kalerkantho

এক কোটি টাকা দিয়েই ফের ঋণ

ঋণখেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ!

সজীব হোম রায়   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঋণখেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ!

ঋণখেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ডাউন পেমেন্টে ঋণ স্থিতির ১ শতাংশ অথবা এক কোটি টাকার মধ্যে যেটি কম সেটি জমা করেই খেলাপি ঋণ নবায়ন বা পুনঃ তফসিল করা যাবে। এ ছাড়া ঋণ পরিশোধে দুই বছরের মোরাটরিয়ামসহ মোট ১৫ বছর সময় দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ১৫ বছরের মধ্যে দুই বছর ঋণ কিস্তি পরিশোধে এক টাকাও খরচ করতে হবে না। ঋণ পুনঃ তফসিলের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ সরল সুদ হার হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে এই প্রস্তাবগুলো উপস্থাপনের প্রায় সব আয়োজন শেষ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি। এসব প্রস্তাব পাস হলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গত বছর প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন ব্যবসায়ী/শিল্পোদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়মিত ঋণগুলোকে নিয়মিতকরণের জন্য ব্যাংক দায় পরিশোধে আট সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তিনজন চেয়ারম্যান ও চারজন সিইও/ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ঋণ পুনঃ তফসিলের বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মতামত দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, কমিটির বেশির ভাগ সুপারিশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অমত রয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রীর জন্য যে প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে সেটিতে এগুলো আমলে নেওয়া হচ্ছে না।

কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের বেইল আউট বা মন্দ ঋণকে ভালো ঋণে রূপান্তরিত করার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিদের বিনা ডাউন পেমেন্টেই পুনঃ তফসিল করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বিষয়টির বিরোধিতা করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের মতামতে বলেছে, ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা প্রকাশ পায়। বিনা ডাউন পেমেন্টে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা এর অপব্যবহার করতে পারে। ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে বিনা ডাউন পেমেন্টের পরিবর্তে ঋণ স্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্পমাত্রায় হলেও বিভিন্ন হারে ডাউন পেমেন্ট ধার্য করা উচিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের ভিত্তিতে ডাউন পেমেন্টে ঋণ স্থিতির ১ শতাংশ অথবা এক কোটি টাকা—এ দুয়ের মধ্যে যেটি কম সেটি জমা করে আবেদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ঋণ পরিশোধের সময়কাল ১৫ বছর পর্যন্ত রাখার পক্ষে সরকার গঠিত উচ্চপর্যায়ের এ কমিটি। কমিটি বলেছে, এই ১৫ বছরের মধ্যে আবার দুই বছর মোরাটরিয়াম থাকবে। অর্থাৎ এ দুই বছর ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এটি করা হলে ব্যাংকের তারল্য সংকটসহ মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত বর্ধিত মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলে বিশেষ করে নিয়মিত ঋণগ্রহীতারা শুধু দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুবিধা গ্রহণের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণগ্রহীতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ঋণ আমানত ব্যবস্থাপনায় অসংগতি সৃষ্টি হতে পারে এবং ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক মোরাটরিয়ামসহ চলতি মূলধন ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ছয় বছর এবং মেয়াদি ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার পরামর্শ দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরামর্শ আমলে না নিয়ে কমিটির প্রস্তাবই চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু কেস টু কেস বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে মন্ত্রণালয়।

ঋণের সুদহারের ক্ষেত্রে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ৭ শতাংশ হিসাবে সরল সুদহারে ঋণ পুনঃ তফসিল হবে বলে প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আমানত ও ঋণের সুদহার চক্রবৃদ্ধি হারে নির্ধারণ করা হয়। সরল সুদে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বিদ্যমান বাজার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ হিসাবায়ন নীতিমালার (বিআরপিডি সার্কুলার নং-২৭, তারিখ ৩১ আগস্ট ২০১০ ও বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং-১৪, তারিখ ৭ ডিসেম্বর, ২০১০) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কমিটির সুপারিশ মোতাবেক সুবিধা দেওয়া হলে ব্যাংক তাদের আয়ের যে অংশ থেকে বঞ্চিত হবে তা পুষিয়ে নিতে অন্যান্য খাতের ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া পুনঃ তফসিলকৃত ঋণের জন্য স্বল্প সুদ নির্ধারণ করা হলে এই সুবিধা গ্রহণের জন্য ভালো ঋণগ্রহীতারাও ইচ্ছাকৃত খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর ব্যাংক ব্যবসায় কস্ট অব ফান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বিশেষ খাতের ঋণগ্রহীতাদের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের স্বার্থ যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পুনঃ তফসিল সুবিধার হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসংক্রান্ত বিদ্যমান সব নীতিমালার পাশাপাশি ব্যাংকের দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কস্ট অব ফান্ড ও তারল্য অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিবেদনটিতে কমিটি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের পক্ষে প্রস্তাব করেছে। কমিটি বলেছে, কিস্তির মধ্যে আসল ও সুদের পরিমাণ মোট আসল ও সুদ আনুপাতিক হারে আদায়যোগ্য হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কিস্তি নির্ধারণের কথা বলেছে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক ডিজি তৌফিক আহমেদ চৌধুরী মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রস্তাবগুলো যদি পাস হয় তাহলে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি আরো উৎসাহিত হবে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরে আসার যে আশা তা আরো দীর্ঘায়িত হবে। এগুলো ভালো পদক্ষেপ নয়। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের প্রতি কঠোর হবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি এ ব্যাপারে নমনীয়। প্রস্তাবগুলো পাস করা উচিত হবে না।’

মন্তব্য