kalerkantho

গলা সমান ঋণ বিমানের মুনাফার দেখা নেই

মাসুদ রুমী   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গলা সমান ঋণ বিমানের মুনাফার দেখা নেই

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টি রীতিমতো কুখ্যাত। ২০০৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিমানসেবা হিসেবে বিমানের নাম উল্লেখ করা হয়। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিমান সংস্থার প্রতিটি ফ্লাইট গড়ে তিন ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছে বলে জানায় টাইম। ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিমানের ‘ফ্লাইট ডিলে’ বদনাম আজও ঘোচেনি।

একের পর এক কারিগরি ত্রুটিসহ নানা কারণে অভ্যন্তরীণ রুটেও মাঝেমধ্যে ফ্লাইট দেরি বা বাতিল হচ্ছে। এসব কারণে বিমানবন্দরে ক্ষুব্ধ যাত্রীদের সঙ্গে বিমান স্টাফদের বাগিবতণ্ডা নিত্যদিনের ঘটনা।

মানসম্মত যাত্রীসেবা ও সঠিক বাণিজ্যিক কৌশলের অভাব, সময়মতো গন্তব্যে যেতে না পারা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, বিমানের ভেতরে বাইরের নানা সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও অবচয়ের কারণে বছরের পর লোকসানের ঘানি টানছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটি। ঋণের ভারে জর্জরিত বিমানের পরিচালনার ঝুঁকির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

এয়ারলাইনসটির ফ্লাইট অপারেশন সূত্র জানায়, গত দেড় মাসে বিমানের বেশির ভাগ ফ্লাইট সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হয়নি। বহরে থাকা তিনটি ড্যাশ-৮ এজিকিউ, এজিডাব্লিউ ও এজিআরে প্রায় সময়ই কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ছে। দ্বিতীয় এজিডাব্লিউ উড়োজাহাজটি প্রায়ই টেকনিক্যাল সমস্যায় পড়ে ফ্লাইট শিডিউলে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। অবশিষ্ট ড্যাশ-৮ এজিআর দিয়ে কোনো রকমে চলছে অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটের ফ্লাইট। যে কারণে মাঝে মাঝেই অন্তত চার-পাঁচটি ফ্লাইট দেরি এমনকি বাতিলও হচ্ছে। বিমানের এ ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।

দুদক বলেছে, বিমানকে ডোবাচ্ছেন এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি ও উড়োজাহাজ কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং হজ মৌসুমে ও অন্যান্য কারণে পুকুরচুরিতে নাকাল হয়ে পড়েছে বিমান। সম্প্রতি দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাত্রীরা অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যাগেজ নিয়ে বিমানে ওঠে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ গ্রহণ করা হলেও তা মূল হিসাবে না দেখিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিমানেও দুর্নীতি হয়, এটা আমরা সবাই জানি। দুদকের উচিত কোথায় কারা দুর্নীতি করছে তাদের চিহ্নিত করা এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচানো।’

গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) বিমান ২০১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লোকসান করেছে বলে সম্প্রতি সংসদকে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে বিমান চার হাজার ৯৩১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আয় করেছে। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ১৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। তবে আগের দুই অর্থবছরে বিমান মুনাফা করে বলে সংসদে জানানো হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয় চার হাজার ৫৫১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় হয় চার হাজার ৫০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই হিসাবে ওই অর্থবছরে ৪৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা লাভ হয়। এর আগের অর্থবছর ২০১৫-১৬ সালে বিমানের লাভ হয় ২৭৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

তবে বিমানের আগের মুনাফার এই হিসাবকে আজগুবি বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মোমেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমানের মুনাফা কাগজে-কলমে দেখানো হলেও বাস্তবে সত্য নয়। বিমানের বকেয়া চার্জ এবং তেলের মূল্য পরিশোধ করলে মুনাফা তো দূরের কথা লোকসান দেখাতে হবে।’ এম এ মোমেন বলেন, ‘আমরা এখন একটি ভালো অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি। এখন আমরা বিমানকে যদি দুর্নীতিমুক্ত করে ভালো যাত্রীসেবা দিতে না পারি তাহলে এই প্রতিষ্ঠান কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

সূত্র জানায়, বিমানের দায়-দেনার হিসাবও অনেক লম্বা। ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ২৯০ কোটি টাকা ঋণ বেড়ে ৪১৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৪ সালে ডিসি-১০ কেনার ঋণের ২২২ কোটি টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। গত ১০ বছরে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বিমান। এখনো ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া আছে। এর মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা বাবদ বিমানের কাছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পাওনা এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাকিতে তেল দেওয়া পদ্মা অয়েল পাবে এক হাজার ৯০ কোটি টাকা। বকেয়া কর, যন্ত্রাংশ আমদানি ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিল বাবদ সরকারের কাছে বিমানের দেনা দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিশাল এই দেনার বোঝা টানতে গিয়ে তীব্র নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে বিমান। এই সংকট কাটাতে লন্ডনের সোনালী ব্যাংক এক্সচেঞ্জ থেকে নতুন করে ২০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান। নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখতে ভাঙতে হচ্ছে এফডিআর।

বিমান সূত্র জানায়, বিমানকে লাভজনক করতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ৪০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কম্পানি করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ৯০০ কর্মী কমানো হয়। আগে ২৯টি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করলেও এখন ফ্লাইট পরিচালনা করছে ১৫টি রুটে। প্রায়ই বাংলাদেশ বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না। এমনকি অনলাইনেও টিকিট পাওয়া যায় না। অথচ বাস্তবে বিমানের আসন খালি যায়। বিমানের কর্মকর্তারা কমিশন নিয়ে এসব কাজ করে থাকেন বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে দুদক।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার হাসান মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরে গেলেও আজীবন স্বামী-স্ত্রী প্রতিবছর ফ্রি টিকিট পান। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ না করলে সাধারণ যাত্রীরা সিট পাবে না। এ ছাড়া বুকিং সিস্টেমের ক্ষেত্রে প্রাইভেট এয়ারলাইনস যে নিয়ম অনুসরণ করে বিমান সেভাবে পরিচালনা করা উচিত। বিমানকে লাভজনক করতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো এবং ক্যাটারিং—এই তিন খাতই যথেষ্ট। কিন্তু প্রচুর আয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা হচ্ছে না দুর্নীতির কারণে।’

টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয় বলে দাবি করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ ইনামুল বারী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পৃথিবীর সব এয়ারলাইনসে নিজস্ব কর্মীদের এ ধরনের (ফ্রি টিকিট) সুবিধা দেওয়া হয়। কিছু আসন খালি যায় যাত্রীদের অসুস্থতা, ভিসা না পাওয়ার কারণে।’ এমন ঘটনা আগে ছিল, কিন্তু এখন নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে বিমানের দুর্নীতি রোধে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের তালিকা, কখন কেনা হয়েছে, কী দামে কেনা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা হয়েছে, কত টাকা মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে—এসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দুর্নীতির পরিমাণ নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছে দুদক। এ ছাড়া বিমানের ট্রানজিট/লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসাব ম্যানুয়ালি সংরক্ষণ না করে সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাইজ করা, কর্মী ও যাত্রীদের মধ্যে বাস্তবে কতজন হোটেল রুমে অবস্থান করে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি মনিটরিং টিমের মাধ্যমে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে দুদক। দুর্নীতি প্রতিরোধ সংস্থাটি বলছে, বিমানকে সর্বতোভাবে ই-টিকিটিং, ই-রিজার্ভেশনে পদ্ধতিতে যাওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া ফলস বুকিং বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এজেন্টদের বুকিং কোটা এবং বুকিং সময় কমিয়ে অনলাইন টিকিটের প্রাপ্যতা বাড়াতে বলেছে দুদক।

 

 

মন্তব্য