kalerkantho

গ্রামীণফোনের ‘জিপে’র অবৈধ কারবার

সজীব হোম রায়   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গ্রামীণফোনের ‘জিপে’র অবৈধ কারবার

গ্রামীণফোনের জনপ্রিয় ‘জিপে’ অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। শর্ত ও নীতি না মানায় গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘জিপে’ বন্ধের নির্দেশ দেয়, কিন্তু তা মানেনি গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এরপর তিন মাস ধরে অবৈধভাবে চলছে ‘জিপে’। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিটিআরসিকে বলেছে, এ ঘটনা সামগ্রিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। তার পরও পুরো বিষয়টি নিয়ে গ্রামীণফোনের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমরা ‘জিপে’ সেবাটি বন্ধ করে দিতে গ্রামীণফোনকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো তারা এই সেবাটি বন্ধ করেনি।”

গ্রামীণফোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, করপোরেট কমিউনিকেশনস মো. হাসানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি কিংবা ই-মেইল পাইনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সম্প্রতি (গত ৩ মার্চ) অনুষ্ঠিত এক সভায় আমাদের অস্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেখানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির অনাপত্তিপত্র এবং যথাযথ অনুমোদনের ভিত্তিতেই গ্রামীণফোন জিপে ও বিল পে/টিকেটিং সেবা প্রদান করে।’

সূত্র মতে, ২০১০ সালে বিশেষ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইলেকট্রনিক টিকিট বিক্রির জন্য অনাপত্তি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘মোবিক্যাশ’ ব্র্যান্ড নামের আওতায় ইউটিলিটি বিল কালেকশন সেবা দেওয়ার জন্য অনাপত্তি দেওয়া হয়। তবে গ্রামীণফোনকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, এই ব্র্যান্ডের আওতায় নতুন কোনো সেবা পরিচালনা করতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। পরে ২০১৬ সালে গ্রামীণফোন ‘জিপে’ সেবা নিয়ে আসে। এই সার্ভিসের আওতায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ, ট্রেনের টিকিট কাটা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা মোবিক্যাশ আউটলেট থেকে মোবাইলে টাকা রিচার্জ করা যায়। সেবাটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে গ্রামীণফোন গ্রাহকদের ‘জিপে’ ব্র্যান্ডের আওতায় ‘ই-ওয়ালেট’ সেবা দিচ্ছে। আর এই সেবা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এতে করে গ্রামীণফোন শর্ত যেমন ভেঙেছে, তেমনি নিয়মনীতির তোয়াক্কাও করেনি। বাংলাদেশ পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস রেগুলেশনস ২০১৪-এর ৫(১) অনুযায়ী, ই-ওয়ালেট সেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পেমেন্ট সার্ভিস প্রভাইডার (পিএসপি) লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির আওতায়।

গ্রামীণফোন এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা তো করেইনি, উল্টো প্রতিষ্ঠানটি ‘জিপে ওয়ালেটের’ বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। বিষয়টি নজরে এলে ব্যাংকিং সেক্টরের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ৫ ডিসেম্বর গ্রামীণফোনকে পাঠানো এক চিঠিতে ‘জিপে’র মাধ্যমে সব ধরনের আর্থিক সেবা বন্ধ করার পরামর্শ দেয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, “সম্প্রতি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও গ্রাহকের মোবাইলে খুদে বার্তার মাধ্যমে ‘জিপে’ ওয়ালেট সেবার বিষয়ে আপনাদেরকে (গ্রামীণফোন) প্রচার/প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে বাংলাদেশ পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস রেগুলেশনস ২০১৪-এর ৫(১) অনুযায়ী এ ধরনের ‘ই-ওয়ালেট’ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পেমেন্ট সার্ভিস প্রভাইডার (পিএসপি) লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই ‘জিপে’ ব্র্যান্ডের আওতায় প্রদত্ত আপনাদের সব ধরনের আর্থিক সেবা অবিলম্বে বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে।”

এ চিঠির পরও দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটরটি ‘জিপে’ বন্ধ না করায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনকে (বিটিআরসি) বিষয়টি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিটিআরসিকে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, গ্রামীণফোনকে ‘জিপে’ ব্র্যান্ডের আওতায় প্রদত্ত সব ধরনের আর্থিক সেবা অবিলম্বে বন্ধ করার কথা বলা হলেও তারা তা করেনি। গ্রামীণফোন লিমিটেডের মতো একটি প্রতিষ্ঠান এভাবে অননুমোদিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইলেকট্রনিক মানি ইস্যু করলে তা সামগ্রিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই চিঠির ব্যাপারে জানতে চাইলে গত রাতে বিটিআরসির কমিশনার (ই অ্যান্ড ও) রেজাউল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে বিটিআরসি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না সে সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারব।

 

মন্তব্য