kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পশুর হাটে আজব পশু

আদিত্য রহিম   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পশুর হাটে আজব পশু

আঁকা : মাসুম

আবুল আলী কোরবানির পশু কেনার জন্য গাবতলীর হাটে গিয়ে দেখেন, সব পশু কথা বলা শিখে গেছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ভালোই হলো।

এবার কেনার সময় পশুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই কেনা যাবে। প্রথমে এগিয়ে গেলেন এক মোটাতাজা গরুর দিকে।

আবুল : কী রে গরু, কেমন আছিস?

গরু : তুই-তুকারি করেন কেন আংকল, গরু বলে আমাদের কি কোনো মানসম্মান নাই?

আবুল : সরি, ভুল হয়ে গেছে। কথা বলা শেখার পর তোদের মানসম্মান যে একটু বেড়েছে, তা স্বীকার করতেই হয়। আচ্ছা, এবার আপনি করে বলছি...গরু সাহেব কেমন অছেন?

গরু : এই তো লাইনে এসেছেন। আমি খুব একটা ভালো নেই।

আবুল : তাই নাকি? ভালো নেই কেন, কোবরানির টেনশনে?

গরু : আসলে সে জন্য না। কয়েক মাস ধরে আমার শরীরটা মোটেই ভালো যাচ্ছে না।

আবুল : অবাক কাণ্ড! আপনি এত স্বাস্থ্যবান অথচ বলছেন শরীর ভালো নেই। ঘটনাটা বুঝতে পারলাম না।

গরু : বেশি মোটা হলেই যে তার স্বাস্থ্য ভালো হবে এমন ধারণা ঠিক না। এই যে আমার এত স্বাস্থ্য দেখছেন, এগুলো কৃত্রিমভাবে করা। গত চার-পাঁচ মাস ধরে আমার শরীর ফোলানোর জন্য মালিক আমার গায়ে অনবরত নানা প্রকার হরমোন ইনজেকশন দিয়েছেন।

আবুল : তাই নাকি?

গরু : তাহলে আর বলছি কী। সেই হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই সারা দিন শরীরটা শুধু মেজমেজ করে। কিচ্ছু ভালো লাগে না।

আবুল : খাইছে আমারে। তাহলে আপনার এই ইনজেকশন দেওয়া গোশত খেলে আমার অবস্থা কী হবে কে জানে?

অগত্যা আবুল আলী সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে এলেন। তিনি এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, একটা মোটা গরু কেনার বদলে দুটি শুকনো গরু কিনলেই চলবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি একটি শুকনো গরু দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলেন।

আবুল : গরু সাহেব, কেমন আছেন?

গরু : আপনে আন্ধা নাকি খালুজান?

আবুল : এমন প্রশ্ন করলেন কেন?

গরু : করব না! আপনে তো আমারে খেয়াল কইরাই দেখেন নাই। দেখলে বুঝতেন আমি গরু না, ষাঁড়।

আবুল : ও, সরি সরি! আমি আসলেই খেয়াল করে দেখিনি। তা আপনাকে বেশ শুকনো দেখাচ্ছে। নিশ্চয়ই আপনার মালিক আপনাকে ফোলানোর জন্য কোনো হরমোন ইনজেকশন দেয়নি?

গরু : কী সব উল্টাপুল্টা বলেন খালুজান। আমার মালিক বাঁইচা থাকলে না আমারে হরমোন দিব।

আবুল : মালিক বেঁচে নেই? কী হইছিল ওনার?

গরু : তার কিছু হয় নাই। হইছিল আমাগো খোঁয়াড়ের গরুগুলার।

আবুল : আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।

গরু : আচ্ছা, সব বুঝাইয়া বলতাছি। আমার মালিকের মোট গরু ছিল ১০টা। আর আমি একাই ষাঁড়। সব মিলিয়ে মোট ১১ জন। কী আরামে ছিলাম বুঝতেই পারতাছেন। কিন্তু একদিন আমাগো খোঁয়াড়ের সব গরুগুলারে অ্যানথ্রাক্স আক্রমণ করল। একে একে আমার চোখের সামনে আমার সব প্রেমিকারা তাদের জীবন দিল। সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে আমি সহ্য করতে পারলেও আমার মালিক পারলেন না। শেষ গরুটা মরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হার্ট অ্যাটাক করলেন।

আবুল : হাউ প্যাথেটিক। তবে একটা ব্যাপার বুঝলাম না। আপনার মালিক না থাকলে আপনাকে গাবতলীর হাটে আনল কে?

গরু : আমাকে কেউ নিয়ে আসে নাই খালুজান। আমি একাই এখানে আসছি।

আবুল : তার মানে?

গরু : আমার দশ-দশটা প্রেমিকার একটাও বেঁচে নাই। তাই ভাবলাম এই জীবন রেখে আর লাভ কী। আত্মহত্যা করার জন্য গাবতলী চলে এলাম।

আবুল আলী সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। আস্তে সেখান থেকে কেটে পড়ে মনে মনে বললেন, ‘অ্যানথ্রাক্স এলাকার গরু। এটা খেলে কী থেকে কী হয় কে জানে। তার চেয়ে না কেনাই ভালো। ’ এবার তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, টাকা বেশি লাগে লাগুক, একটা উটই কিনে ফেলবেন। উট মোটাতাজা করার জন্য কেউ হরমোন দেয় না, আবার এটাতে অ্যানথ্রাক্সের ভয়ও নেই। অতঃপর রওনা দিলেন উট মার্কেটের দিকে। একটু পরেই তিনি উটের মার্কেটে চলে এলেন। এদিক-ওদিক চোখ রাখতেই একটা উট তাঁর পছন্দ হয়ে গেল। আবুল ভাবলেন, ‘আরব দেশের প্রাণী উট। এরা বাংলা বোঝে কি না কে জানে। ’ তিনি আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজীতে শুরু করলেন, ‘হাউ আর ইউ?’

উট : আপ কি বলতাছেন হাম কুছ নেহি বুঝতা হ্যায়।

আবুল আলী উটের মুখে সেমি বাংলা সেমি হিন্দি শুনে কিছুটা অবাক হয়ে মনে মনে ভাবলেন, আরে এটা দেখি হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলে। তিনি উটকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আরব দেশীয় উট ভেবে ইন্টারন্যাশনাল ভাষাতে কথা শুরু করেছিলাম। এখন দেখি আপনি হিন্দি মেশানো বাংলাতে কথা বলেন। তা আপনার কান্ট্রি কই?’

উট : আমার কান্ট্রি বাংলাদেশ।

আবুল অবাক হয়ে বললেন, ‘উট বাংলাদেশি হয় নাকি?’

উট বললেন, ‘আসলে আগে বাংলাদেশে উট নেহি হোতা থা। কিন্তু এখন বাংলাদেশে উটের ফার্ম হ্যায়। উধার উটের লালন-পালন হোতা হ্যায়। তেমনি এক ফার্মে আমার জন্ম। তাই বললাম, হাম জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। ’

আবুল : তাহলে খাঁটি বাংলায় না বলে সাম বাংলা কিছু হিন্দিতে বলছেন কেন?

উট : ফার্মে থাকতে টিভিতে ভারতীয় সিরিয়াল দেখনেকে বাদ আমার ভাষার এই অবস্থা।

আবুল আলী এবার কিছুটা হতাশ হয়ে উটের বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘বাড়িতে নেওয়ার পর উট যদি এভাবে কথা বলে, তাহলে তো আর ইজ্জত থাকবে না। তার চেয়ে ঝামেলা না করে একটি খাসি নিয়ে যাই। যে যা বলুক, এবার খাসিই কোরবানি দেব। ’


মন্তব্য