kalerkantho

শুরু থেকে কান্তারের ভুলে ভরা টিভি দর্শক জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শুরু থেকে কান্তারের ভুলে ভরা টিভি দর্শক জরিপ

কান্তার এমআরবির আগের পরিচয় ছিল ‘সিরিয়াস মার্কেটিং অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ’। এই নামে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারে বিভিন্ন পণ্য এবং সেসব পণ্যের বিপণন বিষয়ে জরিপ ও গবেষণা শুরু করে। জাতীয় গণমাধ্যমের পাঠক-দর্শকও জরিপ করে। টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন, দেশীয় সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট নিয়ে দর্শক-পাঠকের অবস্থান, মতামত তুলে ধরে। জরিপগুলো বিক্রি করা হয় মিডিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে। কিন্তু শুরু থেকে তাদের টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শক জরিপ (টিআরপি) নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও সংস্থাটির জরিপ কিনতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্টরা। দেশে এ ধরনের গবেষণায় এই একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান থাকায় এ বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কালের কণ্ঠ খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ১৯৯৫ সালের জুনে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। শুরুটা হয়েছিল ইন্ডিয়ান মার্কেটিং রিসার্চ ব্যুরো ইন্টারন্যাশনালের (আইএমআরবি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। আইএমআরবি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের অন্যতম বাজার জরিপকারী কান্তার গ্রুপের সদস্য। ভোক্তাদের নিয়ে গবেষণায় ‘সিরিয়াস’ সংশ্লিষ্ট পণ্য বিষয়ে ভোক্তাদের আগ্রহ, অভিব্যক্তি, গ্রহণ, বর্জনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে জাতীয় প্রচারমাধ্যম জরিপ বা ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে এবং টেলিভিশন দর্শক ট্র্যাকিং বা টেলিভিশন রেটিং করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, ব্যবসা ও বিতরণ বিষয়ের গবেষণাও প্রতিষ্ঠানটির কর্মসূচিতে আছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। শুরুতে ছিল পাঁচটি মাঠপর্যায়ের কার্যালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে। সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা ছিলেন ৪৪ জন। এ ছাড়া রয়েছেন ৬০ জন সুপারভাইজার, ২০ জন কন্ট্রোলার এবং তিন শতাধিক অনিয়মিত সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী।

গবেষণা ও জরিপে ব্যবহার করা হতো সফটওয়্যার। মিডিয়া এক্সপ্রেস থ্রি, এসপিএসএস, এমওএস, কোয়ান্টাম সফটওয়্যার তারা নিয়েছিল আইএমআরবির কাছ থেকে। পরে নিজেরা তৈরি করে সফটওয়্যার থিংক মিডিয়া। টেলিভিশন টিআরপির জন্য পিপল মিটার ব্যবহার শুরু করে।

গত বছর জাতীয় গণমাধ্যম জরিপ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে নামে পরিচিত। দেশের সব পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন চ্যানেল, এফএম রেডিও, সিনেমা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদি বিষয়ে ভোক্তা, দর্শক ও শ্রোতাদের মতামত নিয়ে তা তুলে ধরা হয়। ২০০২, ২০০৫ ও ২০০৮ সালেও এই জরিপ করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম দুটো জরিপের ফলাফল গোপন রাখা হয়। তারপর থেকে তা বিক্রি করা শুরু করে। এখন দুই বছর পর পর এ জরিপ করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের জরিপে ১৩ হাজার ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়েছিল। গত বছর নেওয়া হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার ব্যক্তির মতামত। জরিপটি চার লাখ টাকায় বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিক্রি করা হয়।

টেলিভিশন রেটিংয়ের ক্ষেত্রে তাদের জরিপ শুধু ঢাকা শহরভিত্তিক। প্রতি সপ্তাহে কোন চ্যানেল দর্শক বেশি টিউন করছে তা দেখানো হয় এই রেটিংয়ে। এটির নাম দেওয়া হয় স্ট্রিপ (সিরিয়াস টেলিভিশন রেটিং ইন্ডিকেটর পয়েন্ট)। আগে তারা ‘ডায়েরি মেথড’ ছিল। বিভিন্ন পরিবারের কাছে একটি ডায়েরি দিয়ে আসা হতো। পরিবারের সদস্যরা দিনে কোন টিভি চ্যানেল কতক্ষণ দেখছে তা ডায়েরিতে লিখে রাখত। এক সপ্তাহ পর ডায়েরি সংগ্রহ করা হতো। ঢাকায় শুরুতে ‘সিরিয়াস’ এক হাজার ৮০০ ব্যক্তির কাছে ডায়েরি সরবরাহ করত। ২০০৮ সালের মার্চ থেকে ডায়েরি বাদ দিয়ে পিপল মিটার যন্ত্র ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, টেলিভিশন সেটের পেছনে সংযুক্ত করা হয়। ছোট যন্ত্র থাকে টেলিভিশনের ওপর এবং দেওয়া হয় একটি রিমোট। পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্য রিমোটে আলাদা বাটন থাকে। যে কেউ বাটন চেপে টেলিভিশন দেখা শুরু করবে। তখন সে কী কী চ্যানেল দেখছে তা পিপল মিটারে রেকর্ড হয়। সপ্তাহ শেষে পিপল মিটারে পাওয়া তথ্য থেকে টেলিভিশন রেটিং নির্ণয় করা হয়।

ঢাকায় ১২৫ থেকে ১৩০টি পরিবারের কাছে পিপল মিটার সরবরাহ করা হতো। প্রতি পরিবারে চারজন করে সদস্য থাকলে তারা ৫০০’র কিছু বেশি লোকের তথ্য পেয়ে থাকে।

‘সিরিয়াস’-এর এই টিভি রেটিং নিয়ে শুরুতেই বিতর্ক ও সন্দেহ তৈরি হয়। কারণ গণমাধ্যমকে ডায়েরি মেথড বা পিপল মিটারের স্যাম্পল কপি দেখায় না প্রতিষ্ঠানটি। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের বাসার ঠিকানাও দেয় না। এতে সংশ্লিষ্টরা জানতে পারেনি কোন শ্রেণির দর্শকের মতামতের ভিত্তিতে রেটিং নির্ণয় করা হতো। সব শ্রেণির দর্শকের অংশগ্রহণ ছিল কি না বা এখনো আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ঢাকার জনসংখ্যা ২০০৮ সালে ছিল এক কোটির ওপরে। এখন তা প্রায় দুই কোটি। ১২৫টি পিপল মিটার দিয়ে টেলিভিশন রেটিং নির্ণয় করার কাজ শুরু করা যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

যে পরিবারে পিপল মিটার দেওয়া হয় তাদের সদস্যরা টেলিভিশন দেখার আগে তার জন্য নির্ধারিত বাটন চাপে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। পরিবারের কোনো সদস্য বাটন চাপার পর আরেকজন নিজের বাটন চেপে না দেখলে তার টিউনিং করা চ্যানেল যোগ হবে পূর্বজনের হিসাবে। প্রশ্ন উঠেছে, এ ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক জরিপ হচ্ছে কিভাবে?

টেলিভিশনে চ্যানেলগুলোর সিরিয়াল হেরফেরেও জরিপে ভুল তথ্য উঠে আসার কথা। যেমন দেখা গেল ২ নম্বর চ্যানেলে আছে সনি টিভি, এক সপ্তাহ পরে সেখানেই হয়তো দেখা যাবে স্টার মুভিজ। সনি টিভি হয়তো চলে গেছে ৩২ নম্বরে। সেক্ষেত্রে পিপল মিটার কিন্তু ২ নম্বরে সনি টিভি হিসাবেই টিউনিং গণনা করবে। ‘সিরিয়াস’ এই সমস্যারও কোনো সঠিক সমাধান দিতে পারেনি। কেবল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকে না।

বাংলাদেশ কেবলস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আনোয়ার পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডায়েরি মেথডের পর এখন নাকি তারা পিপল মিটার ব্যবহার করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো অপারেটর বা সাবস্ক্রাইবার বলতে পারে না, কোন বাসায় এই পিপল মিটার বসানো আছে। আমাদের নিবন্ধিত সদস্য প্রায় তিন হাজার ৮০০। আমরা কেউ বিষয়টি সম্পর্কে জানি না। ১৯৯৫ সালের আগস্ট থেকে আমাদের সংগঠন শুরু করেছি। সিরিয়াসের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’ তিনি বলেন, দেশের পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে কেবল নেটওয়ার্ক বা ডিশ। কিন্তু জরিপ হচ্ছে ঢাকাভিত্তিক।

জরিপে এক সপ্তাহে কোনো চ্যানেলের রেটিং ০.২৩ হলে পরের সপ্তাহে ০.১৮, তার পরের সপ্তাহে ০.২৯। একটি ফরমেট জানা থাকলে এমনটি খুব সহজেই করা সম্ভব। ২০০৮ সালে ১৯তম সপ্তাহে অর্থাৎ মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে রেটিংয়ে ‘চ্যানেল ওয়ান’ ছিল এক নম্বরে। সাধারণ চোখে যা মেনে নেওয়া ছিল বেশ কঠিন। ওই সপ্তাহে ওই চ্যানেলে এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিল না, যার কারণে তাদের দর্শক এত বেড়ে যাবে। অভিযোগ আছে, অনেক সময় টাকার লেনদেনের মাধ্যমেও রেটিংয়ের পরিবর্তন হয়।

সিরিয়াসের কর্মকর্তারা দাবি করেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোড অব কন্ডাক্ট পুরোপুরি মেনে চলার কারণে টেলিভিশন রেটিংয়ে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় গোপন রাখা হয়।

চ্যানেল আইয়ের বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। তার মধ্যে টেলিভিশন দর্শক দুই কোটি। এর মধ্যে কতজন দর্শকের টিভি দেখার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে? আসলে বিজ্ঞানসম্মত ও ব্যাপক পরিসরে তথ্য সংগ্রহ করার পর একটি পরিপূর্ণ জরিপ করা সম্ভব। ভারত এরই মধ্যে এই সক্ষমতা অর্জন করেছে।’ তিনি বলেন, টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো এর আগে এ নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে কোনো সংস্থার জরিপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ থেকে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তথ্য স্বচ্ছ হতে হবে। এখানে কোনো ধরনের লুকোচুরি থাকলেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়কেও আরো বেশি নজর দিতে হবে।

মন্তব্য