kalerkantho

ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে বন্ডের নামে রাজস্ব ডাকাতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে বন্ডের নামে রাজস্ব ডাকাতি

ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আড়ালে রাজস্ব ডাকাতির তথ্য মিলেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন গভীর রাতে ট্রাকে ট্রাকে খালাস হয় কাপড়, প্লাস্টিক ও কাগজ জাতীয় বিভিন্ন পণ্য। চোরাকারবারিরা এসব পণ্য বিক্রি করছে কালোবাজারে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি হওয়া এসব পণ্যের অবৈধ বাণিজ্যে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় শিল্প খাত। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, বন্ড সুবিধার পণ্য কালোবাজারে বিক্রি এবং চোরাকারবারি ঠেকাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়ার নির্দেশনায় গত দেড় মাসে ২৬টি ঝটিকা অভিযান চালিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব অভিযানে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে বন্ড কমিশনারেট।

প্রসঙ্গত, যেসব রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচিত স্থানীয় শিল্প শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করে, তাদের সরকার বন্ড সুবিধা দেয়। ২০০০ সাল থেকে তৈরি পোশাক ও স্থানীয় শিল্প ও কূটনৈতিক বন্ডের আওতায় এ সুবিধা দেওয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, গত কয় দিন ধরে প্রতিদিন গভীর রাতে ট্রাকে ট্রাকে কাপড় ও কাগজ জাতীয় পণ্যবোঝাই ট্রাক খালাস হয় রাজধানীর ইসলামপুর, নয়াবাজার, চকবাজার মোড়, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়। নিয়মানুযায়ী পুনঃ রপ্তানির শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি হওয়া পণ্যসামগ্রী খালাস হওয়ার কথা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়্যারহাউসে। কিন্তু চোরাকারবারিতে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ীচক্র সে পণ্য বিক্রি করছে কালোবাজারে। এর মধ্যে বটম গ্যালারি, ট্রাউজার ওয়ার্ল্ডসহ সাতটি প্রতিষ্ঠান প্রায় রাতে কালোবাজারে বিক্রি করছে এসব পণ্য। সম্প্রতি গভীর রাতের এক অভিযানে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যবোঝাই ট্রাক আটক করেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ডের কর্মকর্তারা। 

বন্ডের অনিয়ম বন্ধে তিনটি সুপারিশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশন না হওয়ায় দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়ছে। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী বন্ডের বর্তমান অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতার সুযোগ নিচ্ছে। এতে বন্ডের কার্যক্রমকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং রাজস্ব ফাঁকি ও দেশীয় শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবসায় প্রতিবছর ৩০ হাজার কোটি টাকার সুবিধা দেয় সরকার।

সূত্র জানায়, বন্ড লাইসেন্সধারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণে পণ্য আমদানি করেছে। সেই পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে কয়েক শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী চক্র। সৈয়দপুর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, ইপিজেডের ফারদিন অ্যাকসেসরিজ ও কোয়েস্ট নামের দুটি প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিকভাবে পণ্য আমদানি করে কালোবাজারে বিক্রি করেছে। এর মধ্যে কোয়েস্টই প্রায় ১৫ লাখ কেজি বিওপিপি ফিল্ম আমদানি করেছে। যার একটি বড় অংশ কালোবাজারে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফারদিন অ্যাকসেসরিজ পাঁচ লাখ দুই হাজার কেজি বিওপিপি ফিল্ম আমদানি করেছে, যা ব্যবহার করার মতো উন্নত প্রযুক্তি নিলফামারী ইপিজেডে নেই। ফারদিন অ্যাকসেসরিজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনই গভীর রাতে ট্রাকে ট্রাকে বন্ডের পণ্য খালাস করে।

আদমজী ইপিজেডের চেক পয়েন্ট সিস্টেম বিডি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্সে পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। প্রতিষ্ঠানটির চলতি অর্থবছরে ৩৩ হাজার টন পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ পণ্যের উৎপাদনক্ষমতা তাদের নেই। অথচ চেক পয়েন্ট সিস্টেম বিডি লিমিটেড পেপার অ্যান্ড পেপার বোর্ড, সেলফ এডিসিড পেপার, ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি লেভেল, ওভেন লেভেলস, রিবন, ফাস্ট্রনার, স্ট্রিংসহ বিভিন্ন জাতীয় পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ও রপ্তানি অস্বাভাবিক হওয়ায় মোট প্রাপ্যতা ৩৩ হাজার টন থেকে কমিয়ে যুক্তিসংগতভাবে কমিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে বন্ড কমিশনারেট সূত্র।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ওয়েবকোয়াট নামের প্রতিষ্ঠানে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের উপকমিশনার নাজিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল। ওই অভিযানে রিলিজ পেপার, সেলফ পেপার, প্রিন্ট ইংক, টিস্যু পেপার, হট মেইল্ড গ্লু, কোটেড পেপার, ক্রাফট পেপার, অফসেট পেপার ইত্যাদি কাঁচামাল কালোবাজারে বিক্রিসহ কোটি কোটি টাকার অনিয়ম থাকার মামলা চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার ও চুরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ইপিজেডগুলোর কর্মকর্তারা। আর কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী শুল্ক দিয়ে সামান্য পণ্য আমদানি করে। বাকি পণ্য বন্ড থেকে অপসারিত পণ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এক ভ্যাট চালানের রসিদ ব্যবহার করে। এসব অনিয়ম ও চোরাচালান ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এরই মধ্যে এনবিআরের চেয়ারম্যান শুল্ক গোয়েন্দা, বন্ড কমিশনারেটসহ সব কাস্টমস কমিশনারকে নির্দেশনা দিয়েছেন সর্বশক্তি দিয়ে অভিযান পরিচালনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্ডের অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি। তথাকথিত রপ্তানি খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। অবৈধ বাজারে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।’

বন্ডের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে একমত পোষণ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার রপ্তানিকে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প খাতের উন্নয়ন ও সুরক্ষার বিষয়টিও অগ্রাধিকারে রয়েছে। তাই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে দেশের টেক্সটাইল শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যনুযায়ী, গত এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য যেসব মিল সুতা ও কাপড় তৈরি করে, সেই মিলগুলো তাদের পণ্য বাজারজাতকরণে ব্যর্থ হচ্ছে। শুল্ক ও করমুক্ত এবং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে আমদানি হওয়া সুতা-কাপড়সহ বিভিন্ন ড্রেস ম্যাটেরিয়ালের স্থানীয় বাজারে ব্যাপক ও অবাধ বিক্রি হচ্ছে। এর প্রভাব দেশের রপ্তানিমুখী স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলোতেও পড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস বন্ড ও কাস্টম হাউসগুলো এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা এখনো অব্যাহত আছে। দেশের টেক্সটাইল মিলগুলো বর্তমানে শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন, মজুরি ও অন্যান্য ইউটিলিটি ব্যয় নির্বাহের জন্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে সুতা ও কাপড় বিক্রি করছে।

এ প্রসঙ্গে বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০টির মতো প্রতিষ্ঠান আমদানি করা সুতা ও কাপড় দেশের বিভিন্ন মোকামে বাজারজাতকরণে জড়িত রয়েছে। এ ছাড়া অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো কার্যত বন্ধ; কিন্তু তাদের বন্ড লাইসেন্সগুলো বিভিন্ন উপায়ে কার্যকর রেখে সুবিধা গ্রহণ করছে। আমরা মনে করি, বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চিহ্নিত এবং তাদের মধ্যে কতটি চালু রয়েছে, তা নির্ধারণ করে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ড লাইসেন্স বাতিল করা প্রয়োজন। বন্ধ কারখানার বন্ড লাইসেন্স ব্যবহারের অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ হলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে।’

ইপিজেড ও কাস্টমস সূত্র জানায়, সম্প্রতি মোংলা ইপিজেডের মুন স্টার, সৈয়দপুর ইপিজেডের ফারদিন অ্যাকসেসরিজ ও কোয়েস্ট এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের ওয়েবকোয়াট নামের এই চারটি বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাগজ জাতীয় পণ্য রাজধানীর নয়াবাজারে কয়েক দফা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর আগেও এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় পুনরায় চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠান চারটি।

এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১২ মোহাম্মদ মমিনুর রহমান স্বাক্ষরিত বিশেষ প্রতিবেদন পাঠানো হয় গত বছরের ২৬ জুলাই। প্রতিবেদনে দেশীয় শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, বন্ড কার্যক্রম স্থানীয় শিল্প বিকাশের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সরকার এ লক্ষ্যে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করে থাকে। স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশের মাধ্যমে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকির সম্মুখীন এবং বেসরকারি রাজস্বের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সাধন করছে। বর্তমানে ম্যানুয়াল কার্যক্রমে অদক্ষতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। এতে রপ্তানিমুখী ব্যবসার খরচ ক্রমাগত বাড়বে। কিন্তু বন্ডের কাঁচামালের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানিপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হবে।

 

মন্তব্য