kalerkantho

সড়ক অনিরাপদ সমন্বয়হীনতায়

পার্থ সারথি দাস   

২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সড়ক অনিরাপদ সমন্বয়হীনতায়

গত বছরের ২৯ জুলাই থেকে টানা ৯ দিন নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকায় চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ৯টি দাবি ছিল। এসব দাবি বাস্তবায়নে যুক্ত মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও তদারকির অভাবে অপূর্ণ রয়ে গেছে সাতটি দাবি। গত মঙ্গলবার থেকে শিক্ষার্থীদের নতুন করে শুরু হওয়া আন্দোলনে উঠে আসা আটটি দাবিও বাস্তবায়িত হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মূল কারণ সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা। গত বছর এবং এবার শিক্ষার্থীদের দাবির অন্যতম—ফিটনেসহীন এবং লাইসেন্স নেই এমন গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না।

আন্দোলনের পর আট মাসে এ দাবি বাস্তবায়নে গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে মালিকপক্ষ ও বিআরটিএর তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। পরে সব ধরনের তৎপরতা থেমে যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুসারে, সারা দেশে ফিটনেসহীন গাড়ি আছে পাঁচ লাখ ১১ হাজার ৩৪৮টি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ফিটনেসহীন গাড়ি দুই লাখ ৩০ হাজার ৫৮২টি। এ হিসাবে সারা দেশে ফিটনেসহীন গাড়ির প্রায় ৪১ শতাংশ ঢাকায়। গত বছর সারা দেশে ফিটনেসহীন গাড়ি ছিল তিন লাখ।  এর মানে গত বছরের চেয়ে এবার ফিটনেসহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর বিআরটিএ মিরপুর, ইকুরিয়া, উত্তরা ও সাভারে ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সেবাপ্রার্থীদের ভিড় বেড়েছিল। কিন্তু দালালচক্রের কাছে পুরো ব্যবস্থা জিম্মি থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় এক লাখ আবেদনকারী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছে না।

ফিটনেস পরীক্ষার জন্য সারা দেশে মোটরযান পরিদর্শন কেন্দ্র আছে একটি। সেটি রাজধানীর মিরপুরে। বিআরটিএর সব কার্যালয়ে ফিটনেসের জন্য মোটরযান পরিদর্শক আছেন ১০৩ জন।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া দেশের ৫০ শতাংশ গাড়ি চালানো হচ্ছে। এর প্রায় ৩০ শতাংশ চলছে ঢাকায়। ফিটনেসহীন ও লাইসেন্সহীন গাড়ির আধিক্যে ঢাকার সড়কে প্রাণহানি বাড়ছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই ঘটে বাসের কারণে।

এসব বাসের কোনোটির ফিটনেস ছিল না আবার কোনোটির চালকের লাইসেন্স ছিল না। গত মঙ্গলবার রাজধানীর প্রগতি সরণি-কুড়িল সড়কে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১১৪১৩৫) ফিটনেস ছিল না। বাসটির রুট পারমিটও ছিল না। চালক সিরাজুল বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছিল বাসটি।

এবার শিক্ষার্থীদের আট দফা

এক. পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং প্রতি মাসে বাসচালকের লাইসেন্সসহ সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেক করতে হবে।

দুই. আটক বাসচালক ও সম্পৃক্ত সকলকে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

তিন. ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালককে দ্রুততম সময়ে অপসারণ করতে হবে।

চার. ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সকল স্থানে আন্ডার পাস, স্পিড ব্রেকার ও ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে।

পাঁচ. চলমান আইনের পরিবর্তন করে সড়কে হত্যার সঙ্গে জড়িত সকলকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

ছয়. দায়িত্ব অবহেলাকারী প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সাত. প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্টপ এবং যাত্রীছাউনি করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আট. ছাত্রদের হাফ পাস অথবা আলাদা বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।

এই আটটি দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দাবিটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের। কিন্তু এ বিষয়ে উভয় সংস্থার তেমন গরজ নেই। দ্বিতীয় দাবিটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিচার বিভাগের। এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। তৃতীয় দাবিটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর পুলিশের ও বিআরটিএর। তবে এ বিষয়ে বিআরটিএ নির্বিকার। চতুর্থ দাবিটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের। এ বিষয়ে সাত কর্মদিবসের মধ্যে অগ্রগতি জানানো হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র। পঞ্চম দাবির বিষয়ে এ ধরনের আইন আছে। ষষ্ঠ দাবিটির বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত কোনো সংস্থা সিদ্ধান্ত জানায়নি। সপ্তম দাবির বিষয়ে ঢাকা পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেছে। অষ্টম দাবির বিষয়ে বৈরী অবস্থানে রয়েছে বাস মালিকরা।

মূলত ঢাকার সড়কে গাড়ির নিচে প্রাণপ্রদীপ নিভে গেলেই জ্বলে ওঠে মানুষ। গত আট মাসের ব্যবধানে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে জেগে ওঠা আন্দোলনে আবারও দাবি উঠেছে। ছোট ছোট সব দাবির একটিই আহ্বান ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। এসব দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। সমন্বয় নেই বলেই পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। গত বছর নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের সুরটা উঠেছিল। কিন্তু কর্মসূচি কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তার জন্য তৃতীয় পক্ষের চাপ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৭টি নির্দেশনার মধ্যে মাত্র একটি নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়েছে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ দায় নিতে চায় না, কাজের জবাব দিতে চায় না। ফলে সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বারবার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবায়িত হয় না।’

গত বছর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রথম দাবি ছিল বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। তবে শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএসে ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা স্থাপন, প্রতিটি সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় গতিরোধক স্থাপন, শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তোলা, বাসে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করা, বাসে অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া—এসব দাবি পূর্ণতা পায়নি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গত ১৮ আগস্ট ১৭টি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। নির্দেশনা দিলেও বন্ধ হয়নি ঢাকায় রেষারেষি করে বাস চালানো। ১২১টি স্থান চিহ্নিত করা হলেও সেসব স্থানে বাস থামানো হচ্ছে না। দরজা বন্ধ রেখে বাস চালানোর হার বাড়েনি। বাসের ভেতরে প্রদর্শন করা হচ্ছে না চালকের লাইসেন্সের কপি। সড়ক নৈরাজ্য বন্ধে ঢাকায় কম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কমিটি করা হয়েছিল। আবার আন্দোলনের পর গতকাল এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সভা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা তৎপর আছি। তবে সব দায় আমাদের নয়।’

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের জন্য বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করতে হবে। দক্ষতা কম থাকলেও কিছু সংস্থার কর্মকর্তার আগ্রহ বেড়েছে। বেশির ভাগ দাবি বাস্তবায়নে সময় লাগবে, হুট করেই বাস্তবায়ন করা যাবে না। তবে জনসচেতনতাও জরুরি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ কর্মকর্তা মীর রেজাউল আলম বলেন, ‘আইন মানার প্রবণতা বাড়লে দুর্ঘটনা কমবে।’

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমানের কাছে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

মন্তব্য