kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সুরত আলীর ছাগল

মো. সাখাওয়াত হোসেন

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুরত আলীর ছাগল

এলাকায় বিচার বসবে। সুরত আলী বিচার ডাকছে। তার ছাগলের জন্য। এটা হচ্ছে ঘটনা। কিন্তু এর পেছনের ঘটনা হলো, তাসকিন-সানির নিষেধাজ্ঞা। পাঠক ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে? আমি পঙ্খিরাজ ঘোড়ার ব্যাপারি ছাগল নিয়ে কেন কথা বলছি? আসুন একটু ব্যাকফুটে গিয়ে খেলি।

তাসকিন সানির নিষেধাজ্ঞার পরের কথা। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এলাকায়ও এর প্রভাব পড়ল। আমরা সবাই মিলে গেলাম এলাকার ক্লাব সভাপতি কেল্টু ভাইয়ের কাছে। এই ক্লাবের সব কাজে যে আমার এত আগ্রহ এর কারণ হলো বিউটি। সেও আমাদের ক্লাবের মেম্বার। তার ওপর ক্রাশ খেয়েই এই ক্লাবে ঢোকা। ক্লাবে জড়ো হয়ে সবাই একসঙ্গে চেঁচামেচি করা শুরু করল। কারো কথা কেউ বুঝছে না। দেখে আমার ভারতের সমর্থকদের কথা মনে পড়ে গেল। কেল্টু ভাই সবাইকে হাত নেড়ে থামালেন। আমরা আসলে কী চাই জিজ্ঞেস করলেন।

‘আমরা একটা ফাটাফাটি মানববন্ধন করব। ’ রাজু বলল।

‘এইটা ভারতের চাল। এই দেখেন এই ছবিটা। ’ সাইদ তার স্মার্ট ফোন বের করল। ছেলে নতুন মোবাইল কিনছে, কথায় কথায় আলাদিনের চেরাগের মতো ফস করে সেটা বের করে ফেলে।

আমরা সবাই ছবিটা দেখলাম। তাসকিনের হাতে ভারতের অধিনায়ক, বর্তমান ক্রিকেটের সবচেয়ে চালাক উইকেটকিপার মহেন্দ্র সিং ধোনির কল্লা শোভা পাচ্ছে।

‘এটাই তাহলে কারণ!’ কেল্টু ভাই গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল।

ছবি দেখে ফায়ার হয়ে গেল বিউটি। ‘এক কাজ করেন, ধোনির বউয়ের মাথাটা কেটে কেউ তাসকিনের বউয়ের হাতে লাগিয়ে একটা ছবি দিয়ে দেন। ’

‘তাসকিনের বউ?’ সবাই অবাক।

‘আমি আর কি। ভবিষ্যতে হতে পারি। ’ বিউটি লজ্জায় লাল।

আমি ক্লাবের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

‘হবে হবে, সব হবে। ’ এটা বলে কেল্টু ভাই আমাদের কী কী করতে হবে তা নিয়ে এক বিশাল বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাঁর গলা ভেঙে গেল। এটা তাঁর পুরনো রোগ। কথা বলতে গেলে তখন খালি চিঁ চিঁ আওয়াজ হয়।

আমরা তাঁকে ধরাধরি করে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি এক অদ্ভুত কেইস। দুই বান্ধবী ঘাড় বাঁকা করে বসে আছে। সোজা করতে পারছে না।

‘কী হয়েছে এদের?’ এক নার্সকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।

‘এদের একজন ঘাড় বাঁকা করে সেলফি তুলতে গিয়ে, ঘাড় লক করে ফেলেছে!’

‘আর অন্যজন?’

‘বান্ধবী কিভাবে সেলফি তুলছিল, সেটা ডাক্তার সাহেবকে দেখাতে গিয়েছিল!’

‘পবিত্র গাভি!’ বিড়বিড় করলাম আমি। ডাক্তার এসে কেল্টু ভাইকে রেখে আমাদের সবাইকে বের করে দিল।

বারান্দায় আমি আর বিউটি।

‘বিউটি, আমি কিন্তু তাসকিনের মতো বল করতে পারি। এই কয়েক দিন আগে যে পেসার হান্ট হলো, ওখানে গিয়েছিলাম। ’

‘তাই নাকি?’ আগ্রহ দেখাল বিউটি।

‘আমার সব কিছুই তাসকিনের মতো হয়। খালি ওর মতো লম্বা না আর ওই স্পিডে বল ছুড়তে পারি না। এই দুইটা ছাড়া বাকি সব তাসকিনের মতো। ’

বিউটির মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।

‘আমি তোমাকে এলাকায় গিয়ে বল ছুড়ে দেখাব। তখন বুঝবে। ’ বিউটিকে কথা দিলাম।

সেদিনই বিকেলে মানববন্ধনের পর বল না পেয়ে একটা পাথর ছুড়ে বিউটিকে দেখালাম। একটু বেশিই জোরে ছুড়েছিলাম। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই পাথর গিয়ে লাগল রাজুর দাদার মাথায়। উনি তখন এলাকার পার্কে বসে বাদাম খাচ্ছিলেন।

‘তুমি কাউকে বলিয়ো না বিউটি প্লিজ। ’

এই বলে আমি দৌড়ে গেলাম। সবাই মিলে আবার হাসপাতালে। ডাক্তাররা রাজুর দাদার অবস্থা খারাপ দেখে তাকে ভর্তি করিয়ে নিল। সেদিন রাতে আমরা সবাই মিলে হাসপাতালের বারান্দায়। মধ্যরাত, সবার ঘুম ঘুম চোখ। হঠাৎই সবার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করল। এত রাতে বিরিয়ানি কোথায় পাব?

আশিক বলল, ‘চল এক কাজ করি। গতবার যেভাবে চেয়ারম্যানের মুরগি চুরি করে বিরিয়ানি করেছিলাম এবারও তাই করি। কেল্টু ভাই, কী বলো?’

‘মন্দ হয় না। ক্ষুধাও লেগেছে। ’

‘আমার দাদা হাসপাতালে আর তোরা মুরগির বিরিয়ানি করবি?’

রাজুর কথায় আমরা লজ্জা পেয়ে গেলাম।

‘কাচ্চি বিরিয়ানি কর!’ আসল কথা ছাড়ল রাজু।

সেদিন রাতেই সুরত আলীর ছাগল চলে গেল আমাদের পেটে। পরদিন সুরত আলী বিচার ডাকল। বিকেলে আমরা সবাই তার ছাগল চুরির বিচার চেয়ে মানববন্ধন করলাম। এলাকার চেয়ারম্যান তিন সদস্যের একটা তদন্ত কমিটি করে দিলেন। যে কমিটির প্রধান কেল্টু ভাই। আশিক আর আমি সদস্য। জোরদার তদন্ত চলছে। ছাগল চোর ধরা পড়া সময়ের ব্যাপার।


মন্তব্য