kalerkantho

বিশ্বে নতুন ধরনের জঙ্গিবাদের ইঙ্গিত

বিদ্বেষ ঠেকাতে না পারলে আরো বিপদের শঙ্কা

মেহেদী হাসান   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদ্বেষ ঠেকাতে না পারলে আরো বিপদের শঙ্কা

ক্রাইস্টচার্চে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলাকে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিবাদের পর বিশ্বে খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ জঙ্গিবাদ শুরুর ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর তাত্ত্বিক বীজ উগ্র জাতীয়তাবাদ শুধু নিউজিল্যান্ডেই নয়, বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। এটি নতুন ধরনের জঙ্গিবাদ সৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করে। এটিই এখন আগামী দিনের বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শঙ্কা। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই উগ্র জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস থেকে বাঁচতে হলে বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করা থেকে দূরে থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, সমাজে বিভিন্ন ধরনের বিভাজন থাকে। সেই বিভাজনকে বিদ্বেষে রূপান্তর করে এগুলো করা হয়। সেখানে আরো কিছু বিষয় আছে, যেমন—বিদেশিরা যাওয়ার ফলে স্থানীয় লোকজনের চাকরির বাজার, আয়ের সুযোগ সংকুচিত, দেশের সম্পদ অভিবাসীদের কাছে বেহাত হওয়া—এ ধরনের বিষয় থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

আবদুর রশিদ বলেন, ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলার পর এখন বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশে দেখা যাবে যে অনেকে হামলাকারীকে ‘মুসলিম নিধনকারী’ হিসেবে অভিহিত করে বক্তব্য দিচ্ছে। এটিই অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টিতে উসকানি দেবে। এ ধরনের বার্তাই ধর্মীয় বিভাজনকে বিদ্বেষে রূপান্তর করে। তাই এমন বার্তাকে সমাজ থেকে অবশ্যই উত্খাত করতে হবে। সম্প্রীতি সংস্কৃতি সৃষ্টি করে বিদ্বেষ দূর করার কোনো বিকল্প নেই।

সৌদি আরবভিত্তিক দৈনিক আরব নিউজের প্রধান সম্পাদক ফয়সাল জে আব্বাস ‘ক্রাইস্টচার্চ হত্যাযজ্ঞ প্রমাণ করেছে যে সন্ত্রাসের কোনো বর্ণ, বিশ্বাস বা লিঙ্গ নেই’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছেন, শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডে সন্ত্রাসী হামলা বেশ কিছু মর্মান্তিক সত্য তুলে ধরেছে। প্রথমত, সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়া অশুভ নারী বা পুরুষের কাছ থেকে কারো মুক্তি নেই। দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসীরা সুনির্দিষ্ট কোনো বর্ণ, লিঙ্গ বা বিশ্বাসের নয়। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলা ও হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া অমুসলিম ব্যক্তি ওসামা বিন লাদেনের মতোই একজন সন্ত্রাসী। ১৯৯৫ সালে ওকলাহোমায় বোমা হামলা চালিয়ে ১৬৮ জনকে হত্যাকারী আমেরিকানের মতো তিনিও একজন সন্ত্রাসী। তৃতীয়ত, সন্ত্রাসী যে ধর্মের বা গোষ্ঠীরই হোক না কেন, তা বৈশ্বিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের উগ্রবাদী হামলা ঠেকাতে ইন্টারনেট, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

দোহাভিত্তিক ব্রডকাস্টার আলজাজিরা ইংলিশের ‘আপফ্রন্ট’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মেহদি হাসান দ্য ইন্টারসেপ্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, নিউজিল্যান্ডে ওই সন্ত্রাসী হামলার শুধু নিন্দা নয়, রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞজনদের উচিত মুসলমানবিরোধী বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করা।

হাফিংটন পোস্টে গতকাল পল ব্লুমেনথাল, জেসিকা স্কুলবার্গ ও লিউক ও’ব্রায়েনের লেখায় বলা হয়েছে, আধুনিক সময়ের হত্যাযজ্ঞগুলো ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও নৃশংসতায় পরিপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ের হামলাকারীরা বছরের পর বছর ধরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নৃশংসতায় অনুপ্রাণিত হয়েছে। নিউজিল্যান্ডে হামলা এটি একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। 

গত শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারী ব্রেন্টন টারেন্ট তাঁর হত্যাযজ্ঞ মিশন শুরুর আগেই অনলাইনে জানিয়েছেন, অতীতে বিভিন্ন সময় ‘ইসলামের নামধারী’ সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর ব্যবহৃত অস্ত্রের গায়েও লেখা ছিল মুসলমানবিদ্বেষ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশিদের মতে, ‘হামলার ইশতেহারে হামলাকারী যে তথ্য দিয়েছে এবং যে প্রচারণা চালিয়েছে তার মধ্যে ইসলামবিদ্বেষ আছে। হামলাকারীর মনে ইসলামের ব্যাপারে ভীতির বিষয়টি আমরা মোটামুটি পেয়েছি। হামলাকারী মনে করে, বিদেশ থেকে যারা আসছে তারা বিভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে এসে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত না হয়ে নিজস্ব সংস্কৃতিকেই সংরক্ষণ করছে এবং তারা অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতিকে ঝেড়ে ফেলবে।’

রশিদ বলেন, ‘ইসলামিক স্টেটের বড় বড় হামলায় শ্বেতাঙ্গরা আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। ক্রাইস্টচার্চের হামলা ইসলামিক স্টেটের পাল্টা জঙ্গিবাদ কি না সে ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছেনি। তবে আমরা একে উড়িয়ে দিচ্ছি না। এটি খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ জঙ্গিবাদ শুরুর ইঙ্গিত বহন করে।’

বিশ্বের খ্যাতনামা কৌশলগত পূর্বাভাসদাতা প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটফোরের সন্ত্রাস ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক স্কট স্টিওয়ার্ট যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে বলেছেন, ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারীর প্রচার করা ইশতেহার আগামী দিনগুলোতে আরো অনেককে সন্ত্রাসী হামলায় উৎসাহিত করতে পারে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা যখন হামলার বার্তা অন্যদের পৌঁছে দিতে পারে তখন তারা বিজয়ী হয়। তাদের বার্তা ঠেকানোর মাধ্যমে জয় কিছুটা হলেও ঠেকানো সম্ভব।

দ্য নিউ ইয়র্কের বিশ্লেষক জন কেসেডি অন্য ঝুঁকিগুলোর মতো কট্টর ডানপন্থী ঝুঁকিগুলোও মোকাবেলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে আমরা হত্যা ও ঘৃণ্য মতবাদের বিস্তার দেখছি। এসব মতবাদে আক্রমণের জন্য সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করা হয়। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখানে সহিংসতার জয়গানও করা হয়। এই ঝুঁকিগুলোর সামঞ্জস্য রেখেই তা মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ এই বিশ্বের কেউই এই সন্ত্রাসের অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়।’

মন্তব্য