kalerkantho

রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থান অপরিবর্তিত

মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির বিপক্ষে প্রতিবেশীরা

মেহেদী হাসান   

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির বিপক্ষে প্রতিবেশীরা

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাইলেও মিয়ানমারের ওপর বাইরের চাপ সৃষ্টির পক্ষে নয় প্রতিবেশীরা। গত শুক্রবার রাতে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে ‘মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে তাদের ওই অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আনা ওই প্রস্তাবটি ৩৭-৩ ভোটে গৃহীত হয়। প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া তিনটি দেশের মধ্যে চীন ও মিয়ানমারের আসিয়ান-শরিক ফিলিপাইন রয়েছে। এ ছাড়া ভারত, জাপান, নেপালসহ সাতটি দেশ প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

মানবাধিকার পরিষদের ওই ভোটের ফলাফল প্রসঙ্গে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি প্রশ্নে বৈশ্বিক অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অন্তত গত শুক্রবারের ভোটের হিসাবে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করতে চেয়েছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে কার্যকর ফল না আসায় বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে গেছে। তা ছাড়া ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে ‘নিধনযজ্ঞ’ শুরুর পর থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ায় এ সংকট নতুন করে বিশ্বসম্প্রদায়ের নজর কেড়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মানবাধিকার ইস্যুতে সরব পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে ইইউ রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এ সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসংক্রান্ত প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে। ভারত, চীন, জাপান ও রাশিয়ার মতো বন্ধু এবং এ অঞ্চলের প্রতিবেশীদের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ আরো কার্যকর পদক্ষেপ চাইলেও ততটা সাড়া পায়নি।

প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া চীন স্পষ্ট বলেছে, মিয়ানমার সরকার এযাবৎ যেসব অগ্রগতি সাধন করেছে সেগুলোর স্বীকৃতি প্রয়োজন। জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদে গত শুক্রবার রাতে চীনের প্রতিনিধি বলেন, ‘মিয়ানমারে যা প্রয়োজন তার স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে ওই প্রস্তাব ব্যর্থ হয়েছে।’

চীনের প্রতিনিধি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কার্যত বাইরের উদ্যোগগুলোর বিরোধিতা করেছেন।

ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ প্রসঙ্গে নয়াদিল্লির একজন কূটনীতিক গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত নেমিং, শেমিংয়ে বিশ্বাস করে না। তাই কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের বিষয়ে আনা প্রস্তাবকেও সমর্থন করে না। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিশেষ সম্পর্কের আলোকে ভারত মানবাধিকার পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারবিষয়ক প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।’

তিনি বলেন, ‘ভারত ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, অনুপস্থিত থাকেনি। ভারত ভোটাভুটির সময় উপস্থিত থেকেছে এবং তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।’

জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ভারতও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে তাদের বসতভূমিতে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই ভারত এ সংকটের সমাধান দেখছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এমনকি রোহিঙ্গারা ফিরে গিয়ে যেন রাখাইনে থাকতে পারে সে জন্য বাড়িও নির্মাণ করছে ভারত। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য ভারত এযাবৎ বেশ কয়েক দফা মানবিক সহায়তা দিয়েছে।

এদিকে জাপানও মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অন্য দেশগুলোর উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার, দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে জাপানের। দেশটি রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি।

অন্যদিকে আসিয়ান অঞ্চলের দেশ ফিলিপাইন মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আসিয়ান অঞ্চল থেকে চাপ সৃষ্টির যে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল তাও এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয়নি। জানা গেছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আসিয়ানের অন্য সদস্যরা উদ্বিগ্ন। তবে তারাও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে বরং সম্পৃক্ত থেকে সংকট সমাধানে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে।

ঢাকার কূটনীতিকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমার এ পর্যন্ত যতটা নমনীয় হয়েছে তা চীন, ভারত ও জাপানের মতো দেশগুলোর চাপের কারণেই হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে বলে বাংলাদেশ সতর্ক করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ এটিও অনুধাবন করছে এই সংকটের সমাধান অনেক কঠিন এবং এটি রাতারাতি সম্ভব নয়।

 

মন্তব্য