kalerkantho

স্থবির রাজধানীতে দিনভর ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্থবির রাজধানীতে দিনভর ভোগান্তি

নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকালও রাজধানী ঢাকার অনেক রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে পথচারীরা। গাড়ি না পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে হেঁটেই বাড়ি ফেরে বহু রোগীও। ছবি : কালের কণ্ঠ

৬৮ বছরের সাহারা খাতুন এক ঘণ্টা হেঁটে শাহবাগ থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে পৌঁছতে পেরেছেন। তখন দুপুর ১২টা। চিটাগাং রোডের বাসায় কখন পৌঁছতে পারবেন জানেন না কোমর ও শরীর ব্যথা নিয়ে চিকিৎসক দেখাতে আসা এই নারী। এক শ টাকা হাতে নিয়ে সকালে বাসা থেকে বের হয়েছেন। বাসে করে এসেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সকাল ১১টার মধ্যেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখিয়ে বের হয়ে দেখেন শাহবাগ মোড় ফাঁকা। ছাত্ররা হাসপাতালের পাশেই অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

উপায় না দেখে সাহারা খাতুন হাঁটতে শুরু করেন। তাঁর হাতে একটি ককশিটের টুকরো। জানতে চাইলে বললেন, শাহবাগের ফুলের দোকান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে ব্যথায় আর পা না চললে ককশিট বিছিয়ে বসে বিশ্রাম নেন। এরপর আবার হাঁটেন। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছেন মৎস্য ভবন মোড়ে গেলে বাস পাবেন, তাই সেদিকেই যাচ্ছেন তিনি।

শুধু সাহারা খাতুনই নন গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এমন অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়ে রাস্তায় নামা বহু মানুষ। গত মঙ্গলবার রাজধানীর নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণিতে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। ওই দিন প্রগতি সরণি বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভ করে বিইউপিসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিইউপির শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি জানিয়ে গতকাল আবার দুর্ঘটনাস্থলে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। তাদের আন্দোলনে একাত্ম হওয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদ্দা, শাহবাগ, রায়সাহেব বাজার, ধানমণ্ডি, উত্তরা, কুড়িলসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করে। এসব এলাকায় গণপরিবহনসহ অন্য যানবাহন চলতে দেওয়া হয়নি। যে কারণে আশপাশের সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। তৈরি হয় তীব্র যানজট। দুই কারণেই স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী। ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

নদ্দা : আগের দিনের ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সকাল ৯টার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রবেশের মূল ফটকের সামনে প্রগতি সরণিতে অবস্থান নিতে শুরু করে বিইউপির শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আশপাশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে সড়ক বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। দিনভর বিক্ষোভের কারণে মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা ও কুড়িল পর্যন্ত কোনো যানবাহন চলেনি। হেঁটে বা বিকল্প বাহনে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়েছে লোকজনকে। গণপরিহন বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহন নেমেছে রাস্তায়। কিন্তু সড়ক বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে ছিল এসব যানবাহন। কেউ কেউ নতুন বাজারের পর ইউটার্ন নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া প্রগতি সরণি সড়ক বন্ধ থাকায় ভিআইপি সড়ক দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করেছে বেশির ভাগ যান। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের ফলে ভিআইপি সড়কে ছিল যানজট।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সামিউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাস না চলায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে হেঁটে গুলশান গিয়েছি। আমার সহকর্মীরা রিকশায় যেতে গিয়ে তীব্র যানজটের কবলে পড়েছে। তবে সড়কে ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যৌক্তিক।’

নদ্দার অবরোধের প্রভাব পড়ে অন্যান্য সড়কেও। অন্যান্য দিনের তুলনায় গতকাল কম গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে চান্দুরা-নবীনগর থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে। মিরপুর-১০ পর্যন্ত বাস চলাচল কম থাকলেও কোনো শিক্ষার্থীর বাধার মুখে পড়েনি। তবে মিরপুর-১০ থেকে কালশী হয়ে উত্তরা কিংবা প্রগতি সরণি হয়ে বাড্ডা-নতুন বাজারগামী বাসগুলো মিরপুর-১২ নম্বরে রাস্তার পাশে পার্কিং করা অবস্থায় দেখা গেছে। মিরপুর থেকে বিমানবন্দর, গাজীপুর, কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা রুটের গণপরিবহন সকালের দিকে চললেও দুপুরের পর অনেক পরিবহনের গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুরের পর বিমানবন্দরগামী সড়কে তীব্র যানজট দেখা গেছে।

হেমায়েতপুর থেকে খিলক্ষেতে বাবার বাসায় যাওয়ার জন্য দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন শাহেদা খাতুন (৩৫)। কোনো মতে মিরপুর-১২ নম্বর পর্যন্ত আসতে পেরেছিলেন তিনি। কালশী হয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো পরিবহন না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। বললেন, ‘দুই ছেলেকে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোনো বাস পেলাম না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। এখন ব্যাগ সামলাব নাকি বাচ্চাদের সামলাব?’

অসুস্থ মাকে নিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ার জন্য মিরপুরের মনিপুর (কাজীপাড়া) এলাকা বের হন বোরহান উদ্দিন। কোনো মতে ইসিবি চত্বর পর্যন্ত আসতে পারলেও আর এগোতে না পেরে ক্ষুব্ধ তিনি। বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে। তবে এভাবে লাগাতারভাবে সব পরিবহন বন্ধ হয়ে থাকলে আমাদেরও কষ্ট হয়। অসুস্থ মাকে নিয়ে চেকআপের জন্য যাব অথচ কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। এমন একটি উপায় বের করা উচিত যাতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও কষ্ট না হয়, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোও বাস্তবায়িত হয়।’

শাহবাগ : শাহবাগে অবস্থান নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষার্থীও যোগ দেয়। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নেওয়ার পরপরই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ মৎস্য ভবনের পাশে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। আর ফার্মগেটের দিক থেকে আসা গাড়ি কাকরাইলের দিকে ঘুরিয়ে দেয় ইন্টার কন্টিনেন্টাল মোড় থেকে। ফলে মৎস্য ভবন থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত তীব্র যানজট দেখা যায়। অন্যদিকে দুপুর ১২টার দিকে বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মগবাজার এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। শাহবাগ মোড়ের পাশেই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল ও বারডেম হাসপাতাল। দুটি হাসপাতাল থেকেই রোগী ও তাদের স্বজনদের বের হওয়ার পর কোনো গাড়ি না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

রায়সাহেব বাজার : পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে সদরঘাট থেকে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকারী মানুষ প্রচণ্ড কষ্টে পড়ে। সেখানে অবরোধ করায় কোর্টকাচারির সামনে থেকে মিটফোর্ড, গুলিস্তান, ওয়ারী এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়।

 

মন্তব্য