kalerkantho

নুর-শোভন অঙ্গীকারে উত্তেজনার অবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নুর-শোভন অঙ্গীকারে উত্তেজনার অবসান

টিএসসিতে গতকাল বিকেলে ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরকে স্বাগত জানিয়ে কোলাকুলি করেন পরাজিত ভিপি পদপ্রার্থী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন (বাঁয়ে); এর আগে দুপুরে ছাত্রলীগকর্মীর ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের কর্মীরা। ছবি : শেখ হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল ছাত্রলীগ এবং অন্য সব প্যানেল ও প্রার্থীদের মধ্যে। ফল ঘোষণার পর উত্তেজনা আরো বাড়ে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারামারিও হয় তাদের মধ্যে। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার দিন শেষে ডাকসুর নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর ও ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের যৌথ অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সাময়িক অবসান ঘটে উত্তেজনার।

দুপুরে নুরুল হক নুর আজ বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি দেন এবং কেন্দ্রীয় ২৩ পদে পুনর্নির্বাচন দাবি করেন। তবে দিন শেষে তা প্রত্যাহার করেন। এ নিয়ে বাম সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্রথমে মতভিন্নতা দেখা দিলেও পরে তারা ঐকমত্যে পৌঁছে। তারা আজ বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হবে। 

গতকাল বিকেলে টিএসসি মিলনায়তনে নুরের সঙ্গে নেতাকর্মীদের নিয়ে দেখা করতে যান ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন। ওই সময় দুজনে কোলাকুলি করলে উত্তেজনার অবসান হয়। পরাজিত ভিপি পদপ্রার্থী শোভন নির্বাচিত ভিপি নুরকে স্বাগত জানিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা ও ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

ডাকসু মিলনায়তনে নুরকে পাশে রেখে শোভন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি পারিনি তো কী হয়েছে, ভিপি তো হয়েছে। ভিপি তো কারো একার না, কোনো সংগঠনের না, সকল ছাত্রের। এখন আমাদের সব চাওয়া-পাওয়া নুরুল হক নুর পূরণ করবে। তাকেও দায়িত্বশীল হতে হবে, তোমাদেরও (ছাত্রলীগ) সহযোগিতা করতে হবে।’ পরে নতুন ভিপি নুর বলেন, ‘আমরা চাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রসংগঠন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। ছাত্র-শিক্ষকদের সমন্বয়ে আমরা একটি উন্নতমানের শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলব। সেই লক্ষ্যে আমাদের পরস্পরের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নুর বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি থেকে আমরা সরে এসেছি।’ তবে শিক্ষার্থীদের আশা পূরণ না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এজিএস পদপ্রার্থী ফারুক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সম্মিলিতভাবেই ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন থেকে সরে এসে বুধবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছি। একই সঙ্গে ২৩ পদে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হবে।’

স্বতন্ত্র জিএস পদপ্রার্থী আসিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা যারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার সঙ্গে আছি, সবাই মিলেই ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছি। কারণ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ চাই। তবে যেহেতু বর্তমান উপাচার্যের সময়েই প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে, তাই এই উপাচার্যের পদত্যাগের পর পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।’ গতকালের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করেছে বলে জানান তিনি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে যাই বলুক, যে দাবিই উঠুক না কেন, পুনরায় নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। দেশের মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচন দেখেছে। দুইটা হলের মধ্যে একটাতে সামান্য অনিয়ম হয়েছে। আমরা সেখানে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আরেকটা হলে অনিয়ম বলব না, হাঙ্গামা হয়েছে। কাজেই ডাকসু নির্বাচন যারা বর্জন করেছে, সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে নির্বাচন বাতিল করার এখন কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করি না।’

ভিপি পদে না জেতায় ছাত্রলীগও পুনর্নির্বাচন দাবিতে সোমবার মধ্যরাত থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। তবে গতকাল বিকেল সোয়া ৩টায় ছাত্রলীগ সভাপতির নির্দেশে তারা তাদের অবস্থান তুলে নেয়। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর নির্বাচিত জিএস গোলাম রাব্বানীসহ অন্যরা ওই সময় ছিলেন না। তখন অনেক নেতাকর্মী অভিযোগ করে, শোভনের সঙ্গে সংগঠনের একাংশ বেঈমানি করেছে।

গোলাম রাব্বানীকে গতকাল দিনভর কোথাও পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিল।

সকাল ১১টায় পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি হিসেবে প্রথমে টিএসসিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে বাম সংগঠনগুলো। পরে সহকর্মীদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে ক্যাম্পাসে যান নবনির্বাচিত ভিপি নুর। টিএসসিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নুরের প্যানেলের সদস্যদের ওপর হামলা করে। ওই সময় ছাত্রদলের একটি মিছিলও সেই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে। ছাত্রদল কোটাপন্থীদের পক্ষ নেয়। সংঘর্ষে ছাত্রদলের প্রার্থী তৌহিদুর রহমানের মাথা ফেটে যায়।

পরে ছাত্রলীগ চলে গেলে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীসহ অন্যান্য সংগঠন রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশ করে। সেখানে ডাকসুর নতুন ভিপি নুর বলেন, ‘প্রশাসনকে বলতে চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা অগ্নস্ফুিলিঙ্গ, সেটা নিয়ে খেলবেন না। পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল নিপীড়নের বিচার অতি দ্রুত করতে হবে।’

ওই সময়ই নুর আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ডাকসুর ২৩ পদে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছিলেন। তবে তাঁর পাশে থাকা প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের নেতা লিটন নন্দী ২৫ পদেই পুনর্নির্বাচনের কথা বলতে বারবার নুরকে তাগিদ দিচ্ছিলেন। 

ওই সময় নুর বলেন, ছাত্রলীগ একটি গুজব সংগঠন, যারা নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ছড়ায়। তিনি আরো বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ছাত্রলীগ একটি পদেও বিজয়ী হতে পারত না।

এদিকে গতকাল রাতে টিএসসিতে অন্য প্যানেলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসুর ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক ছাড়া বাকি ২৩ পদে আবার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন নুর। তবে তিনি এই দফায়ই ভিপি পদে শপথ নেবেন বলেও জানিয়েছেন।

ডাকসুর নতুন ভিপি বলেন, ‘নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে, সব পদ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা একচেটিয়া ভোট দিয়েছে ভিপি ও সমাজসেবা পদে। যে কারণে তারা ইঞ্জিনিয়ারিং করেও ওই দুই পদ নিতে পারেনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ছাত্ররা যে রকম আশা করেছিল, সে রকম নির্বাচন হয়নি। ছাত্রলীগ বাদে সবাই ভোট বর্জন করেছে। তাই এ নির্বাচন পুনরায় হতে হবে এবং নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছে তাদের পদত্যাগ করতে হবে। অন্যদের অধীনে আমরা নির্বাচনে অংশ নিব।’

ছাত্র ধর্মঘট প্রসঙ্গে নুর বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করছি। তাদের সুবিধার্থে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছি। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংগঠন যদি ফের কোনো কর্মসূচি দেয়, তাহলে সমর্থন দিব।’

ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে কোলাকুলির বিষয়ে নুর বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা যখন সুবিধাজনক মনে করে, যখন আমাদের লাগে, তখন বুকে টেনে নেয়। আবার যখন মনে করে আমরা শত্রু তখন মার দেয়। গত ৩০ জুনও তারা আমাকে মেরেছিল। আজকেও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি টিএসসিতে এসেছি, কিন্তু আমাকে তারা ধাওয়া দিয়েছে। তাদের মুখে মধু, অন্তরে বিষ। তাদের বিশ্বাস করাটা খুব কঠিন।’

এদিকে ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আমরণ অনশনে বসেছেন পাঁচ শিক্ষার্থী।

ছাত্রদল গতকালের কর্মসূচির সঙ্গে থাকলেও পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে এখনো কিছু জানায়নি। ছাত্রদলের জিএস পদপ্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীলনকশার মাধ্যমে পাতানো নির্বাচন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। প্রহসনের নির্বাচনের প্রতিবাদে মঙ্গলবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছি। পরবর্তী কর্মসূচি আলোচনা করে জানাব।’

 

মন্তব্য