kalerkantho

আজ বিশ্ব পানি দিবস

নিরাপদ পানিতে নজর কম, ঝোঁক বেশি জোগানে

তৌফিক মারুফ ও শওকত আলী   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিরাপদ পানিতে নজর কম, ঝোঁক বেশি জোগানে

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬.১ অনুচ্ছেদ অনুসারে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। মানুষকে সুস্থ রাখার উপায় হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও নিরাপদ বা সুপেয় পানির জোগানের ওপর জোর দিচ্ছেন। তবে বাংলাদেশ এখনো সেই পথে চলতে পারছে না জোরালো পদক্ষেপের অভাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পানির জোগানদাররা যতটা না নিরাপদ পানির দিকে নজর দিচ্ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকে আছেন পরিমাণ বাড়ানোর দিকে। ফলে পানির চাহিদা পূরণে যেনতেনভাবে পানির সংকুলান করা হলেও তা কতটা নিরাপদভাবে মানুষ ভোগ করতে পারছে—সেই প্রশ্ন চাপাই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানুষের রোগব্যাধির সংক্রমণ কমছে না। বরং নিত্যনতুন পানিবাহিত রোগ বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। যদিও দেশে আজ এ দিবস পালনে সরকারি বা বেসরকারি কোনো আয়োজন নেই। আগামী ১১ এপ্রিল এ দিবস পালিত হবে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পানির জোগানের ওপর জোর দেওয়ার কথা স্বীকার করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভূগর্ভের পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে দেশে পানির কোনো ঘাটতি থাকে না, ওই সময় মানুষের মধ্যে পানির চাহিদা কম থাকে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। তখন মানুষের মধ্যে চাহিদামতো পানি না পাওয়া নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। তাই আমাদের কাছে পানির পরিমাণগত জোগানের ওপর বেশি নজর রাখতে হয়। কারণ পানি না পেলে মানুষ হাহাকার করে, তখন ওই পানি কতটা নিরাপদ তা মানুষের ভাবনায় থাকে না।’

তবে ওই প্রকৌশলী বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই নিরাপদ পানির জোগান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমরা পানির অভাব দূর করলাম, কিন্তু সেই পানি যদি নিরাপদ না হয় তা মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’ এদিকেও সরকারের নজর রয়েছে এবং বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রকৌশলী সাইফুর বলেন, বিশেষ করে অগভীর নলকূপকে নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। এ ধরনের নলকূপ স্থাপন করা হলেও তা যেন হয় শৌচাগার থেকে কমপক্ষে ৩০ ফুট দূরে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্নভাবে নলকূপের পানিতে বিপজ্জনক জীবাণু ঢুকে যায়।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে বছরে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানির সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ যায় সেচের কাজে, ১০ শতাংশ যায় শিল্প-কলকারখানায়, ২ শতাংশ যায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতে আর ৩ শতাংশ যায় মানুষের বাসাবাড়ির খাবার পানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

ওই সূত্র জানায়, গ্রামাঞ্চলে ৯৯ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভ থেকে। মাত্র ১ শতাংশ আসে উপরিভাগ থেকে বৃষ্টি বা অন্যান্য মাধ্যমে। অন্যদিকে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে খাবার পানির ৮০ শতাংশ আসে ভূগর্ভ থেকে। আর ৩০ শতাংশ আসে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিশোধিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ঠিক কী পরিমাণ পানি ভূর্গভ থেকে বছরে সারা দেশে উত্তোলিত হয় তার কোনো হিসাব নেই সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরও এমন কোনো তথ্য দিতে পারেনি। আবার এ ক্ষেত্রে বেশি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) কাছেও সেই হিসাব নেই।

ওয়ারপোর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভূগর্ভস্থ পানি) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে মোট কী পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত হয় তা এখনো নিরূপণ করা যায়নি। শুধু শহরে ওয়াসা তাদের উত্তোলিত পানির মোটামুটি একটি হিসাব রাখে। যদিও এখন একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে সারা দেশে মোট উত্তোলিত পানির পরিমাণ নিরূপণে গবেষণা চালানোর জন্য।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম আশ্রাব আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিরাপদ পানিই এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। শহরে-গ্রামে সব জায়গাতেই খাবার পানিতে নানা ধরনের জীবাণুর অস্তিত্ব মিলে থাকে। বিশেষ করে গ্রামে শ্যালোর পানিতে মলের জীবাণু খুবই বিপদ ডেকে আনে মানুষের জন্য। শুধু কলের পানিই নয়, পথে-ঘাটে জারের পানিও এখন বিপদমুক্ত নয়।’

মাত্র এক বছর আগেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একদল গবেষক তাঁদের গবেষণায় রাজধানীর বাসাবাড়ি, অফিস-আদালতে সরবরাহ করা ৯৭ শতাংশ জারের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু কলিফর্ম পেয়েছেন।

এ ছাড়া স্যুয়ারেজ লাইনে ছিদ্রসহ বিভিন্নভাবে ওয়াসার পানিতে মলমূত্রের জীবাণু মিশে যায়। সেগুলো কিছুটা শোধন করে বা শোধন ছাড়াই জারের পানিতে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কারণে জীবাণু থেকেই যাচ্ছে।

 

মন্তব্য