kalerkantho

কান্তারের প্রচারমাধ্যম জরিপ নিয়ে সন্দেহ

জরিপের নামে বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জরিপের নামে বাণিজ্য

মুদ্রিত সংবাদপত্রের পাঠকসংখ্যার জরিপ নিয়ে সরকারকে অবহিত না করেই গোপনে বাণিজ্য করছে বহুজাতিক কম্পানি কান্তার এমআরবি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্যের বাজার গবেষণার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানটি সংবাদপত্রের জরিপ প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশও করে না। তাদের জরিপ সরকারি তথ্য ও অন্যান্য বেসরকারি জরিপের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। টেলিভিশনের টিআরপি (টেলিভিশন রেটিং পয়েন্টস) নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা যে তথ্য দেন তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আগে এই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি নাম ছিল। সেই প্রতিষ্ঠানের টিআরপিতে ভুল তথ্য থাকায় আদালত ২০১৬ সালে টিআরপি প্রকাশে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সরকারি নথিতে প্রচারসংখ্যার দিক থেকে কালের কণ্ঠ তৃতীয় স্থানে আছে জানিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে তথ্য তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রচারসংখ্যায় তালিকার শীর্ষে আছে বাংলাদেশ প্রতিদিন। দ্বিতীয় স্থানে প্রথম আলো, তৃতীয় স্থানে আছে কালের কণ্ঠ, চতুর্থ স্থানে যুগান্তর, পঞ্চম স্থানে ইত্তেফাক, ষষ্ঠ স্থানে জনকণ্ঠ, সপ্তম স্থানে আমাদের সময়, অষ্টম স্থানে সমকাল, নবম স্থানে মানবকণ্ঠ ও দশম স্থানে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ।

সরকারের কাছে তৃতীয়, কান্তারের কাছে সপ্তম : সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুসারে, কালের কণ্ঠ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রকাশসংখ্যা হিসেবে। কিন্তু গত বছর প্রকাশিত কান্তার পরিচালিত জাতীয় প্রচারমাধ্যম জরিপ (ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে) ২০১৮-তে দেখানো হয় ভিন্ন তথ্য। এতে বলা হয়, পাঠকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি প্রথম আলোর, তার পাঠক ৬৫ লাখ; দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ প্রতিদিন, পাঠক ৫৫ লাখ; ১৮ লাখ পাঠক নিয়ে তৃতীয় স্থানে যুগান্তর; আট লাখ পাঠক নিয়ে চতুর্থ ইত্তেফাক; পঞ্চম স্থানে আছে নয়া দিগন্ত, পাঠক সাত লাখ। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদী যষ্ঠ স্থানে আছে ছয় লাখ পাঠক নিয়ে। কালের কণ্ঠ ও আমাদের সময় চার লাখ পাঠক নিয়ে আছে সপ্তমে। কান্তারের জরিপে আগের বছর ২০১৭ সালে কালের কণ্ঠের পাঠক ছিল পাঁচ লাখ, গত বছরের জরিপে তা দেখানো হয় এক লাখ কম।

অথচ সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে কালের কণ্ঠ তৃতীয় স্থানে রয়েছে বলে বারবার পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির এই জরিপের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপন করা তথ্য সাংঘর্ষিক। তথ্য মন্ত্রণালয় বলছে, কালের কণ্ঠ প্রচারসংখ্যায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে পত্রিকাটি শহরে ও গ্রাম এলাকায় দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে জাতীয় সংবাদপত্র হিসেবে, তার পাঠকসংখ্যা চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আজাদীর চেয়ে কম হয় কিভাবে?

পরিপ্রেক্ষিতের উল্টো কান্তারের জরিপ তথ্য : দেশীয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পরিপ্রেক্ষিত’-এর গবেষণায় গত বছর  উঠে আসে, দেশের সংবাদপত্রজগতে পাঠকপ্রিয়তায় সবার ওপরে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’। বলা হয়েছে, মুদ্রণ সংস্করণে ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার পাঠক নিয়ে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন। অথচ কান্তার এমআরবি বলছে, প্রথম আলো ৬৬ লাখ পাঠক নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। ‘পরিপ্রেক্ষিত’-এর গবেষণা বলছে, দ্বিতীয় অবস্থানে আছে প্রথম আলো, এর পাঠকসংখ্যা ৫৫ লাখ ৯২ হাজার। আর ২৬ লাখ ৪০ হাজার পাঠক নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কালের কণ্ঠ। কিন্তু কান্তার বলছে, কালের কণ্ঠ আছে সপ্তম স্থানে।

কান্তারের জরিপে যুগান্তর তৃতীয় স্থানে আছে। কিন্তু ‘পরিপ্রেক্ষিত’-এর গবেষণায় যুগান্তর আছে চতুর্থ অবস্থানে। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে আমাদের সময়। গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গবেষণা চালায় ‘পরিপ্রেক্ষিত’। গবেষণায় সারা দেশের এক হাজার লোকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় আরো জানানো হয়, বাংলাদেশে ছাপা সংবাদপত্রের মৃত্যুর সম্ভাবনা আপাতত নেই। দেশের ২৩ শতাংশ অর্থাৎ তিন কোটি ৬৮ লাখ মানুষ এখনো সংবাদপত্রের পাঠক।

গত বছর কান্তার এমআরবি জাতীয় প্রচারমাধ্যম জরিপ চালায় ১৫ বছর বয়সী ও তদূর্ধ্ব মানুষের মধ্যে। এই ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষ আছে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ২৩ হাজার। এই বয়সসীমার প্রতিনিধি হিসেবে ১৬ হাজার ১৮৩ জনের কাছ থেকে সরাসরি মতামত নেওয়া হয়। সংবাদপত্র ছাড়াও টেলিভিশন, ইন্টারনেট, রেডিও ও বিলবোর্ডের বিস্তৃতি এই জরিপে যোগ করা হয়েছিল। মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেন সেবা, মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার গ্রাহক বিশ্লেষণমূলক তথ্য এই জরিপের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। তবে জরিপের ফলাফল প্রতিষ্ঠানটি জমসমক্ষে তুলে ধরে না। তারা জরিপ ফলাফল বিক্রি করে পণ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই কান্তারের জরিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, জরিপের তথ্য ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিস্তারিত উপস্থাপন করা হয় না।

১৯৯৭ সাল থেকে জরিপ পরিচালনা করে আসছে কান্তার। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালে ‘ঢাকা মিডিয়া সার্ভে’ নামে জরিপ করে। ২০০২ সাল থেকে ‘ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে’ নামে এই জরিপ করে আসছে। জানা গেছে, লন্ডনভিত্তিক জরিপ প্রতিষ্ঠানটি ৬৭টি দেশে জরিপকাজ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে। মিডিয়া এজেন্সি নেটওয়ার্ক ডাব্লিউপিপির একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এটি।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে সব মিলিয়ে প্রকাশিত পত্রিকা দুই হাজার ৬৫৪টি। তার মধ্যে দৈনিক এক হাজার ২৪৮, সাপ্তাহিক এক হাজার ১৯২টি ও পাক্ষিক ২১৪টি। তবে কান্তারের জরিপে ভিন্ন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সারা দেশে উল্লেখ করার মতো ১৮০টি পত্রিকা ও ২০০টি ম্যাগাজিন রয়েছে। কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সংবাদপত্রের মানকে ‘মানসম্মত’ বলছে তার সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি তারা।

নীতিমালা করবে সরকার : তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ এরই মধ্যে বলেছেন, ‘তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা থাকা উচিত। আমরা সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে তথ্য উপস্থাপন করেছি।’ তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি তথ্যের সঙ্গে কান্তার এমআরবির জরিপের তথ্য মেলে না। এই প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমসংক্রান্ত জরিপ পরিচালনা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁদের অবহিত করেনি। জরিপের ফলাফল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেও পাঠায় না। জরিপ জনসমক্ষে প্রকাশ না করে বিক্রি করা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো নীতিমালার মধ্যে আনা উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।

জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত : বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, পদ্ধতির ধরন ও কত মানুষের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হলো তার ওপর নির্ভর করে জরিপের গ্রহণযোগ্যতা। বহুজাতিক কম্পানি জরিপ করে গোপনে বিক্রি করতে পারে। তবে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কী পদ্ধতিতে জরিপ হলো তা স্পস্ট করা উচিত।

ভুল তথ্যের জন্য আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন : কান্তার এমআরবির আগের নাম ছিল এমআরবি বাংলাদেশ। টিআরপির ভুল তথ্য প্রকাশ করায় ২০১৬ সালের ৬ জুন আদালত এই প্রতিষ্ঠানের ওপর তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কান্তার সাপ্তাহিক ভিত্তিতে টিআরপির তথ্য দিত। এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতো। তাদের টিআরপির তথ্য নিয়ে তার আগে থেকেই বিভিন্ন নির্মাতা ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তুলছিল। একপর্যায়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের (ইমা) পক্ষ থেকে শহিদুল ইসলামের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা যুগ্ম জেলা জজ আদালত ওই রায় দিয়েছিলেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের অনেক মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানও তাদের পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী দর্শকপ্রিয় ছিল না। আবার একটি সাধারণ অনুষ্ঠানের দর্শক দেখানো হচ্ছিল খুব বেশি।

জরিপ হাতে পেতে চাইলেও কান্তারকে টিভি চ্যানেলগুলোকে টাকা দিতে হতো। বার্ষিক গ্রাহক হওয়ার নাম করে প্রতিষ্ঠানটি ফি নিচ্ছিল ভ্যাট ছাড়াই ১২ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ৩ জুন বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) এমআরবির জরিপ বর্জন করেছিল। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এমআরবির টিআরপির যাচাই পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত ছিল না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কান্তার এমআরবির কর্মকর্তা প্রণব মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’ অন্য এক কর্মকর্তা সমীর কুমার পাল কালের কণ্ঠকে পাল্টা প্রশ্ন  করেন, ‘আপনারা জরিপের তথ্য কোথায় পেলেন? আপনাদের তো তা পাওয়ার কথা নয়।’ প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট অন্য তিন কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে বারবার অস্বীকার করেন।

নতুন নাম ধারণ করছে কান্তার : কান্তার এমআরবি বাংলাদেশ-এর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলতে গেলে গোপনে। বিষয়টি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে কান্তার রিসার্চ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রধান কিশোর বণিক কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক দিন আগে এ নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে তা সংশ্লিষ্ট সবাই জানে না। এ জন্য সময় লাগবে। চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহের কাজে নেতৃত্ব দেন কিশোর বণিক।

 

 

মন্তব্য