kalerkantho

বাস থেকে ফেলে সিকৃবির ছাত্র হত্যা

প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট, সড়ক অবরোধ

সিলেট অফিস   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট, সড়ক অবরোধ

ধাক্কা দিয়ে বাসের চাকার নিচে ফেলে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওয়াসিমকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল সিলেট নগরের চৌহাট্টা পয়েন্ট অবরোধ করে বিক্ষোভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চাকায় পিষে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) শিক্ষার্থী মো. ওয়াসিম আফনান ঘোরী হত্যার প্রতিবাদে এবং দায়ী বাসচালক ও তার হেলপারের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল সিলেটের রাজপথ। সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী গতকাল রবিবার সকালেই রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ মিছিল করে তারা নগরের চৌহাট্টায় সড়ক অবরোধ করে। এ সময় সেখানে আটকা পড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানান। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ শেষে শিক্ষার্থীরা একাধিক দাবি তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

এদিকে ঘাতক বাসচালক ও হেলপারকে গত শনিবার রাতেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত ছাড়াই ওয়াসিমের মরদেহ গতকাল নিজ গ্রামে দাফন করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ওয়াসিমের পরিবার মামলা করবে না বলে জানিয়েছেন নিহতের চাচা মফিজুর রহমান।

গত শনিবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর নামক স্থানে বাসচাপায় প্রাণ হারান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম। তিনি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার রুদ্র গ্রামের মো. আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী ও মীনা পারভীন দম্পতির সন্তান।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সড়কে নেমে আসে। সহপাঠী হত্যার বিচার দাবিতে তারা বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিলসহকারে প্রায় ৪০ মিনিট নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌহাট্টা মোড়ে এসে সড়ক অবরোধ করে।

শিক্ষার্থীরা ওয়াসিম হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত উল্লেখ করে ঘাতক বাসচালক ও হেলপারের ফাঁসি এবং উদার পরিবহনের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানায়। পুলিশের দায়ের করা মামলাকে দুর্ঘটনা নয়, হত্যা মামলায় রূপান্তর করে তিন দিনের মধ্যে মামলার আইনি প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানানো হয়। দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা।

অবরোধ শুরু হলে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এই মোড় দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নগরজুড়ে দেখা দেয় তীব্র যানজট। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের গাড়িবহর শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে চৌহাট্টা এলাকায় আটকা পড়ে। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে তাদের আন্দোলনে সমর্থন জানান।

পরে দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু, সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখসহ পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। দুপুর দেড়টার দিকে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে অবরোধ তুলে নেয় শিক্ষার্থীরা।

বাসচালক ও সহকারীর ফাঁসি চান মা-বাবা

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সন্তান হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে এ ঘটনায় দায়ী বাসচালক ও তার সহকারীর ফাঁসি দাবি করেছেন নিহত ওয়াসিমের মা-বাবা। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে ওয়াসিমের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, একমাত্র ছেলেসন্তানকে হারিয়ে বিলাপ করছেন মা মীনা পারভীন। বলছেন, ‘বাবা মান্না, তরে কালকে বিকেলে ভালা অবস্থায় গাড়িতে তুইলা দিলাম। আর এখন তর লাশ আমার সামনে। কেমনে তরে আমার বুক থেকে নিয়া গেল। আমি এরার ফাঁসি চাই।’

সন্তানের লাশ সামনে বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন নিহত ওয়াসিম আফনান ঘোরীর মা মীনা পারভীন। ওয়াসিমের ডাকনাম মান্না। সন্তান হারিয়ে নির্বাক আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী।

ওয়াসিমের বাবা আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী পল্লী বিদ্যুতের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আর মা মীনা পারভীন পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হিসেবে কর্মরত। ওয়াসিম তাঁদের একমাত্র ছেলেসন্তান। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সন্তানহারা এই মা-বাবা ঘাতক বাসের চালক ও হেলপারের ফাঁসি দাবি করেন।

দাফন সম্পন্ন : গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে ওয়াসিমের লাশ আসে রুদ্র গ্রামে। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক করবস্থানে লাশ দাফন করা হয়। জানাজায় হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ মিলাদ, নবীগঞ্জ-বাহুবল সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পারভেজ আলম চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল, ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম আহমেদ জাবেদ, ওয়াসিমের আত্মীয়স্বজন, সহপাঠীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শরিক হয়।

মৌলভীবাজার সদর থানার ওসি সুহেল আহাম্মদ বলেন, ‘এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তাই পরিবারকে মামলা করতে অনুরোধ করা হবে। পরিবার রাজি না হলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’

নবীগঞ্জে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ : ওয়াসিম হত্যার প্রতিবাদে এবং এ ঘটনায় দায়ী বাসচালক ও সহকারীর ফাঁসির দাবিতে নবীগঞ্জে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। ওয়াসিম যে প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাস করেছিল সেই রাগীব রাবেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুরে প্রতিষ্ঠানের সামনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাস করেছিল ওয়াসিম, সেই দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।

চালক ও সহকারী আটক

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) ও ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ওয়াসিম নিহত হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বাসের চালক ও তার সহকারীকে পুলিশ আটক করেছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের দুটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল সকালে তাদের মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া বাসচালক জুয়েল আহমদ শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া গ্রামের মৃত আজিদ মিয়ার ছেলে। চালকের সহকারী মাসুক মিয়া সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামের দৌলত মিয়ার ছেলে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ সুরমা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নির্মলেন্দু চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার পর উদার পরিবহনের বাসের চালক জুয়েল তার সহকারী মাসুককে নিয়ে পালিয়ে যায়। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে দক্ষিণ সুরমা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার বরকতুল্লাহ খান শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় তাত্ক্ষণিক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘাতক বাসের হেলপার মাসুক আলীকে তার শ্বশুরবাড়ি সিংচাপইড়র গ্রাম থেকে আটক করা হয়।

 

মন্তব্য