kalerkantho

আজ সেই কালরাত ► পাকিস্তানি নৃশংসতার শুরু

তারিখ নয়, গণহত্যার স্বীকৃতি চায় বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তারিখ নয়, গণহত্যার স্বীকৃতি চায় বাংলাদেশ

২৫ মার্চ তারিখকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে নয়, বরং গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতির চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এই চেষ্টাকে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক। জানা গেছে, জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিবছরের ৯ ডিসেম্বর ‘গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ ও গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি বাহিনীর নিধনযজ্ঞ শুরু করার তারিখকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায় বেশ কঠিন হবে—এমন বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ নয় বরং গণহত্যার স্বীকৃতির পক্ষে কাজ করছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন গণহত্যা বিষয়ে আজ সোমবার এক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।

এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং গতকাল রবিবার ঢাকায় ১৯৭১ সালের গণহত্যাবিষয়ক এক সেমিনারে স্পষ্ট বলেছেন, কোনো দেশে নিপীড়নের মাত্রা ‘গণহত্যা’ কি না তা নির্ধারণ করা বা ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জাতিসংঘের কাজ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনাল যেসব ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে বিচার করেছে সেগুলোকেই জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

আর্মেনিয়া গণহত্যার উদাহরণ দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা বলেন, ১৯১৫ সালের ওই গণহত্যাকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি না দিলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশকেও তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে সহযোগিতা করতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘২০১৭ সালের মার্চে সংসদে বিষয়টি আসার পর থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রাধিকারে এটি আছে। গত দুই বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী যেসব দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক করেছেন সেখানে এটি তুলেছেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বলতে অনেকের ধারণা ছিল যে বিষয়টি জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে বিষয়টি তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা ন্যূনতম যেটি চাই সেটি হলো, বিশ্বের যত বেশি সম্ভব রাষ্ট্র এ দেশের গণহতার স্বীকৃতি দেবে এবং এর সঙ্গে সহমর্মিতা জানাবে, গণহত্যার নিন্দা জানাবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, একাত্তরে অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্র যারা ইতিহাসের বিপরীতে ছিল, তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে অকপটে তাদের সেই ভুল স্বীকার করে।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছে তার তথ্য-উপাত্ত তৎকালীন কূটনৈতিক নথি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে তা উল্লেখ করে এ দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো তাদের পার্লামেন্টগুলোতে প্রস্তাব আনতে পারে। তবে নানা কারণে এখনো এমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক বলেছেন, ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্ব সম্প্রদায় গণহত্যা সনদ গ্রহণ করেছিল। ২০১৫ সালে ওই দিনটিকে জাতিসংঘ ‘গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ ও গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ ঘোষণা করেছে। এ থেকে প্রতিফলিত হয়েছে যে গণহত্যার ভয়াবহতা স্বীকার করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা সময় নেয়। তিনি বলেন, যেকোনো গণহত্যা ভুলতে না দেওয়াটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে গণহত্যা নিয়ে বিশ্বে অনেক আলোচনা হয়েছে। গণমাধ্যম, পার্লামেন্টে ও গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গণহত্যার তথ্য জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তবে জাতিসংঘ নিষ্ক্রিয় ছিল। বড় শক্তিগুলো ওই সংকটের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তারা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখছিল। আর এর ফলে বাংলাদেশে গণহত্যা অস্বীকার করা হয়েছে।

মফিদুল হক বলেন, জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাতেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি গণহত্যার বিচারের দাবি ছিল। তিনি বলেন, জাতিসংঘের দলিলে দেখা যায় যে তারাও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত হয়েছিল। সহকারী মহাসচিবকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সহকারী মহাসচিব পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সরকারগুলো গণহত্যাকে অস্বীকার করতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ বিষয়ে নীরব হয়ে পড়ে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং গতকাল ঢাকায় এক সেমিনারে বলেন, ‘আমার এই উপস্থিতির অর্থ বাংলাদেশে গণহত্যার বা ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। কারণ এমন স্বীকৃতি দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। আমার এখতিয়ার হলো সামনের দিকে দেখা।’ তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের কাছে স্বীকৃত গণহত্যা হলো সেগুলোই যেগুলো আদালতের মাধ্যমে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে; যেমন—রুয়ান্ডা, স্রেব্রেনিচার গণহত্যা। গত সপ্তাহে আপিলে কারাদিচের কারাদণ্ডের মেয়াদ ৪০ বছর থেকে বাড়িয়ে আজীবন করা হয়েছে এবং তিনি যে স্রেব্রেনিচায় গণহত্যা করেছেন তা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাকে স্পষ্ট বলতে হবে যে আমার এমন স্বীকৃতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই।’

একাত্তরের গণহত্যা বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ওই গণহত্যা ছিল বিশ্বের ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর অন্যতম। ১৯৪৮ সালের গণহত্যাবিষয়ক কনভেশনে যেসব অপরাধকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তার সবগুলোই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রকাশনায় ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের টেলিগ্রাম, সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনসহ অসংখ্য দলিল রয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার দুই দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ গণহত্যার খবর পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। আর্চার ব্লাডের পাঠানো সেই তারবার্তার বিষয়বস্তু ছিল ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ (বেছে বেছে গণহত্যা)। এরপর আরো অন্তত ১৩টি বার্তায় পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে।

ওই প্রকাশনায় ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনীর তিন স্তরের গণহত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অপারেশন সার্চলাইট চলেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত। মে মাসেই আবার শুরু হয়েছিল ‘সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’ (অনুসন্ধান ও ধ্বংস) মিশন। এটি চলেছিল অক্টোবর পর্যন্ত। ডিসেম্বর মাসে পরাজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী ‘স্কর্চড আর্থ’ নামে জ্বালিয়ে দেওয়ার মিশন চালিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে প্রায় চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। পরে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার নারীর গর্ভপাত ঘটাতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের এক কোটি বাঙালি ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এ দেশে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল তিন থেকে চার কোটি বাঙালি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনী ‘হিট লিস্ট’ ধরে প্রায় এক হাজার বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীকে হত্যা করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা গণহত্যায় অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য বিশ্বের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর এ দেশে গণহত্যা তথা ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যার কথা স্বীকার করে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া দূরের কথা বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দিতে চায়নি অনেক দেশ। ওই দেশগুলোই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এ দেশে গণহত্যার ইতিহাস আড়াল করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।

মন্তব্য