kalerkantho

বিশেষ লেখা

নির্বাচন বাতিল করে এক বছর পর করা উচিত

আবুল কাসেম ফজলুল হক

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নির্বাচন বাতিল করে এক বছর পর করা উচিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদের নির্বাচন একটা দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত হলো। ২৮ বছরেরও কিছু বেশি সময় ধরে নির্বাচন হয়নি। প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার কথা। এই যে নির্বাচন হয়নি তার কারণ অবস্থা অস্বাভাবিক ছিল। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক—সবাই মিলে তো নির্বাচনটা করতে হয়।

দেখা গেছে যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছাত্রদের বিরোধ থেকেছে, বড় বড় বিরোধ। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও যারা সরকারি দলের বাইরে থাকে তাদের সম্পর্ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে শত্রুতামূলক। সরকারি দল প্রধান বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে দেয় না। এমনকি তারা ক্লাস করতে পারে না, হলে থাকতে পারে না। এটা খুব অস্বাভাবিক অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রভোস্ট ও হাউস টিউটর ছাত্রদের সিট অ্যালট করতে পারেন না। এটা করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররা। একসময় বিএনপি প্রবল ছিল, তখন তারা অনুচিত কাজ করত। পরে আওয়ামী লীগ এসে অনুচিত কাজ করছে।

শিক্ষকদের মধ্যে সাদা দল, নীল দল আছে। দলের শিক্ষকদের মধ্যেও কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁদের মধ্যে শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য নেই। তাঁদের উদ্দেশ্য দলাদলির দ্বারা নানা স্বার্থ হাসিল করে নেওয়া। এখন সরকারি দলের শিক্ষকদের মধ্যেও ঐক্য নেই। একই দল হয়েও এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হেয়প্রতিপন্ন করা, ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে বলা যাবে না।

১৯৭২ থেকে পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। ১৯৭৩ সালে সব ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে। এরপর দীর্ঘ অস্বাভাবিক অবস্থা। কয়েকটি নির্বাচনও হয়েছে। নির্বাচিত কমিটি যে ভালোভাবে কাজ করেছে তা-ও না। একদলীয়ভাবে কাজ করেছে।

এই বাস্তবতার মধ্যে গতকাল (সোমবার) নির্বাচন হলো। টক শো, পত্রিকায় পোস্ট-এডিটরিয়াল লিখতে গিয়ে অনেকে মতলবি ধারায় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। আমি কখনো বলিনি। আমি বলেছি, সমস্যাগুলো দূর করে নির্বাচন করলে ভালো হবে। নির্বাচনের বাস্তব অবস্থা তৈরি করতে হবে। অনেক সমস্যা আছে, আমরা চাই সমস্যা কেটে যাক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্যা কাটানোর চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের আগে মাসখানেক ধরে বিএনপির ছাত্রসংগঠন হলের ভেতরে আসতে পেরেছে। এই যে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ তারাও বিপদে ছিল। নেতৃস্থানীয়রা মাঝেমধ্যে মার খেয়েছে। তারাও মাসখানেক ধরে হলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিল। বামপন্থী দলগুলো আছে, তারাও ভালো অবস্থায় আছে বলা যাবে না। 

এখন সারা দেশে আওয়ামী লীগ অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী। আওয়ামী লীগের বাইরে বিএনপিসহ যে দলগুলো আছে, তারা অত্যন্ত দুর্বল। এর মধ্যেও সরকার ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সময় ভয় পায়—সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই বোধ হয় তারা হেরে যাবে। সেই বাস্তবতা আছে। কারণ খুব স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে যে দেশের জনগণ আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে, সেই নিশ্চয়তা আছে? অবশ্যই আওয়ামী লীগ বড় দল। তাদের ভোট ঠিকমতো হয়তো পড়ত। তাদের মধ্যেও বিরোধ আছে, একজন আরেকজনকে পরাজিত করতে চায়।

সব দিক লক্ষ করলে অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে এই নির্বাচনটা হয়েছে। মাত্র মাসখানেক সহাবস্থান হয়েছে। এর মধ্যেও মারামারি হয়েছে। নির্বাচনের দিনেও মারামারি হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যে আমার মতে নির্বাচন করা উচিত ছিল না। সব ছাত্র-ছাত্রীর সহাবস্থান হতো, তারপর নির্বাচন হলে বলতাম যে নির্বাচন সফল হওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

আমরা চাই ডাকসু নির্বাচন সফল হোক। এটা কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের কেরিকেচার হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল নিয়ে যেভাবে মানুষ বিভক্ত, সে রকম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হচ্ছে। মেয়র নির্বাচনে ভোট দিতে কম লোক এসেছে। উপজেলা নির্বাচনেও আগ্রহ বোধ করছে তা নয়। মানুষ ভোটে আস্থা হারিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় অর্ধেকের কম ভোটার ভোট দিতে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে হেয় করার জন্য নয়, সবটা মিলিয়ে বাস্তব অবস্থার জন্যই বলছি যে নির্বাচন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বলা যায় পুলিশের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন। ভিসির বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য এত বেশিসংখ্যক পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে দেখা যায়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও ভাইস চ্যান্সেলর এতটা পুলিশ বা মিলিটারি পরিবেষ্টিত ছিলেন না। এই ভাইস চ্যান্সেলর আসার পরই একটা ভাঙাভাঙি হলো।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ন্যায়সংগত ছিল। এটা নিয়ে সরকার যেভাবে কাজ করেছে আমি মনে করি সম্পূর্ণ অন্যায় কাজ করেছে। এসবের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে গেছে। এ জন্য আমি বলতে চাইছি—বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে বলতে পারে যে নির্বাচন নানা দিক থেকে বিতর্কিত হয়েছে, অনেক কাজ সুষ্ঠুভাবে হয়নি। কিছু কাজ হয়েছে, মোটামুটি হয়েছে। তা দিয়ে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় না। সে জন্য আমরা নির্বাচনের ফল বাতিল ঘোষণা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব দলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাইব। তার জন্য কাজ করব। ছাত্র সংগঠনগুলোও চাইবে। সরকারি দলের ছাত্ররা প্রবল। প্রবল হলেও তারা ভোটে জিতবে সেই নিশ্চয়তাবোধ তো তাদের মধ্যে দেখা যায় না। ভোট তো একটা ভিন্ন ব্যাপার।

অনেক অন্যায় হচ্ছে, কেউ শব্দ করছে না। যেভাবে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি সক্রিয়, বন্দুকযুদ্ধে মানুষ মারা হচ্ছে। আগে ছিল ক্রসফায়ার, এখন বন্দুকযুদ্ধ। কোনো অবস্থায়ই এগুলো স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকার করা যায় না। এটা সভ্যতা নয়, বর্বরতার প্রকাশ।

২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের পর প্রথম দিকে বামপন্থী যাদের সন্ত্রাসী বলে সন্দেহ হয়েছে তাদের বিনা বিচারে মেরেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে বারবার বলেছে যে ক্রসফায়ার বন্ধ করবে। তারা ক্রসফায়ার বন্ধ করে চালু করেছে বন্দুকযুদ্ধ। আগে বছরে মারা যেত ২০০, এখন মারা যায় দুই হাজার।

আমি বলব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা উন্নত করার উপায় আছে। এই নির্বাচনের ফল বাতিল ঘোষণা করে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন করা হোক। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পর নির্বাচন হোক। সরকারের প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। ভালোভাবে কাজ করুক, আমরা সহযোগিতা করব।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : ওমর ফারুক

মন্তব্য