kalerkantho

এবার বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে গুলি করে হত্যা

সোমবারের ঘটনায় বাঘাইছড়ি স্তব্ধ

রাঙামাটি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




এবার বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে গুলি করে হত্যা

বাঘাইছড়িতে নির্বাচন শেষে ফেরার পথে ব্রাশফায়ারে সাতজনকে হত্যার ১৪ ঘণ্টার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটির আরেক উপজেলা বিলাইছড়ির আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী সুরেশও নির্বাচন শেষ করে ফিরছিলেন। নৌকা থেকে নামিয়ে স্ত্রী ও ছেলের সামনে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর এ জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিবাদে আজ বুধবার সকালে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হবে।

সুরেশ কুমার তঞ্চঙ্গ্যার একমাত্র ছেলে নিরূপম তঞ্চঙ্গ্যা বাবার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সোমবার গ্রামের বাড়ি ফারুয়ার ওড়াছড়িতে ভোট শেষ করে আজ সকালে ইঞ্জিনচালিত বোটে করে আমরা সপরিবারে বিলাইছড়ি ফিরছিলাম। সকাল ৯টার দিকে আলিক্ষং এলাকায় চালক বোট থামালে বাবা কারণ জানতে চান। চালক পারে দাঁড়িয়ে থাকা অস্ত্রধারীদের দেখালে বাবা বোট চালিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। অস্ত্রধারীরা গুলি করে বোট ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে চালক তীরে বোট ভেড়ায়। এ সময় তারা বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মা তাদের পায়ে ধরে বাবার প্রাণ ভিক্ষা চায়। কিন্তু তারা মাকে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয় এবং বাবাকে বুকে এবং মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে চলে যায়।’

নিরূপম তঞ্চঙ্গ্যা সন্তু লারমা এবং তাঁর দল জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করে বলেছেন, ‘বাবা আওয়ামী লীগার এবং সন্তু লারমাদের বিপক্ষে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতেন বলেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে এভাবে নির্মমতার শিকার সব হত্যার বিচার চাই।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ ইকবাল বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সুরেশ কান্তির লাশ বর্তমানে উপজেলা সদরে আছে। রাঙামাটি পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

সোমবারের নির্বাচনে এই উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমর্থিত প্রার্থী বীর-উত্তম তঞ্চঙ্গ্যার কাছে পরাজিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়সেন তঞ্চঙ্গ্যা। জয়সেনের পক্ষেই কাজ করেন সুরেশ। তবে জনসংহতি সমিতির জেলা সম্পাদক নীলোৎকাল খীসা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা এ ধরনের রাজনীতির চর্চা করি না। এসব ঘটনার সঙ্গে আমাদের জড়ানোর চেষ্টা স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হীন প্রচেষ্টা।’ বিলাইছড়ি থানার ওসি পারভেজ আলী বলেন, ‘ভিক্টিমের পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং আমাদের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বাঘাইছড়ি থমথমে : দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের ৯ কিলোমিটার এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে হতাহতের ঘটনায় এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।  গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়কজুড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। পাশেই পড়ে আছে তাজা গুলি ও গুলির খোসা। ধারণা করা হচ্ছে খুব কাছ থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ৮-১০ গজের ব্যবধানে দুটি চায়ের দোকান। তবে গতকাল দোকান দুটিসহ আশপাশের সব বাড়িঘর বন্ধ পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, আক্রান্ত গাড়িবহরের ওপর শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।

হামলার শিকার গাড়িবহরে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ জানায়, বহরে ছিল মাত্র চারটি গাড়ি (চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত জিপ)। প্রথম গাড়িটি ছিল নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় থাকা বিজিবির, বাকি তিনটি গাড়িতে ছিল পুলিশ, আনসার, ভিডিপির সদস্যসহ নির্বাচনী কর্মকর্তারা। বেশি গুলি লেগেছে তৃতীয় গাড়িতে এবং চতুর্থ গাড়ির লোকও গুলিবিদ্ধ হয়।

বহরের দ্বিতীয় গাড়িতে ছিলেন কাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম। তিনি বাঘাইহাট প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। নুরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ পেছনে তিনি গুলির শব্দ পান। তখন চালককে গাড়ি থামাতে বললে পেছনের গাড়িটি দ্রুত তাদের পার হয়ে সামনের দিকে যাওয়ার ইশারা দেয়। এ অবস্থায় দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তাঁরা আগাতে থাকেন। বিজিবি ক্যাম্পের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেখা যায়, তাদের পেছনের গাড়ির ভেতরে গুলিবিদ্ধ লোকজন কাতরাচ্ছে। এ অবস্থায় আবার দ্রুত ছুটে যাওয়া হয় বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর হাসপাতালে।

বহরের তৃতীয় গাড়ির চালক মো. আল আমিন (২৮) জানান, গুলি চলছে টের পেয়ে তিনি গাড়ি দ্রুত চালাতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির ভেতরে আরোহীদের কাতরানোর আর্তনাদ তিনি শুনতে পান। আল আমিন জানান, তাঁর পাশে বসা ছিলেন একজন প্রিসাইডিং অফিসার এবং একজন এসআই। দুজনই বলছিলেন তাঁদের গায়ে গুলি লেগেছে এবং প্রিসাইডিং অফিসার তাঁর মাথায় গুলি লেগেছে বলেই চালকের ওপড় হেলে পড়েন। এ অবস্থায় গাড়ি থামালে সমস্যা আরো বেশি হবে ভেবে নিজের মনোবল নিয়ে তিনি গাড়ি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

গতকাল ঘটনাস্থলের পাশের পাহাড়ি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে লোকজন দেখা যায়নি। গতকাল দিনভর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নিহতদের লাশ দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদিকে ঘটনার সময় আনসারের একটি রাইফেল খোয়া গেছে বলে জানান বাঘাইছড়ি থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম। পুলিশ ধারণা করছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চলন্ত গাড়ি থেকে রাইফেলটি পড়ে গেছে।

এদিকে পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন অচিরেই শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক। গতকাল দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন যারা আগে কেন্দ্র দখল করে জোরপূর্বক ভোট নিয়ে নিতে পারত, এবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর সতর্কতার কারণে তা পারেনি। সে কারণেই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনের দিন দুপুরেই হুমকি প্রদান করে। হুমকির সঙ্গে হামলাটির সম্পর্ক আছে এবং ধারণা করা হচ্ছে জেএসএস (সন্তু) এবং ইউপিডিএফ (প্রসিত) এর সঙ্গে জড়িত।

গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ বিভাগ) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ বলেন, ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে ক্লু পাওয়া গেছে; মামলার প্রস্তুতি চলছে।

মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে সভা করেছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ, পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন, ৫৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নৌশাদ, ২৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুবুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক এ সময় নিহত সবার পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে দেন। তিনি নিহতদের পরিবারের চাকরি সক্ষম কাউকে চাকরি দেওয়া এবং সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘যৌথ অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের অবশ্যই ধরা হবে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বাঘাইছড়ি হামলার ঘটনা তদন্তে গতকাল সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক দীপক চক্রবর্তীকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।

বান্দরবান থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বাঘাইছড়ি হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী ও বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর বাহাদুর উশৈসিং। গতকাল বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাজনীতির নামে একটি বিশেষ মহলের অব্যাহত সন্ত্রাস চলছে। তিনি বিলাইছড়িতে সুরেশ কুমার তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, বাঘাইছড়ি হামলার প্রতিবাদে আজ খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের একাংশ। সংগঠনটির জেলা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রবিউল হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

মন্তব্য