kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ম্যা ম্যা

মো. সাখাওয়াত হোসেন   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ম্যা ম্যা

আঁকা : মানব

আমার বন্ধুরা সব দার্শনিক। ফেসবুকে এলেই সেটা টের পাওয়া যায়।

এই যেমন কয়েক দিন আগে একজন স্টেটাস দিল, ‘আমরা সবাই আসলে সোনা দিয়ে মোড়া প্রাণী। প্রত্যেকেই একেকটা গোল্ডফিশ। স্মৃতি বেশিক্ষণ টিকে থাকে না। ’

কী স্টেটাস! গেইলের ছক্কার মতো পুরাই মাথার ওপর দিয়ে গেল। অ্যারিস্টটল বেঁচে থাকলে আমার বন্ধুদের সঙ্গে নুরুল হকের দোকানে বসে মালাই চা খেত।

বন্ধুর কথা ফেলি ক্যামনে। ফেসবুকে গেলেই বোঝা যায় কথার সত্যতা। যে যখন যেটা পাচ্ছে, সেটা নিয়েই স্টেটাস দিচ্ছে। দুই দিন আগের কথা ভুলতে দুই মিনিট লাগছে না। এই যেমন এত দিন ছিল রামপাল, এরপর এলো ঝড়ের বেগে উসাইন বোল্ট, এরপর কোর্টনি ওয়ালশ চলে এলো, এরপর এলো গরু আর ছাগল। ইয়েস, ইট ইজ কোরবানির ঈদ। কোপা সামসুরে খবর দেওয়ার সময়। ফেসবুকে সব বন্ধু গরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ ছাগল।

আমি কাণ্ডকারখানাগুলো দেখছিলাম আমার স্মার্ট ফোনে, বাসে বসে বসে। ঠিক ধরেছেন—যুদ্ধে যাচ্ছি, ‘এখন যৌবন যার, বাড়ি ফেরার তার শ্রেষ্ঠ সময়। ’

বাসের টিকিট যখন করতে গেলাম, তখন ভাবছিলাম, পাঁচশত আশি টাকার টিকিট ছয় শ নিবে। ঈদের মৌসুম, বিশ টাকা বাড়তি দেওয়াটা নিয়ম। গিয়ে দেখি পাঁচ শ পঞ্চাশ টাকায় দিচ্ছে। ব্যাপার কী? পঞ্চাশ টাকা কম কেন! প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল। ভালো কিছু হলেই আজকাল ভয় লাগে। কম টাকায় কিছু কেউ দিতে গেলে সন্দেহ হয়, জিনিসটা দুই নম্বর নাকি?

কেউ যদি বলে, ‘আসেন ভাই, আমি গিয়ে ঠিকানা চিনিয়ে দিচ্ছি। ’ তখনই কলিজা কেঁপে ওঠে। গলির চিপায় নিয়ে চিপায় চাপায় যা আছে সব বের করে নিয়ে যাবে না তো?

‘কম রাখছেন কেন?’ জিজ্ঞাসা করায় টিকিট কাউন্টারের লোক বলেছিল, ‘সব সময় বেশি রাখব কেন? আমরা কি মানুষ না?’

এরা যে মানুষ না জানোয়ার, সেটা টের পেলাম বাসে উঠে। লোকাল একটা বাস। সিট দেখে কাউ শিটের কথা মনে পড়ে গেল। ছোট ছোট সিট। পা লম্বা করে বসার অবস্থা নেই। পাশে যে চাচা বসলেন, উনি টিকিট করছেন পাঁচশত টাকা দিয়ে। আমি পঞ্চাশ টাকা বেশি দিয়েছি শুনে পান খাওয়া লাল দাঁত দেখিয়ে টা টা করে হাসতে লাগলেন।

সকাল দশটার বাস। রাত দশটায় ছাড়ার কথা ছিল। ড্রাইভার সাহেবের দয়ার শরীর। দুপুর বারোটায় ছেড়ে দিল। বাস উড়ে চলছে আর নিজেকে মুড়ির মতো লাগছে। মুড়ির টিনের মধ্যে বসে আছি। চাচা বলল, ‘বাইজান কি বাড়িত যান?’

‘জি। ’

‘গরু না ছাগল?’

‘গরু। আপনিও কি গরু?’

চাচা আবার লাল দাঁত দেখাল। বলল, ‘না, আমি ছাগল। ’

তখনই পেছনের সিট থেকে ছাগলের ম্যা শোনা গেল। তাকাতেই দেখলাম, এক লোক মোবাইল বের করে হ্যালো বলল।

রিংটোন! ছাগলের ডাক!! চমৎকার!!!

‘দ্যাশের অবস্থা দেখছেননি? ছাগলের ডাক মোবাইলে হান্দাইছে। ’

আমিও প্লে স্টোরে গিয়ে নামিয়ে নিলাম। একটু পর আমারও কল আসল ছাগলের ডাকে। চাচা মিয়া চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালেন। বাসের ইয়াং কিছু পোলাপাইন ছিল। একটু পর দেখি সবার একই অবস্থা। সবার মোবাইল ‘ম্যা ম্যা’ করছে। পুরা বাস বিশাল ছাগলের হাট হয়ে উঠল। বাসের ড্রাইভার চেঁচিয়ে বলল, ‘আপনেরা কী শুরু করলেন?’’

পেছন থেকে এক ছেলে চেঁচিয়ে বলল, ‘কোথাও না থামাই সোজা বাস চালান। নইলে গরুর ডাকও শুনবেন। ’

আমি হেসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বাস ব্রিজে উঠল। ব্রিজের সামনে দেখি লেখা, ‘সেতুতে গবাদি পশু চলাচল নিষেধ!’

একটু পর দেখি এক স্থানীয় নেতা সেতু দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। কেউ নিয়ম মানছে না। অদ্ভুত!

এদিকে বাসে থেমে থেমে ছাগলের ডাক শোনা যাচ্ছে। রবি ঠাকুরের কথা মনে পড়ে গেল। এই অবস্থা দেখলে লিখতেন, ‘বাসে ওঠে থেকে থেকে ছাগলের হাঁক। ’

হঠাৎ বাসের ব্রেক হলো। তাকিয়ে দেখি, তিন-চারজন পুলিশ উঠেছে। একটু আগে কোথায় নাকি একটা ছাগল চুরি হয়েছে। হেল্পার বলল, ‘আরে বাসে ছাগল কোথা থেকে আসবে স্যার?’ এর মধ্যে কারো মোবাইলে কল এলো। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ডেকে উঠেছে। কারো কল এসেছে নিশ্চয়ই। আমার হাসি পেলেও হাসি গিলে ফেললাম। শাস্ত্রে আছে, ‘পুলিশ আর রাগান্বিত বউয়ের সামনে হাসতে নেই। ’

পুলিশ ছাগলের ডাক শুনে বাসে চেকিং শুরু করল। আমরা নিশ্চিন্ত মনে বসে আছি। ছাগলের ডাক আছে, ছাগল তো আর নেই। পেছনে এক লোকের বস্তা থেকে বের হয়ে এলো জ্যান্ত ছাগল! আমরা সবাই অবাক। ছাগল চোরের পাশের লোককে পুলিশ জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি জানতেন না ওর বস্তায় ছাগল আছে?’

‘আমি ভাবছি, বস্তার মধ্যে ওনার মোবাইলে কল আসছে। ’ সরল স্বীকারোক্তি।

আমি আবারও হাসি গিলে ফেললাম। দুইটা হাসি পেটের ভেতর, পেট কেমন গুরগুর করছে।

‘বস্তার মইধ্যে ছাগল শ্বাস লইছে ক্যামনে?’ পাশের চাচা আমাকে জিজ্ঞাসা করল।

চাচার প্রশ্নটা ফেসবুকে দিয়ে দিলাম।

এক বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে কমেন্ট করল, ‘তুই বস্তার মধ্যে ঢুকলি ক্যান?’

সেই কমেন্টে সঙ্গে সঙ্গে সাতটা লাইক পড়ল।

 


মন্তব্য