kalerkantho

বাজার দখলে গিয়ে দুই দল রোহিঙ্গার ব্যাপক সংঘর্ষ

কুতুপালংয়ে পুলিশকে ঘেরাও করে হামলা সেনা সহায়তায় উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাজার দখলে গিয়ে দুই দল রোহিঙ্গার ব্যাপক সংঘর্ষ

ফাইল ছবি

কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ ক্রমে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত শনিবার রাতে একটি বাজারের দখল নিয়ে রোহিঙ্গাদের দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, কালো হাফপ্যান্ট পরা এবং কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো দুই পক্ষের হাজার হাজার রোহিঙ্গা দা-কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা তাদের ওপরও ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ফেলে তারা। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়লে এবং সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে রোহিঙ্গারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকের এ ঘটনায় পুলিশ নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়ে একপর্যায়ে সেনা সহযোগিতা চেয়ে পাঠায়। সেনা সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের দলটিকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে ১০ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আটক করেন। তারা হলো কুতুপালং ক্যাম্প-২-এর ইসমাইল, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ও ভুট্টু আলম; ক্যাম্প-৬-এর মাহমুদ হোসেন, ইউনুছ, রফিক ও আমিন এবং ক্যাম্প-৭-এর রফিক ও খায়ের মোহাম্মদ।

এ ঘটনার জের ধরে গতকাল রবিবার দুপুরে আবারও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ দুটি ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এসব ঘটনায় কেউ আহত হওয়ার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও হামলায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা শেড ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। গতকাল রাত ১০টার দিকেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল।

কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ ও সিনিয়র সহকারী সচিব রেজাউল করিম বলেন, ‘শিবিরে রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের সামাল দিতে প্রশাসন ও পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। শনিবার রাতের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের সঙ্গে করে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গারা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এ সময় পুলিশ ও সেনা সদস্যরা যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।’

প্রত্যক্ষদর্শী উখিয়া থানা পুলিশের উপপরিদর্শক প্রভাত কর্মকার বলেন, ‘কালো হাফপ্যান্ট পরিহিত এবং কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো হাজার হাজার রোহিঙ্গা দা-কিরিচসহ দেশীয় নানা অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এটি একটি রণক্ষেত্র।’

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরেই শিবিরের রোহিঙ্গাদের দুটি পরস্পরবিরোধী সন্ত্রাসী দল একটি বাজার দখল নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান করে আসছিল। ঘটনার পরপরই পুলিশ শিবিরটিতে টহল বাড়িয়েছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, আটক হওয়া রোহিঙ্গারা সবাই থানায় দাগি আসামি হিসেবে পরিচিত। এসব রোহিঙ্গার প্রত্যেকের নামেই আরো অনেক মামলা রয়েছে। আটক দশজনকে পুলিশ অ্যাসল্ট মামলায় জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের আট-নয় কিলোমিটার দূরে একসময়ের জনমানবহীন ‘নৌকার মাঠ’ নামের একটি বিরাট মাঠ একটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতা ইসমাইলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। একসময় সেখানে রোহিঙ্গা যুবকদের নানা প্রশিক্ষণও দেওয়া হতো। এই বাজার দখলে তৎপর ছিল ইউনুছ নামের আরেক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। তিন মাস আগে ইউনুছ পুলিশের হাতে আটক হয়। এই সুযোগে নৌকার মাঠ এলাকার দখল নেয় মার্স নামধারী আরেক দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। এখানে তড়িঘড়ি করে কয়েক শ দোকানপাট তৈরি করে বাজার বসিয়ে দেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ইউনুছ এক মাস আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নৌকার মাঠের দখল পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালায়। শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ডাকাত গ্রুপ নামে পরিচিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের এই নেতা নৌকার মাঠ দখলে নিতে গেলে দুই গ্রুপে সংঘর্ষ শুরু হয়।

জানা গেছে, নৌকার মাঠের বাজারটি এরই মধ্যে লোভনীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই বাজারে হাত বাড়ালেই সব কিছু পাওয়া যায়। এমনকি মাদক ইয়াবারও একটি বড় ডিপো হয়ে উঠেছে এই বাজার। এ কারণেই বাজারটির দখল নিয়ে এর আগে বেশ কয়েকবার হামলা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নৌকার মাঠের বাজারটি দখলে নিতে শিবিরের রোহিঙ্গা ডাকাত গ্রুপ ও অপর একটি গ্রুপের কয়েক হাজার লোক কিছুদিন ধরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতেও এক গ্রুপ বাজার দখলে নিতে হামলা চালিয়েছিল। শনিবার দিবাগত রাতে একই গ্রুপের লোকজন আবারও বাজারে হানা দেয়। সেনা সদস্যরা এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলায় ততক্ষণে রোহিঙ্গাদের অনেক বস্তি ভেঙে গেছে এবং অনেকেই আহত হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠে ‘রোহিঙ্গা শিবিরে সশস্ত্র গ্রুপ—মিয়ানমারের ইন্ধন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রোহিঙ্গা শিবিরে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা নবী হোসেন, মাস্টার আইউব, ইউনুছ, নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নূর, নসরুল্লাহ ওরফে নুরুল আমিন। শিবিরের অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে মার্স নামের একজন দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা, সৈয়দ আকবর, ভুট্টো, মুসা, মাস্টার হানিফ, মৌলভি আবদুল হামিদ, মাস্টার এনাম এবং মিয়ানমারের বুড়া সিকদারপাড়া ও বলিবাজারের ঘাটিপাড়ার বাসিন্দা রোহিঙ্গারা।

মন্তব্য