kalerkantho

ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার এক বছর

কন্ট্রোল টাওয়ারের ভুলেই দুর্ঘটনা

মাসুদ রুমী   

১২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কন্ট্রোল টাওয়ারের ভুলেই দুর্ঘটনা

ফাইল ছবি

এক বছর আগে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকালে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে কন্ট্রোল টাওয়ারেরও বড় ধরনের গাফিলতি ছিল। দুর্ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে (এটিসি) ছিলেন শিক্ষানবিশ কন্ট্রোলার। বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে নীরব ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক কন্ট্রোলার। শেষ সময়ে অবতরণের ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে দুঃস্বপ্নের অপেক্ষা করেছিলেন তিনি। ওই দুর্ঘটনার বিষয়ে নেপাল সরকার গঠিত তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশি তদন্তকারী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরামর্শক ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম  রহমতুল্লাহ যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন, তাতে এসব তথ্য রয়েছে।

৭১ জন আরোহী নিয়ে ঢাকা থেকে কাঠমাণ্ডুগামী ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১ ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়েছিল গত বছরের ১২ মার্চ। এতে নিহত ৫১ জনের মধ্যে ২২ জন নেপালি ও একজন চীনা নাগরিক ছিলেন, অন্যরা সবাই বাংলাদেশি। আজ মঙ্গলবার এক বছর পার হলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে একমত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। 

নেপাল সরকারের গঠন করা তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসল কারণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বেবিচক। দুর্ঘটনার বিষয়ে ওই কমিটিতে বাংলাদেশি তদন্তকারী ও বেবিচকের পরামর্শক ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন, তা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে সংযুক্ত করেনি নেপাল। তাই প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে নতুনভাবে প্রকৃত তথ্য প্রতিবেদনে সংযুক্ত করতে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ।

এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপ অব বাংলাদেশের (এএআইজি-বিডি) প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছি, নেপালের তদন্ত প্রতিবেদন একপেশে। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং তা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে আসল ঘটনা সম্পর্কে যে সংযোজনী দিয়েছি, সেটা যুক্ত করে প্রকাশ করা হয়নি। এটা আইকাও পর্যায়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’

এটিসি সম্পর্কে যেসব তথ্য চেপে গেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ, সেগুলোই ওই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশি তদন্তকারীর সংশোধিত তদন্ত প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনের কপি কালের কণ্ঠ’র কাছেও আছে। এতে ছয়টি পয়েন্টে নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভুলগুলো উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের তদন্তকারীর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার দিন ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারে অন্তত তিনজন কন্ট্রোলার ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ওজেটি (শিক্ষানবিশ), দ্বিতীয়জন দক্ষ প্রশিক্ষক এবং তৃতীয়জন ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক কন্ট্রোলার। তাঁদের মধ্যে শিক্ষানবিশ কন্ট্রোলার ছিলেন মূল দায়িত্বে। রানওয়ের পূর্ব দিকে বিমানটি যখন নিচুতে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছিল তখন তাঁর হাতে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ ছিল বিমানের অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই করে সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার। শিক্ষানবিশ কন্ট্রোলার তা করেননি। তদন্ত কমিশন নিশ্চিত হতে পারেনি ওই অবস্থায় কেন তত্ত্বাবধায়ক কন্ট্রোলারও ফ্লাইটটির অস্বাভাবিক আচরণ আমলে নেননি। এরপর বিমানটি যখন বিপজ্জনক গতিতে নামছিল, পাইলট রানওয়ে অবস্থান ঠিক করার চেষ্টা করছিলেন তখন তত্ত্বাবধায়ক কন্ট্রোলার ছিলেন নিষ্ক্রিয়। দুর্ঘটনা এড়ানোর মতো ইতিবাচক কোনো নির্দেশনা দেননি তিনি। তদন্ত কমিশন যখন কন্ট্রোলারদের সাক্ষাৎকার নেয় তখন তাঁরা স্বীকার করেন বিমানটি এটিসি কন্ট্রোলারদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ভিজ্যুয়াল কন্টাক্টে ছিল। যখন বিমানটি অবতরণের অপেক্ষায় খুব নিচ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে যাচ্ছিল তখন তত্ত্বাবধায়ক কন্ট্রোলার নীরব ছিলেন এবং একটা সময় অবতরণের ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে একটি দুঃস্বপ্নের অপেক্ষা করছিলেন।

এ প্রসঙ্গে এএআইজি-বিডির প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেপাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কথা তদন্ত প্রতিবেদনে খুব একটা আসেনি। সেটাই আমি আমাদের সংশোধিত তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। আমাদের অংশটুকু ওদের প্রকাশ করার কথা। ওরা যেহেতু মানেনি, তাই এটাকে আমরা আরো উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সিইও ইমরান আসিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাইলটের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব তথ্যভিত্তিক কথা বলা হয়েছে, একই রকমভাবে এটিসির পক্ষ থেকে যে ল্যাপসগুলো হয়েছে সেগুলোর তথ্য-প্রমাণ সিভিআর, এফডিআরের মধ্যেই আছে। পাইলটকে মানসিক বিপর্যস্ত হিসেবে উল্লেখ করা হলেও যদি এটিসির পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা হতো, তাহলে দুর্ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত। তারা মূল কারণের মধ্যে শুধু পাইলটের ব্যাপারটাই লিখল; কিন্তু এটিসির দায়িত্বহীনতার কথা লেখেনি। তারা এটাকে হালকাভাবে সহায়ক ফ্যাক্টরের মধ্যে এনেছে, যা খুবই দুঃখজনক। আমাদের আপত্তি এই জায়গাতেই।’

এভিয়েশন খাত বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হিউম্যান এরর থেকেই এই ঘটনা ঘটেছে, এটা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেটা কোন দিক থেকে কম এবং বেশি হয়েছে, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তারা বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণ না নিলে আইকাওকে বলা যেতে পারে।’ ওই ঘটনার এক বছর পর এভিয়েশন খাতের নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এয়ারলাইনসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে নিয়ম মেনে। সিভিল এভিয়েশনের অডিট আরো শক্তিশালী হওয়া উচিত। নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না।’

এদিকে নেপাল সরকার প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার শিকার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমানটির ক্যাপ্টেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। ফলে পরিস্থিতির বিষয়ে সচেতনতা হারিয়ে ফেলেন ক্যাপ্টেন। এ ছাড়া কাঠমাণ্ডু এয়ারপোর্টে অবতরণের সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিমানের ক্রুরা সচেতন ছিলেন না। দুর্ঘটনার আগে বিমানের ক্যাপ্টেন ককপিটে বসে ধূমপান করছিলেন। ককপিটে কো-পাইলট ছিলেন ২৫ বছরের নারী পৃথুলা রশিদ, যাঁর উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৩৯০ ঘণ্টা। এ কারণেই ২৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করে নেপাল।

মন্তব্য