বর শূন্য চার শূন্য। কাউন্টার নম্বর তিন। ’

অন্য মেয়েটা উঠে গেল। মানে তার সিরিয়াল ৪০। মানে চাচার ৪১ আর আমার ৪২। ইস্, চাচাকে এখন অন্য কেউ ডেকে নিলেই আমার রাস্তা পরিষ্কার।

গুড়গুড়...

মেঘ ডাকছে চাচার পেটে। কবিতা মনে পড়ে গেল।

‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা, কাস্টমার কেয়ারে বসি আছি, নাহি ভরসা। ’

তিন নম্বর কাউন্টারে কি আমি যেতে পারব? কে আমাকে ভরসা দেবে!

আমি তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ক্যাটরিনা কাইফ সার্ভিস দিচ্ছে। যে মেয়ে সার্ভিস নিচ্ছে আমি মনে মনে তাকে বললাম, ‘তুই এখন উঠিস না রে বোন। ’

কারণ খালি হলেই এটা চাচার দখলে চলে যাবে।

আমি আশপাশে বাকি কাউন্টারগুলোর দিকে তাকালাম। সবাই সার্ভিস দিচ্ছে, সার্ভিস নিচ্ছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের দুই বলে তিন রান লাগবে, মনে হচ্ছে অঙ্ক পরীক্ষায় আর দুই মিনিট বাকি, এখনই খাতা নিয়ে নেবে, মনে হচ্ছে... মনে হচ্ছে...

তিন নম্বরের মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে এক নম্বর কাউন্টারের বিদেশি মহিলাও দাঁড়াল। ঘোষণা শুরু হলো।

‘টোকেন নম্বর শূন্য চার এক। কাউন্টার নম্বর তিন। ’

‘টোকেন নম্বর শূন্য চার দুই। কাউন্টার নম্বর এক। ’

চাচা উঠে ক্যাটরিনার দিকে রওনা দিল। আমি বসে থাকলাম। আজ আমি কোথাও যাব না। আবার ঘোষণা হলো...

‘টোকেন নম্বর শূন্য চার দুই। কাউন্টার নম্বর এক। ’

আমি অনেক কষ্টে উঠে রওনা দিলাম। যেভাবে দুই রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করা ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটা ধরে।

সার্ভিস শেষে বের হলাম। যাওয়ার সময় একপলক তাকালাম তরুণীর দিকে। বনলতা নাকি হৈমন্তী?

কাস্টমার কেয়ারের বাইরে এসে দেখি, ভাগ্যবান চাচা মিয়া। পান খাচ্ছে।

আমি এগিয়ে গেলাম, ‘চাচা, কী সমস্যা ছিল আপনার?’

‘গরম লাগতেছিল রে ভাতিজা। তাই ওখানে এসির ভিতরে ঢুইকা বইসা আছিলাম। হুদাই, তেমন কোনো সমস্যা আছিল না। তুমি ক্যান গেছিলা?’

আমি কোনো জবাব দিলাম না। বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলাম। আজ আমার দীর্ঘশ্বাসেই ভারী হোক শহরের বাতাস।


মন্তব্য