kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গরু যদি লেখে ‘মানুষ’ রচনা

মানুষ

ধ্রুব নীল   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গরু যদি লেখে ‘মানুষ’ রচনা

 ভূমিকা

মানুষ একটি আগাগোড়া গৃহপালিত প্রাণী। গৃহের বাইরে দীর্ঘ সময় কাটালেই তার অমানুষ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

দুটি হাত ও দুটি পা থাকলেও মশা-মাছি তাড়ানোর লেজ নেই। মানুষকে তাই মশা-মাছি তাড়াতে মশারি, কয়েল, ওষুধসহ আরো বহু কিছু কিনতে হয়। মানুষ বড় অসহায়। আহা রে গো-বেচারা!

 

উপকারিতা

মানুষের উপকার অনেক। তারা আমাদের খাবারের জোগান দেয়। আমাদের মোটাতাজা করে। আমাদের নিয়ে রচনাও লেখে। এমনকি এবারের ঈদে আমাদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যাও তারা বের করবে। যদিও সেটা হাসি-ঠাট্টার সংখ্যা, তবু আমরা তাতে কিছু মনে করি না।

মানুষের উপকারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এর সব কিছুই কাজে লাগে। মানুষের চুল পরচুলা কম্পানিগুলোর কাছে অনেক দামি বস্তু। এই চুল ঠিক রাখার জন্য মানুষ শ্যাম্পু লাগায়। ওই শ্যাম্পু আবার কিছু মানুষের আত্মবিশ্বাসের জোগান দেয়। তাদের আর কিছুই লাগে না।

মানুষের চামড়া একটি আশ্চর্যজনক বস্তু। কিছু মানুষের চামড়া খুব শক্ত। সাধারণ চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে চরম অপমান, কোনো কিছুই তাতে লাগে না। কিছু মানুষের চামড়া জন্মগতভাবে অনেক শক্ত থাকে। দিনের পর দিন বিশেষ সাবান ও প্রসাধনী মেখে ওই চামড়া নরম করতে হয়। চামড়া নরম করা নিয়েও কিছু মানুষের টেনশন অনেক। সুতরাং সন্দেহ নাই, মানুষের চামড়ার অর্থনৈতিক মূল্য থাকুক না থাকুক, এই চামড়ার একটা অর্থনীতি ঠিকই আছে। ঠিক একইভাবে দাঁতেরও। এটাও অনেক মূল্যবান। মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে। দাঁতের যত্নে বাজারে পণ্যের তাই অভাব নাই।

মানুষের কঙ্কালও অনেক দামি। আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটে কেনাবেচা হয়। মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীদের কাছে কঙ্কালের বড়ই কদর। এই কঙ্কালের জন্য মানুষ মানুষের কবরও চুরি করে। গরুর রক্ত কোনো কাজে না লাগলেও মানুষেরটা লাগে। মানুষের মলও খুব উপকারী। বিশেষ করে শহরের মানুষের। ড্রেন থেকে ওই মল মাটিতে মিশে তৈরি হয় জৈবসার। ওই সার মেশানো মাটি বিক্রি হয় শহরের নার্সারিগুলোতে। সবুজ-শ্যামলে তরতরিয়ে বেয়ে ওঠে গাছপালা আর ঘাস, আহা ঘাস! কচি কচি ঘাস! হাম্বা! হাম্বা!

মানুষ রপ্তানিও হয়। বৈধ-অবৈধ সব পথেই মানুষ মানুষকে রপ্তানি করে। মানুষের এত দাম! এতে অনেক টাকা আয় হয়। মানুষের শরীরেরও অনেক কিছু রপ্তানি হয়, যেমন—কিডনি, চোখ, বোনম্যারো। মোটকথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে মানুষের ভূমিকা অপরিসীম।

 

বৈশিষ্ট্য

গরুর পাকস্থলীর চারটি কম্পার্টমেন্ট থাকলেও মানুষের একটি মাত্র পাকস্থলী। তবে অবাক করা বিষয় হলো, পাকস্থলী চারটি না থাকলেও বেশির ভাগ মানুষ সারা দিন শুধু খাই খাই করে। এ জন্য মানুষকে অনেক কিছু খাওয়াতে হয়। নিয়মিত খাদ্যতালিকার পাশাপাশি মানুষকে মোটাতাজা করতে ঘুষ খাওয়ানো হয়। ঘুষ ছাড়াও মানুষের খাবারের তালিকায় আরো আছে—স্পিড মানি, ত্রাণসামগ্রী, বিদেশি সাহায্য ইত্যাদি। এ ছাড়া মানুষের জন্য সময়ে সময়ে মিশ্র ও সুষম খাবারের দরকার পড়ে, যেমন—আকিকার খাওয়া, জন্মদিনের খাওয়া, ভালো রেজাল্টের খাওয়া, চাকরির খাওয়া; এরপর প্রমোশনের, বিয়ের, বিবাহবার্ষিকীর, চার দিনের, ৪০ দিনের—খাওয়ার কোনো শেষ নাই। খাওয়ার হিসাবে মানুষ একটু ব্যয়বহুল প্রাণী।

তবে গরুর মতো মানুষও ভার বহন করতে পারে। ভারবাহী মানুষকে তাই অন্য মানুষরা ‘বলদ’ সম্বোধন করে। যদিও এটা ঠিক না। সব মানুষ বলদ না। কিছু মানুষ বলদ।

 

দাম

ঈদ এলে আমাদের, মানে গরুর কদর বাড়ে। কিন্তু কিছু মানুষও এ সময় নিজেদের দাম বাড়াতে তৎপর থাকে। ঈদে মানুষ নিজেদের দাম কেন বাড়ায় এ এক রহস্য। তবে মজার বিষয় হলো, এ সময় মানুষ নিজের দাম বাড়ায় আমাদের মাধ্যমে। মাত্রাতিরিক্ত দাম দিয়ে গরু খরিদ করে মানুষ নিজেকে দামি ভাবতে শুরু করে ও আনন্দ লাভ করে। এর বাইরে মানুষের দাম ক্ষেত্রবিশেষে বেশি-কম হয়। সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হয় শ্রমিক মানুষ। এরপর মোটামুটি দামে বিক্রি হয় চাকরিজীবীরা। চাকরি করা মানুষরা ভালো দামে বিক্রি হলেও ক্রমে তাদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা দিনে দিনে দামি বলদের মতো হয়ে যায়। গরুর মধ্যে যেমন বিদেশি গরু আছে, যারা শুধু দুধ দিয়ে যায়, এমন কিছু মানুষও আছে, গোয়ালঘরটাই যাদের কাছে গোটা দুনিয়ার মতো। এমন মানুষ সমাজ-সংসারের জন্য উপকারী। আর জগৎ-সংসারে বেশি দাম পায় সরকারি চাকরিজীবী মানুষ ও বড় মাপের ব্যবসায়ীরা। মশা-মাছি তাড়ানোর জন্য এদের লেজ না থাকলেও লেজুড়ের অভাব হয় না।

 

উপসংহার

প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক জীবনের জন্য মানুষ মাঝেমধ্যে অপকারী হলেও অন্য সব দিকে মানুষ অনেক উপকারী একটা প্রাণী। তাই বিলুপ্তপ্রায় ও প্রায় অদৃশ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বাদ দিয়ে মানুষকেই জাতীয় পশু ঘোষণা দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

 


মন্তব্য