kalerkantho

৩-৪ মিনিটের দেরিতেই বেঁচে যাওয়া

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৩-৪ মিনিটের দেরিতেই বেঁচে যাওয়া

‘টাইমিং’য়ের হেরফেরে তাঁরা নিজেরাই যে জীবনে কতবার আউট হয়ে নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে অন্যদের বিরক্তির কারণও কম হননি। অথচ সেই ‘টাইমিং’য়ের গড়বড়ই কাল ভাগ্যের পেয়ালা উপুড় করা মহিমা নিয়ে হাজির তামিম ইকবাল-মাহমুদ উল্লাহদের সামনে। এমনই যে প্রায় পুরো বাংলাদেশ দল সম্ভাব্য মৃত্যু-বিভীষিকার জ্বালামুখ থেকে জীবন নিয়ে ফিরল। অথচ সময় একটু এদিক-সেদিক হলেই তো...।

ক্রাইস্টচার্চে কালকের রক্তাক্ত দুুপুর থেকে মধ্যরাত অবধি বাংলাদেশ শিবিরের প্রতিটি সদস্যই সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে আতঙ্কে বারবার শিউরে উঠেছেন যেমন, তেমনি প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া না হওয়ার ভাগ্যে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতায়ও নতজানু হয়েছেন নিয়মিত বিরতিতেই। আজ থেকে হ্যাগলি ওভালে শুরু হওয়ার কথা ছিল সিরিজের তৃতীয় ও শেষ যে টেস্টের, সেটিরই ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলন একটু লম্বা হয়েছিল। জুমার নামাজ ধরার তড়িঘড়িতে থাকা সতীর্থদের তাই অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষ করেই ছুট লাগানো মাহমুদ উঠতেই ছেড়ে যাওয়া টিম বাস যখন স্থানীয় নূর মসজিদের ৫০ গজের মধ্যে, তখনই নিজের গাড়ি থেকে নেমে পথরোধ করে দাঁড়ান এক ভদ্রমহিলা। আর সামনে না এগোনোর আহ্বান জানানো অজ্ঞাত সেই নারী এটিও জানিয়ে দেন যে মসজিদের ভেতরে গোলাগুলি চলছে।

একটু পরেই অবশ্য বাসের ভেতরে থাকা ১৭ সদস্যের সবাই দেখতে পান মসজিদ থেকে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকা রক্তাক্ত মানুষের হুড়াহুড়ি। আরেকটু আগে হলে যে তাঁরা নিজেরাও সেই হুড়াহুড়ির মধ্যে থাকতে পারতেন কিংবা হয়তো থাকতে পারতেন দুর্ভাগা নিহতদের লাশের সারিতেও। শ্বেতাঙ্গ বন্দুকধারীর গুলিতে ছিন্নভিন্ন হওয়ার চৌকাঠ থেকে ফিরে আসার চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে? ম্যানেজার খালেদ মাসুদ তাই বলছিলেন, ‘আমরা ভীষণ সৌভাগ্যবান। বাসে আমরা ছিলাম ১৭ জনের মতো। দুজন ক্রিকেটার (লিটন কুমার দাশ ও নাঈম হাসান) শুধু হোটেলে ছিল। এমনকি সৌম্য সরকারও বাসে ছিল। আমরা মসজিদের খুব কাছেই চলে গিয়েছিলাম। বাস থেকে মসজিদও দেখা যাচ্ছিল। খুব বেশি হলে মসজিদ থেকে ৫০ গজ দূরে ছিলাম আমরা। ভাগ্য আমাদের খুবই ভালো যে তিন-চার মিনিট আগে চলে এলেও হয়তো আমরা মসজিদের ভেতরেই থাকতাম। বিশাল কিছু কিংবা ভয়ানক কিছু ঘটে যেতে পারত।’

তাঁদের ক্ষেত্রে ভয়াবহ কিছু না ঘটলেও হামলার ভয়াবহতা নিজ চোখেই দেখেছেন বাসের ভেতরে থাকা বাংলাদেশ দলের সদস্যরা। যা দেখে কখনো কখনো তাঁদের মনে হয়েছে যে সিনেমা দেখছেন না তো! ঘটনার হতবিহ্বলতায় হারিয়ে গিয়ে নিজেদের ফিরে পেতেও কিছুটা সময় লেগেছে বলে জানিয়েছেন ম্যানেজার। বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অধিনায়কের ভাষায়, ‘শুকরিয়া আদায় করছি আমরা ওই জায়গায় ছিলাম না বলে। তবে আমরা যা দেখেছি, মনে হচ্ছিল সিনেমার কোনো দৃশ্য। বাসের ভেতর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম, বেশ কিছু মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসছে। প্রায় ৮-১০ মিনিট আমরা বাসের ভেতরেই ছিলাম। মাথা নিচু করে ছিল সবাই, যাতে (টিম বাস আক্রান্ত হলেও) গুলি না লাগে।’

প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল বাস থেকে না নামার। তবে পরে সদলবলে নেমে গিয়ে বাংলাদেশ দলের সদস্যরা ঢুকে পড়েন হ্যাগলি পার্কে। সেটি পেরিয়েই তাঁরা হ্যাগলি ওভালের নিরাপদ আশ্রয়ে যান। যাওয়ার পথে খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে ফুটে থাকা আতঙ্কের ছাপও স্পষ্ট ছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভিডিওতে। সেটিকে খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই বললেন মাসুদ, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক। সামনে যখন এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে, সরাসরি দেখছেন রক্তাক্ত মানুষ বেরিয়ে আসছে, এসব দেখে যে কারোরই ভেঙে পড়ার কথা। নিজের গায়েও (গুলি) লাগবে কি না, সে বিষয়ে ওই মুহূর্তে কেউই নিশ্চিত ছিল না। বাসের ভেতরে ক্রিকেটারদের অনেকেই কান্নাকাটি করেছে। কী করলে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি, আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে তা নিয়েও। খুবই কঠিন ছিল সময়টা। এসব তো মানসিকতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ম্যানেজার হিসেবে চেষ্টা করেছি, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার।’

হ্যাগলি ওভালের ড্রেসিংরুম থেকে টিম হোটেলে আরো নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে যখন ক্রাইস্টচার্চে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা, তখন ঢাকায় জুমার নামাজের অপেক্ষা। এর আগে গুলশানে নিজের বাসভবনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান বলে দিয়েছেন, ‘নিউজিল্যান্ডে যে পরিস্থিতি, এর মধ্যে খেলার প্রশ্নই আসে না। যত দ্রুত সম্ভব, দলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’ দুই দেশের বোর্ডের সম্মতিতে ক্রাইস্টচার্চ টেস্ট বাতিলের খবরও এর আগেই ‘টুইট’ করেছিল নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট (এনজেডসি)। বাংলাদেশ দলও আজ রাতেই দেশে ফিরছে। 

ফিরছে নিরাপদেই। জীবনের ইনিংসে ‘টাইমিং’য়ের গড়বড় হয়েছে বলেই।

 

মন্তব্য