kalerkantho

এক হালি চোর

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এক হালি চোর

স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে ডেকে পাঠানো হলো তাঁর সহকারী হরিপদ বাবুকে।

‘স্যার ডেকেছেন?’

‘হ্যাঁ। ক্লাস সিক্সের ছাত্ররা যে খেলতে যাচ্ছে, তাদের একটা করে আইডি কার্ড করিয়ে নিতে হবে। ক্লাসে গিয়ে ঘোষণা করে দাও, সব ছাত্র যেন আগামীকাল ৫০ টাকা করে নিয়ে আসে। ’

‘ঠিক আছে স্যার। ’

সিক্সের ক্লাস টিচার রমাকান্ত কামারকে গিয়ে হরিপদ বলল, ‘আপনার ক্লাস যে আগামী মাসে একটা আন্তবিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যাচ্ছে, এর জন্য একটা করে আইডি কার্ড করিয়ে নিতে হবে। প্রিন্সিপাল বাবু বলেছেন, আগামীকাল সব ছাত্রকে ৬০ টাকা করে নিয়ে আসতে। টাকাগুলো আমার হাতে দেবেন, আমি এন্ট্রি করিয়ে নেব। ’

রমাকান্ত কামার ক্লাসে গিয়ে সব ছাত্রকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আগামীকাল সবাই ৭০ টাকা করে নিয়ে আসবি। তোদের আইডি কার্ডের জন্য। ’

সেই ক্লাসের এক ছাত্র পল্টু বাসায় গিয়ে তার মাকে বলল, ‘মা, আমাদের নাকি আইডি কার্ড দেবে। কাল সবাইকে ৮০ টাকা করে নিতে বলেছে। ’

‘৮০ টাকা!’ খেঁকিয়ে উঠলেন পল্টুর মা। ‘মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি? একটা আইডি কার্ডের জন্য ৮০ টাকা!’

রাতে পল্টুর বাবা এলে পল্টুর মা বললেন, ‘শোনো, তোমার ছেলের কাল নাকি কী একটা আইডি কার্ড বানাতে হবে। ১০০ টাকা লাগবে বলেছে। ’

মানিব্যাগ থেকে ১০০ টাকা বের করে দিতে দিতে পল্টুর বাবা ভাবলেন, সামান্য একটা আইডি কার্ড ১০০ টাকা! কী অবস্থা দেশের!

 

মহব্বত আলী বিশাল এক কম্পানির মালিক। তাঁর শরীরও বিশাল। বিশাল বপু নিয়ে একটা ব্যাংকে বসে আছেন তিনি। তিনজন কর্মকর্তা তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মহব্বত আলীর দিকে।

‘কেন ১০ লাখ টাকা লোন চাইছেন?’ এক কর্মকর্তা প্রশ্ন করলেন।

‘আমার কম্পানি সম্পর্কে তো আপনারা জানেন। বিখ্যাত একটা কম্পানি। ঢাকা শহরে পণ্য পৌঁছে দিতে আমার কম্পানির ১০টা ছোট লরি আছে। এখন এই ১০টা লরি দেখাশোনা, পেট্রল, ড্রাইভার খরচ অনেক হয়ে যাচ্ছে। তাই আমি চাইছি পাঁচটা লরি সরিয়ে একটা বড় লরি কিনতে। এতে আমি কম মূল্যে পণ্য দিতে পারব। ’

‘চমত্কার!’ এক কর্মকর্তা বললেন, যার নাম কারিগর তারিক। ‘তো বাকি পাঁচটা লরিও রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে একসঙ্গে দুইটা বড় লরি নামিয়ে দিন। ’

‘ইয়ে, তাহলে তো ২০ লাখ টাকা লাগবে। ’ হাসিতে মুক্তো ঝরে পড়ছে মহব্বত আলীর।

‘ব্যাংক টাকাটার অনুমোদন দিল। কী বলেন আপনারা?’ কারিগর সাহেব বললেন।

বাকিরা খানিক সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একমত হলেন। হ্যাঁ, মহব্বত আলীকে ২০ লাখ টাকা লোন দেওয়া যায়।

সেই ২০ লাখ টাকা লোন চমত্কারভাবে ভাগ হলো। পাঁচ লাখ দেওয়া হলো কারিগর সাহেবকে তার কারিকুরি দেখানোর জন্য। কারিগর সাহেব তিন লাখ রেখে, বাকি দুই লাখ দুই কর্মকর্তাকে ভাগ করে দিল তাঁদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য।

আর মহব্বত আলী? দুইটা না। তিনি একটা গাড়ি কিনেছেন। লাক্সারিয়াস পাজেরো। সমাজে মানসম্মান বাড়ানোর জন্য লোনের ব্যবস্থা থাকলে এত কাহিনী করতে হতো না। নিজের পাজেরো গাড়িতে বসে ভাবছেন তিনি।

‘ড্রাইভার এসিটা বাড়িয়ে দাও। ’

মহব্বত আলীর বিশাল শরীরে কিলবিল করতে থাকা চর্বি ঠাণ্ডা করতে গিয়ে কাহিল হয়ে যাচ্ছে এসি মহাশয়।

 

‘কী বলেন স্যার, সমর্থকরা টিকিট পাবে না? They are the real champion of our team.’

‘ভুলভাল ইংরেজি বলছ কেন?’ পিএসকে ধমক দিলেন কেরামত সাহেব। ‘টিকিটের টিকিও ওরা পাবে না। ’

‘আমজনতা টিকিট না পেলে চেঁচামেচি করবে কে?’ পিএস আবার বাগড়া দিল।

‘কোনো আমজনতা টিকিট পাবে না। এবার টিকিট পাবে কাঁঠালজনতা। সব হোমরাচোমরা ব্যক্তি। ’

‘স্যার, গলা ফাটিয়ে সমর্থন না দিলে কি টিম মাঠে ভালো খেলবে?’

‘দুদিন পর যে হনুলুলু যাবে টুর্নামেন্ট খেলতে, ওখানে কে গলা ফাটাবে? এখন থেকেই প্র্যাকটিস হোক। আর যারা যাবে তারা কি গলা ফাটাতে পারে না?’

‘পারে স্যার। তবে ইয়ে, গতবার একজনের গলার রগ ছিঁড়ে গিয়েছিল, এ জন্যই...। ’

‘আরে, বোঝো না, নরম গলা। দুধ-মাখন খাওয়া গলা। টয়লেটে বসে গুনগুন করে গান গাওয়া গলা। তাই আর কি। ’

‘স্যার, আমার ছেলে একটা টিকিট পাবে?’

‘অবশ্যই পাবে। তুমি আমার পিএস। তুমিও হোমরাচোমরাদের দলে। ’ রুম ফাটিয়ে হাসতে থাকল কেরামত আলী।

 

লোকটা জুতা চোর। এই একটু আগে ধরা পড়েছে। পাবলিক মেরে লোকটার বাবার নাম ভুলিয়ে দিয়েছে। দাদার নাম ভোলাতে সেই ভিড়ে যোগ দিল আরো তিনজন। একজন একটা স্কুলের প্রিন্সিপালের সহকারী, আরেকজন একজন বিখ্যাত কম্পানির মালিক। যদিও তিনি এই রোদে পাজেরো থেকে বের হননি। তাঁর ড্রাইভারকে পাঠিয়েছেন, অনিয়ম তাঁর সহ্য হয় না। আরেকজন বিখ্যাত কর্মকর্তার পিএসও এসেছে। তার ছেলে খেলার টিকিট পাচ্ছে, সে-ও এখন হোমরাচোমরাদের দলে। একজন হোমরাচোমরা হয়ে অপরাধ কিভাবে সহ্য করতে পারে। ভিড়ে ঢুকে চোরটিকে ইচ্ছামতো দিল সবাই মিলে।

হালার চোর!


মন্তব্য